মার্কিন আদালতের রায়েও বহাল ১০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক, নতুন অনিশ্চয়তায় রফতানিকারকরা
- আপডেট সময় : ০৬:২৮:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা ১০ শতাংশ বৈশ্বিক পাল্টা শুল্ককে (গ্লোবাল রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ) অবৈধ ঘোষণা করলেও, বাস্তবে এখনই সব আমদানিকারকের জন্য এই শুল্ক বাতিল হচ্ছে না। আদালতের রায় আপাতত শুধু মামলার তিন বাদীর ক্ষেত্রে কার্যকর হওয়ায় বিশ্বের অন্যান্য রফতানিকারক দেশ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
গত ৭ মে নিউ ইয়র্কভিত্তিক ইউনাইটেড স্টেটস কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডের তিন বিচারকের বেঞ্চ ২-১ ব্যবধানে এই রায় দেন। আদালত বলেন, প্রেসিডেন্টের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা সীমিত এবং কংগ্রেস যে আইনি ক্ষমতা দিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন তা অতিক্রম করেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে এই শুল্ককে ‘অবৈধ’ ও ‘আইনত অননুমোদিত’ বলা হয়েছে।
তবে আদালতের নির্দেশ শুধু মামলার তিন বাদী– ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্য, খেলনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বেসিক ফান এবং মসলা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বারল্যাপ অ্যান্ড ব্যারেলের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়েছে। আদালত তাদের ওপর আরোপিত ১০ শতাংশ শুল্ক স্থগিত এবং ইতোমধ্যে আদায় করা অর্থ ফেরতের নির্দেশ দিয়েছেন।
ফলে বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ আমদানিকারকের জন্য ১০ শতাংশ বৈশ্বিক পাল্টা শুল্ক বহাল রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ রফতানিনির্ভর দেশগুলোর ব্যবসায়ীরা এখন উচ্চ আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং ট্রাম্প প্রশাসনের আইনি পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছেন।
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিকে ঘিরে নতুন এক অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। কারণ আদালত শুল্ককে অবৈধ বললেও তাৎক্ষণিকভাবে সবার জন্য বাতিল করেননি। ফলে ব্যবসায়ীরা বুঝতে পারছেন না ভবিষ্যতে আমদানি ব্যয়, মূল্য নির্ধারণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, গত ৭ মে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের রায়ে সবার জন্য ১০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বাতিল হয়নি। আদালত কেবল নির্দিষ্ট একটি মামলার তিন বাদীর ক্ষেত্রে এই শুল্ক স্থগিত এবং অর্থ ফেরতের নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে অন্য সব আমদানিকারকের জন্য ১০ শতাংশ শুল্ক এখনও বহাল রয়েছে। তবে উচ্চ আদালতে নতুন সিদ্ধান্ত এলে বা ভবিষ্যতে আরও মামলার মাধ্যমে রায়ের পরিধি বাড়লে পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে পারে।’
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুল্কসংক্রান্ত যেকোনও অনিশ্চয়তা ক্রেতাদের অর্ডার, মূল্য নির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং আমদানি নির্ভরতা নিয়ন্ত্রণে কঠোর শুল্কনীতি গ্রহণ করে। এর অংশ হিসেবে ১৯৭৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য আইনের ১২২ নম্বর ধারার আওতায় গত ফেব্রুয়ারিতে এই ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করা হয়। শুল্কটি আগামী ২৪ জুলাই পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা ছিল।
এর আগে একই ধরনের উচ্চ হারের শুল্ক নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে ধাক্কা খাওয়ার পর প্রশাসন তুলনামূলক কম হারের এই সাময়িক শুল্ক চালু করে। কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দায়ের করা মামলায় আদালত এবার সেই সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।
রায়ের পর জে ফোরম্যান উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা লড়াই করেছি এবং জিতেছি।’ তার দাবি, এই শুল্ক ছোট ও মাঝারি ব্যবসার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছিল।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায়ের ফলে আরও অনেক কোম্পানি এখন আদালতে গিয়ে শুল্ক বাতিলের আবেদন করতে পারে। একইসঙ্গে ইতোমধ্যে পরিশোধ করা অর্থ ফেরতের দাবিও জোরালো হতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে মামলাটি ফেডারেল সার্কিট আপিল আদালত হয়ে আবারও সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়াতে পারে।
বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জন্য এই পরিস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি বাজার। ফলে মার্কিন শুল্কনীতিতে যেকোনও পরিবর্তন তৈরি পোশাক খাতসহ সামগ্রিক রফতানি প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ সুদহার এবং সরবরাহব্যবস্থার চাপের মধ্যে নতুন শুল্ক অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হয় এবং ভবিষ্যতে এই রায় অন্য আমদানিকারকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয় কিনা। কারণ সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত পাল্টা শুল্ক নীতির ভবিষ্যৎ।

















