জ্বালানি তেল: অরাজকতার নেপথ্যে কৃত্রিম সংকট ও দায়িত্বহীন নাগরিক
- আপডেট সময় : ১১:৩৮:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬ ২১ বার পড়া হয়েছে
‘নাগরিক দায়িত্ববোধ গড়ে না ওঠা একটি বড় ব্যর্থতা, যে কারণে ব্যক্তি স্বার্থের কাছে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বারবার পরাজিত হচ্ছে’
দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। সরকারের তরফে বারবার আশ্বস্ত করা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
ফিলিং স্টেশনে তেলের সংকট, আর অলিগলিতে চড়া দামে অবাধ বিক্রি। এই দ্বৈত পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দেয়, সমস্যার মূলে রয়েছে দায়িত্বহীনতা ও লোভ।
বিশেষজ্ঞরা সরাসরি বলছেন, দায়িত্বশীল নাগরিকের অভাবই আজকের এই অরাজকতার অন্যতম কারণ। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়েও দেশে নাগরিক দায়িত্ববোধ গড়ে না ওঠা একটি বড় ব্যর্থতা। ব্যক্তি স্বার্থের কাছে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বারবার পরাজিত হচ্ছে।
ফলে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নিচ্ছে একটি চক্র।
জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত এখন শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি জননিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। বাসাবাড়ি, গ্যারেজ ও গুদামে ঝুঁকিপূর্ণভাবে তেল সংরক্ষণ যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তবুও মুনাফার লোভে এসব কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে, যা নিঃসন্দেহে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।
সরকার ইতোমধ্যে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশজুড়ে অভিযান, মামলা, জরিমানা ও কারাদণ্ড সবই চলছে। অবৈধ মজুতের তথ্য দিলে পুরস্কার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। সীমান্তে নজরদারি জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, কেন এই অপরাধ বন্ধ হচ্ছে না? উত্তর একটাই, সামাজিকভাবে অসাধুতা প্রতিরোধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরবরাহ ব্যবস্থার ফাঁকফোকর খতিয়ে দেখা জরুরি। পাম্প মালিক ও সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশ ছাড়া এত বড় পরিসরে কালোবাজারি সম্ভব নয়। তাই কেবল অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্র যতই কঠোর হোক, নাগরিকদের দায়িত্বশীল না হলে এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিজের লাভের চিন্তা করা মানে পুরো দেশকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া।
এখনই সময় অসাধুদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নিজেদের ভূমিকা প্রমাণ করা। না হলে এই সংকট বারবার ফিরে আসবে, আর ভুক্তভোগী হবে সাধারণ মানুষই।
এদিকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এপ্রিল মাসেও জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত থাকবে। বর্তমানে ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১০০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা, পেট্রল ১১৬ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা নির্ধারিত রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট ১ লাখ ৯২ হাজার ৯১৯ টন জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে, যা দিয়ে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। মজুত তেলের মধ্যে রয়েছে, ডিজেল ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৩৯ টন, অকটেন ৭ হাজার ৯৪০ টন, পেট্রল ১১ হাজার ৪৩১ টন এবং জেট ফুয়েল ৪৪ হাজার ৬০৯ টন।
এপ্রিল মাসে দেশে আরও প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি হওয়ার কথা রয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল, যা প্রধানত কৃষি ও গণপরিবহন খাতে ব্যবহৃত হয়।
জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো, অফিস সময় কমানো এবং অনলাইন ক্লাস চালুর মতো বিভিন্ন উদ্যোগ সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলেও আশ্বস্ত করেছে মন্ত্রণালয়।














