বক্ষব্যাধি হাসপাতালে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য: পদে পদে হয়রানির শিকার রোগীরা
- আপডেট সময় : ১২:৪৩:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬ ৩৪ বার পড়া হয়েছে
সরকারি হাসপাতালে স্বল্প খরচে কিংবা বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে নাজেহাল হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা। ভর্তি, বেড, টেস্ট কিংবা সিরিয়াল—সব ক্ষেত্রেই গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। এমনকি রোগীদের সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
রাজধানীর মহাখালী বক্ষব্যাধি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি এমন চিত্রই উঠে এসেছে। পরে ছদ্মবেশে অভিযান চালিয়ে দালাল চক্রের ১৫ সদস্যকে আটক করে র্যাব। তাদের মধ্যে ১৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
প্রতিদিন শত শত রোগী চিকিৎসার আশায় বক্ষব্যাধি হাসপাতালে আসেন। কিন্তু হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশের আগেই দালাল ও অসাধু কর্মচারীদের ফাঁদে পড়তে হয় অনেককে। অভিযোগ রয়েছে, দ্রুত টেস্টের সিরিয়াল পাইয়ে দেওয়া, ভর্তি নিশ্চিত করা কিংবা বেডের ব্যবস্থা করে দেওয়ার নামে রোগীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে টাকা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ডাক্তারের কক্ষের বাইরে অবস্থান নেওয়া কিছু ব্যক্তি রোগীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করে। কেউ বলেন, “সিট নেই”, কেউ বলেন “ভর্তি হতে কয়েকদিন লাগবে, এরপরই শুরু হয় টাকার দাবি।
এক ভুক্তভোগী জানান, সিরিয়াল দ্রুত পেতে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। পরে আবার ১০০–২০০ টাকা করে নেয়। এখানে টাকা ছাড়া কোনো কাজই হয় না।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, হাসপাতালের এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীও এই দালাল চক্রের সঙ্গে জড়িত। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি দ্রুত নার্স কক্ষে আশ্রয় নেন। পরে কয়েকজন নার্স তার উপস্থিতির বিষয়টি অস্বীকার করেন। এতে প্রশ্ন উঠেছে, একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে আড়াল করার চেষ্টা কেন?
অভিযুক্ত কর্মী বলেন, ওয়ার্ডমাস্টার আমাকে এখানে রেখেছে। কাজকাম করে খাই।
বেতন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার কোনো বেতন নাই।
রোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে র্যাব সদস্যরা রোগী সেজে হাসপাতালে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক দালাল তাদের বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলে শুরু হয় অভিযান। অভিযানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
র্যাব জানায়, দালাল চক্রটি টাকার বিনিময়ে ‘ভিআইপি সিট’ দেওয়ার প্রলোভন দেখাত। এছাড়া রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে কমিশনও নিত।
অভিযানে আটক ১৫ জনের মধ্যে কয়েকজন স্বীকার করেন, রোগীপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত কমিশন পাওয়া যায়। আর কোনো রোগী ভর্তি করাতে পারলে মিলত ২০০ থেকে ৩০০ টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, মহাখালীর ‘রাফা’ ও ‘সেবা’ নামের কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মাসিক চুক্তির ভিত্তিতে এসব দালাল নিয়োগ দিত।
জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আটক ১৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।
র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজী তামজিদ আহমেদ বলেন, ১৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও সতর্ক করা হয়েছে, যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।
রোগীদের দাবি, মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। হাসপাতালকে দালালমুক্ত করতে প্রয়োজন কঠোর নজরদারি, জবাবদিহি ও স্থায়ী ব্যবস্থা।
সরকারি হাসপাতাল সাধারণ মানুষের শেষ ভরসার জায়গা। সেখানে যদি চিকিৎসার পরিবর্তে হয়রানি আর দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বাড়তে থাকে, তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন নিম্নআয়ের রোগীরাই। তাই সংশ্লিষ্টদের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।


















