ঢাকা ০৯:২৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
এলএনজি টার্মিনাল সচলে আরও পাঁচ দিন দেশজুড়ে গ্যাস সংকট তীব্র, বাসা-বাড়ি, শিল্প ও যানবাহনে চরম ভোগান্তি পরিবেশের মারাত্মক প্রভাবে হুমকির মুখে সুন্দরবন সশস্ত্র বাহিনীকে দলীয় হাতিয়ার হতে দেওয়া হবে না বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান ভারতের ঐতিহাসিক বৌদ্ধ তীর্থস্থান সারনাথ স্বামীর নির্যাতন বরিশালে আওয়ামী লীগ নেত্রীর আত্মহত্যা রোববার বঙ্গভবন ছাড়ছেন সদ্যবিদায়ি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ মেনে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছি: স্পিকার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর পদত্যাগপত্রে যা লিখেন রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জন আপনারা যেমন শুনেছেন, আমিও তেমনই শুনেছি  স্পিকার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন, জোরালো হচ্ছে রাজনৈতিক আলোচনা

চামড়া: অর্থনীতিতে আয়ের উৎস, সেই মূল্যবান সম্পদের এমন অর্থহীন পরিণতি!

বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৮:৩৫:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬ ২১৯ বার পড়া হয়েছে

তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

শুধু একটি কাঁচা চামড়া নয়, রাস্তার পাশে পড়ে ছিল দেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা, এতিমখানার স্বপ্ন আর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এক বড় উৎস। কোরবানির ঈদের পর রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়া থেকে সাতক্ষীরার নদীপাড়-দেশের নানা স্থানে যেভাবে চামড়া ফেলে রাখা, পুঁতে ফেলা কিংবা ভাগাড়ে নিক্ষেপের ঘটনা দেখা গেছে, তা দেশের চামড়া শিল্পের গভীর সংকটকেই সামনে এনে দিয়েছে। অথচ এই শিল্প একসময় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হিসেবে পরিচিত ছিল।

ঈদের দিন রাত ৯টার পর রাজধানীর মিরপুর-১০ সংলগ্ন কাজীপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে রাস্তার পাশে স্তূপ করে ফেলে রাখা হয়েছিল বেশ কিছু কাঁচা চামড়া। চারপাশে কোনো লোকজন নেই, নেই কোনো মালিকানার দাবিও। স্থানীয় চায়ের দোকানদার ও পথচারীরা জানান, দীর্ঘ সময় ধরেই চামড়াগুলো সেখানে পড়ে ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কোরবানির পশুর এসব চামড়া ফেলে দেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতিতে আয়ের উৎস, সেই মূল্যবান সম্পদের এমন অর্থহীন পরিণতি!
ছবি সংগ্রহ

শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। কোথাও রাস্তার পাশে, কোথাও নদীর তীরে, আবার কোথাও মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া। যে চামড়া দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম বড় উৎস হতে পারত, সেই মূল্যবান সম্পদই এবার যেন পরিণত হয়েছে অবহেলার প্রতীকে।

বিভিন্ন এলাকায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা শত শত গরুর চামড়া সংগ্রহ করলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমতে থাকে। অনেকেই শেষ পর্যন্ত চামড়া বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় ফেলে চলে যান। কেউ নামমাত্র দামে বিক্রি করেছেন, কেউ আবার আড়তে রেখেই বাড়ি ফিরেছেন।

সাতক্ষীরায় পরিস্থিতি ছিল আরও করুণ। জেলার বিভিন্ন এলাকায় চামড়া বিক্রি না হওয়ায় মৌসুমি ব্যবসায়ী ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ লোকসান ও দুর্গন্ধের ভয়ে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়ন থেকে আনা বেশ কিছু চামড়া শুক্রবার সকালে বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের নীলডুমুর খেয়াঘাট এলাকায় খোলপেটুয়া নদীর পাড়ে স্তূপাকারে পড়ে থাকতে দেখা যায়।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশেও কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে ব্যাপক ধস নামে। অনেক এলাকায় চামড়া কিনতে কোনো ব্যবসায়ীই যাননি। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই চামড়া উপজেলা সদরে নিয়ে এলেও সেখানে কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে কেউ চামড়া ফেলে রেখে চলে যান, আবার কেউ স্থানীয় মাদরাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে দান করে দেন।

অর্থনীতিতে আয়ের উৎস, সেই মূল্যবান সম্পদের এমন অর্থহীন পরিণতি!
ছবি সংগ্রহ

ঢাকার লালবাগের পোস্তার চিত্র ছিলো ভিন্ন, ঈদের দিন বিকেল থেকে বিভিন্ন স্থান থেকে কাঁচা চামড়া আসতে শুরু করে। শুরুতে বড় আকারের ভালো চামড়া ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমে যায়। শেষ দিকে ভালো চামড়ার দাম নেমে আসে ৫০০ টাকায়। সামান্য কাটা বা ছিদ্র থাকলে দাম ১০০ থেকে ২০০ টাকায় নেমে যায়। অনেকে অভিযোগ করেন, এক ধরনের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে।

সরকার নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজার বাস্তবতার বড় ধরনের অমিলও দেখা গেছে। এ বছর ঢাকার ভেতরে গরুর কাঁচা চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়। খাসির চামড়ার দাম ধরা হয় প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম ২২ থেকে ২৫ টাকা। কিন্তু বাস্তবে সেই অনুপাতে দাম পাননি বিক্রেতারা।

মাদরাসা, এতিমখানা ও মৌসুমি সংগ্রহকারীরা বলছেন, সরকার নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারের কোনো মিল নেই। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি, ট্যানারি মালিকদের বকেয়া অর্থ, নগদ সংকট এবং আড়তদারদের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ না পৌঁছানোয় বাজারে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এবার কোরবানিযোগ্য পশুর চাহিদা ছিল এক কোটি এক লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। বিপরীতে প্রস্তুত ছিল এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশু। এর মধ্যে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু ও মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল ও ভেড়া এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রাণী ছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, সারা বছরের মোট কাঁচা চামড়ার প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশই আসে কোরবানির ঈদ থেকে।

অর্থনীতিতে আয়ের উৎস, সেই মূল্যবান সম্পদের এমন অর্থহীন পরিণতি!
ছবি সংগ্রহ

চামড়া বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী সম্পদ এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। এই কাঁচামাল থেকে জুতা, ব্যাগ, জ্যাকেটসহ বিভিন্ন চামড়াজাত পণ্য তৈরি হয়ে বিদেশে রপ্তানি হয়। বিশেষ করে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশি চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা রয়েছে। অথচ সঠিক সংরক্ষণ, ন্যায্যমূল্য ও বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে এই সম্ভাবনাময় শিল্প বারবার সংকটে পড়ছে।

সরকার অবশ্য চামড়া ব্যবস্থাপনায় নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। কোরবানির মৌসুমে চামড়ার সুষ্ঠু সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিপণন কার্যক্রম তদারকিতে শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আমিনবাজারের চামড়া বিক্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, চামড়া শিল্প দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত এবং কোনো ধরনের অব্যবস্থাপনা বা সিন্ডিকেট যাতে না হয়, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে।

চামড়া সংরক্ষণের জন্য সরকার বিনামূল্যে লবণ সরবরাহ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক ট্যানারি মালিকদের চামড়া কেনার জন্য ঋণ সুবিধা দেওয়ার নির্দেশনা দেয়। গত বছর কাঁচা চামড়া কিনতে ২৩২ কোটি টাকার ঋণ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এবারও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যাতে ট্যানারি মালিকরা পর্যাপ্ত কাঁচা চামড়া কিনতে পারেন।

অর্থনীতিতে আয়ের উৎস, সেই মূল্যবান সম্পদের এমন অর্থহীন পরিণতি!
ছবি সংগ্রহ

তবে খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ঋণ অনুমোদন দিলেই হবে না, সেই অর্থ দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে হবে। বিশেষ করে পোস্তার আড়তদার ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ না থাকলে বাজারে কাঙ্ক্ষিত দামে চামড়া কেনাবেচা সম্ভব হয় না।

ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনোমিক রিসার্চ সেন্টারের (পিটিইআরসি) চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক বলেন, এভাবে দেশের সম্পদ নষ্ট হতে দেখাটা খুবই পীড়াদায়ক। চামড়াগুলো সংরক্ষণ করা গেলে দেশের অর্থনীতিও লাভবান হতো, পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মানুষও বাড়তি আয় করতে পারতেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চামড়া শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকি, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত অর্থ ছাড়, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং রপ্তানিমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় দেশের অন্যতম অর্থকরী সম্পদ হয়েও কোরবানির চামড়া প্রতি বছরই ‘অর্থহীন পরিণতি’র শিকার হতে থাকবে।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

চামড়া: অর্থনীতিতে আয়ের উৎস, সেই মূল্যবান সম্পদের এমন অর্থহীন পরিণতি!

আপডেট সময় : ০৮:৩৫:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬

শুধু একটি কাঁচা চামড়া নয়, রাস্তার পাশে পড়ে ছিল দেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা, এতিমখানার স্বপ্ন আর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এক বড় উৎস। কোরবানির ঈদের পর রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়া থেকে সাতক্ষীরার নদীপাড়-দেশের নানা স্থানে যেভাবে চামড়া ফেলে রাখা, পুঁতে ফেলা কিংবা ভাগাড়ে নিক্ষেপের ঘটনা দেখা গেছে, তা দেশের চামড়া শিল্পের গভীর সংকটকেই সামনে এনে দিয়েছে। অথচ এই শিল্প একসময় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হিসেবে পরিচিত ছিল।

ঈদের দিন রাত ৯টার পর রাজধানীর মিরপুর-১০ সংলগ্ন কাজীপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে রাস্তার পাশে স্তূপ করে ফেলে রাখা হয়েছিল বেশ কিছু কাঁচা চামড়া। চারপাশে কোনো লোকজন নেই, নেই কোনো মালিকানার দাবিও। স্থানীয় চায়ের দোকানদার ও পথচারীরা জানান, দীর্ঘ সময় ধরেই চামড়াগুলো সেখানে পড়ে ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কোরবানির পশুর এসব চামড়া ফেলে দেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতিতে আয়ের উৎস, সেই মূল্যবান সম্পদের এমন অর্থহীন পরিণতি!
ছবি সংগ্রহ

শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। কোথাও রাস্তার পাশে, কোথাও নদীর তীরে, আবার কোথাও মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া। যে চামড়া দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম বড় উৎস হতে পারত, সেই মূল্যবান সম্পদই এবার যেন পরিণত হয়েছে অবহেলার প্রতীকে।

বিভিন্ন এলাকায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা শত শত গরুর চামড়া সংগ্রহ করলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমতে থাকে। অনেকেই শেষ পর্যন্ত চামড়া বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় ফেলে চলে যান। কেউ নামমাত্র দামে বিক্রি করেছেন, কেউ আবার আড়তে রেখেই বাড়ি ফিরেছেন।

সাতক্ষীরায় পরিস্থিতি ছিল আরও করুণ। জেলার বিভিন্ন এলাকায় চামড়া বিক্রি না হওয়ায় মৌসুমি ব্যবসায়ী ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ লোকসান ও দুর্গন্ধের ভয়ে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়ন থেকে আনা বেশ কিছু চামড়া শুক্রবার সকালে বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের নীলডুমুর খেয়াঘাট এলাকায় খোলপেটুয়া নদীর পাড়ে স্তূপাকারে পড়ে থাকতে দেখা যায়।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশেও কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে ব্যাপক ধস নামে। অনেক এলাকায় চামড়া কিনতে কোনো ব্যবসায়ীই যাননি। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই চামড়া উপজেলা সদরে নিয়ে এলেও সেখানে কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে কেউ চামড়া ফেলে রেখে চলে যান, আবার কেউ স্থানীয় মাদরাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে দান করে দেন।

অর্থনীতিতে আয়ের উৎস, সেই মূল্যবান সম্পদের এমন অর্থহীন পরিণতি!
ছবি সংগ্রহ

ঢাকার লালবাগের পোস্তার চিত্র ছিলো ভিন্ন, ঈদের দিন বিকেল থেকে বিভিন্ন স্থান থেকে কাঁচা চামড়া আসতে শুরু করে। শুরুতে বড় আকারের ভালো চামড়া ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমে যায়। শেষ দিকে ভালো চামড়ার দাম নেমে আসে ৫০০ টাকায়। সামান্য কাটা বা ছিদ্র থাকলে দাম ১০০ থেকে ২০০ টাকায় নেমে যায়। অনেকে অভিযোগ করেন, এক ধরনের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে।

সরকার নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজার বাস্তবতার বড় ধরনের অমিলও দেখা গেছে। এ বছর ঢাকার ভেতরে গরুর কাঁচা চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়। খাসির চামড়ার দাম ধরা হয় প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম ২২ থেকে ২৫ টাকা। কিন্তু বাস্তবে সেই অনুপাতে দাম পাননি বিক্রেতারা।

মাদরাসা, এতিমখানা ও মৌসুমি সংগ্রহকারীরা বলছেন, সরকার নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারের কোনো মিল নেই। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি, ট্যানারি মালিকদের বকেয়া অর্থ, নগদ সংকট এবং আড়তদারদের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ না পৌঁছানোয় বাজারে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এবার কোরবানিযোগ্য পশুর চাহিদা ছিল এক কোটি এক লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। বিপরীতে প্রস্তুত ছিল এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশু। এর মধ্যে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু ও মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল ও ভেড়া এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রাণী ছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, সারা বছরের মোট কাঁচা চামড়ার প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশই আসে কোরবানির ঈদ থেকে।

অর্থনীতিতে আয়ের উৎস, সেই মূল্যবান সম্পদের এমন অর্থহীন পরিণতি!
ছবি সংগ্রহ

চামড়া বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী সম্পদ এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। এই কাঁচামাল থেকে জুতা, ব্যাগ, জ্যাকেটসহ বিভিন্ন চামড়াজাত পণ্য তৈরি হয়ে বিদেশে রপ্তানি হয়। বিশেষ করে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশি চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা রয়েছে। অথচ সঠিক সংরক্ষণ, ন্যায্যমূল্য ও বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে এই সম্ভাবনাময় শিল্প বারবার সংকটে পড়ছে।

সরকার অবশ্য চামড়া ব্যবস্থাপনায় নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। কোরবানির মৌসুমে চামড়ার সুষ্ঠু সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিপণন কার্যক্রম তদারকিতে শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আমিনবাজারের চামড়া বিক্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, চামড়া শিল্প দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত এবং কোনো ধরনের অব্যবস্থাপনা বা সিন্ডিকেট যাতে না হয়, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে।

চামড়া সংরক্ষণের জন্য সরকার বিনামূল্যে লবণ সরবরাহ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক ট্যানারি মালিকদের চামড়া কেনার জন্য ঋণ সুবিধা দেওয়ার নির্দেশনা দেয়। গত বছর কাঁচা চামড়া কিনতে ২৩২ কোটি টাকার ঋণ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এবারও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যাতে ট্যানারি মালিকরা পর্যাপ্ত কাঁচা চামড়া কিনতে পারেন।

অর্থনীতিতে আয়ের উৎস, সেই মূল্যবান সম্পদের এমন অর্থহীন পরিণতি!
ছবি সংগ্রহ

তবে খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ঋণ অনুমোদন দিলেই হবে না, সেই অর্থ দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে হবে। বিশেষ করে পোস্তার আড়তদার ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ না থাকলে বাজারে কাঙ্ক্ষিত দামে চামড়া কেনাবেচা সম্ভব হয় না।

ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনোমিক রিসার্চ সেন্টারের (পিটিইআরসি) চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক বলেন, এভাবে দেশের সম্পদ নষ্ট হতে দেখাটা খুবই পীড়াদায়ক। চামড়াগুলো সংরক্ষণ করা গেলে দেশের অর্থনীতিও লাভবান হতো, পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মানুষও বাড়তি আয় করতে পারতেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চামড়া শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকি, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত অর্থ ছাড়, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং রপ্তানিমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় দেশের অন্যতম অর্থকরী সম্পদ হয়েও কোরবানির চামড়া প্রতি বছরই ‘অর্থহীন পরিণতি’র শিকার হতে থাকবে।