তৈরি হচ্ছে ‘সুপার এল নিনো’, বিশ্বজুড়ে রেকর্ড তাপমাত্রা ও মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা
- আপডেট সময় : ০১:১৭:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬ ২৯ বার পড়া হয়েছে
প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে এল নিনো। আন্তর্জাতিক আবহাওয়া পূর্বাভাস সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’তে রূপ নিতে পারে। এর ফলে আগামী বছর বিশ্বজুড়ে রেকর্ড তাপমাত্রা, খরা, বন্যা, খাদ্যসংকট এবং বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, ২০২৭ সাল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হতে পারে।
দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগর
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। এটি এল নিনো শুরুর অন্যতম প্রধান লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়।
এল নিনো হলো এমন একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত প্রক্রিয়া, যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অংশ অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে। আবহাওয়াবিদদের ধারণা, আগামী কয়েক মাসে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে শরৎ নাগাদ ‘খুব শক্তিশালী’ বা ‘সুপার এল নিনো’তে পরিণত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনোগ্রাফিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া) জানিয়েছে, এক মাসের মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে এল নিনো শুরু হতে পারে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি শীতের মধ্যে এটি শক্তিশালী বা খুব শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
আবহাওয়াবিদদের মতে, গত কয়েক সপ্তাহে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা যেভাবে বেড়েছে, তা অস্বাভাবিক। নোয়ার আবহাওয়াবিদ নাথানিয়েল জনসন বলেন, গত শীতের লা নিনা পরিস্থিতি থেকে মাত্র এক বছরের মধ্যে সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনোতে পৌঁছানো বিরল ঘটনা।
অস্ট্রেলিয়ার ব্যুরো অব মেটিওরোলজি (বিওএম) এল নিনো নির্ধারণে আরও কঠোর মানদণ্ড ব্যবহার করে। তাদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ের তুলনায় কমপক্ষে ০.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে হবে এবং বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনেরও স্পষ্ট প্রমাণ থাকতে হবে।
কীভাবে নির্ধারণ করা হয় ‘সুপার এল নিনো’
আবহাওয়াবিদেরা বিশেষভাবে ‘নিনো ৩.৪’ নামে পরিচিত প্রশান্ত মহাসাগরের একটি অঞ্চলের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করেন। তিন মাসের গড় তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে গেলে তাকে ‘সুপার এল নিনো’ বলা হয়।
ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টস (ইসিএমডব্লিউএফ), নোয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বিওএম—তিনটি সংস্থার পূর্বাভাস প্রায় একই ধরনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইসিএমডব্লিউএফের সর্বশেষ মডেলগুলোতে দেখা গেছে, শরৎ নাগাদ তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে। কিছু পূর্বাভাসে এমনও ইঙ্গিত মিলেছে যে এটি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তাহলে ১৮৭৭ সালের ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের রেকর্ডও ভেঙে যেতে পারে।
অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
১৮৭৭ সালের শক্তিশালী এল নিনো প্রায় ১৮ মাস স্থায়ী হয়েছিল। এর ফলে এশিয়া, আফ্রিকা ও ব্রাজিলে ভয়াবহ খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং লাখো মানুষের মৃত্যু হয়। একই সময়ে পেরুসহ কয়েকটি অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যাও হয়েছিল।
সবশেষ বড় ধরনের ‘সুপার এল নিনো’ দেখা গিয়েছিল ২০১৫-১৬ সালে। তখনও বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল।
কী হতে পারে প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রায়। সাধারণত এটি বিশ্ব তাপমাত্রা প্রায় ০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের জলবায়ু ঝুঁকি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক লিজ স্টিফেন্স বলেছেন, যদি এটি খুব শক্তিশালী এল নিনোতে পরিণত হয়, তাহলে আগামী বছর বিশ্ব রেকর্ড তাপমাত্রার মুখোমুখি হতে পারে।
এল নিনোর কারণে উত্তর পেরু ও দক্ষিণ ইকুয়েডরে বন্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে পূর্ব আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলেও বন্যার ঝুঁকি বাড়বে।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অঞ্চলে খরা ও দাবানলের আশঙ্কা বাড়ছে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং বৈশ্বিক খাদ্যসংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এই এল নিনো। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে সার সরবরাহে বিঘ্ন ও মূল্যবৃদ্ধি ইতোমধ্যে কৃষিখাতে চাপ তৈরি করেছে।
অধ্যাপক স্টিফেন্সের মতে, এমন পরিস্থিতিতে খরা বা বন্যার কারণে ফসল উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যের দাম আরও বেড়ে যাবে। এতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যদি বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী কয়েক বছর বিশ্বকে আরও চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু সংকটের মুখোমুখি হতে হতে পারে। সূত্র বিবিসি


















