ঢাকা ০৪:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
কাগজে নদীর সংখ্যা বাড়ছে নদী রক্ষাই এখন সবচেয়ে বড় সংকট সাশ্রয়ী আবাসন অর্থায়নে বাংলাদেশকে ১০ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে এডিবি শেরপুর সীমান্তে ভারতীয় সাবান-মদ জব্দ বিজিবির গরু আটক নিয়ে চাঞ্চল্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের সমাধান কেবল কূটনীতিতেই: ইরান চুরির অভিযোগে খুঁটিতে বাঁধা বাবা, চা-রুটি খাইয়ে দিচ্ছিল ৯ বছরের মেয়ে জাতিসংঘ সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী বিরাজলক্ষী ঘোষের কবিতা ‘ঈশ্বরের সাথে মেঘের মাঝে’ সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী আয়ুর্বেদে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ  গবেষণা কেন্দ্র গঠনের প্রস্তাব এখনও ডিজেলে লোকসান লিটারে ৭০ টাকা : রিজভী

ঢাকায় আত্মসমর্পণ: কীভাবে দেশে ফিরেছিল ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য?

ভয়েস ডিজিটাল ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৪:১২:৫৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬ ৪৬৭ বার পড়া হয়েছে

ঢাকায় আত্মসমর্পণ: কীভাবে দেশে ফিরেছিল ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য? :চি সংগ্রহ

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দান-এ আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক মুহূর্তের পর মিত্রবাহিনীর (বাংলাদেশ-ভারত যৌথবাহিনী) তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল সুসংগঠিত, দায়িত্বশীল এবং মানবিক-যা বিশ্বদরবারে নতুন রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানকে দৃঢ়ভাবে তুলে ধরে।

আত্মসমর্পণের পরপরই মিত্রবাহিনী ঢাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে দ্রুত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা বা প্রতিশোধমূলক সহিংসতা ছড়িয়ে না পড়ে।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানের প্রায় ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দিকে কীভাবে ফেরত পাঠানো হয়েছিল, এটি শুধু একটি মানবিক বা প্রশাসনিক ঘটনা নয়, বরং জটিল কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আইন এবং আঞ্চলিক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

যুদ্ধবন্দীদের খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, যা সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মানবিক অবস্থানকে বিশ্বে প্রশংসিত করে।

নিরাপত্তা ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনার জন্য অধিকাংশ যুদ্ধবন্দীকে ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে ভারত সরকার তাদের তত্ত্বাবধান করে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত ঢাকায় লুটপাট বা প্রতিশোধমূলক হামলা ঠেকাতে যৌথবাহিনী টহল জোরদার করে এবং প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনে সহায়তা দেয়।

ঢাকায় আত্মসমর্পণ: কীভাবে দেশে ফিরেছিল ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য?
৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পনের প্রস্তুতি : ছবি সংগ্রহ

ভয়াবহ গণহত্যার শিকার হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ প্রতিশোধ নয়, মানবিকতা ও আন্তর্জাতিক নীতিকে প্রাধান্য দেয়, যা নতুন রাষ্ট্রের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক বিজয় হিসেবে বিবেচিত হয়।

সংক্ষেপে, মিত্রবাহিনীর তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ শুধু সামরিক সাফল্যকে সুসংহত করেনি, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের দায়িত্বশীল ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশকে আরও শক্তিশালী করেছে।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানের প্রায় ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দিকে কীভাবে ফেরত পাঠানো হয়েছিল, এটি শুধু একটি মানবিক বা প্রশাসনিক ঘটনা নয়, বরং জটিল কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আইন এবং আঞ্চলিক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

আত্মসমর্পণ ও যুদ্ধবন্দি হওয়া

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনা, আধা-সামরিক সদস্য এবং বেসামরিক ব্যক্তি যুদ্ধবন্দি হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত বড় সংখ্যক সেনা আত্মসমর্পণের ঘটনা আর দেখা যায়নি।

এই বন্দিদের মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার ছিলেন সামরিক, আধা-সামরিক ও পুলিশ সদস্য। বাকি প্রায় ১৩ হাজার ছিলেন বেসামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিক এবং তাদের পরিবারের সদস্য।

ঢাকায় আত্মসমর্পণ: কীভাবে দেশে ফিরেছিল ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য?
ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পন : ছবি সংগ্রহ

কেন ভারতে নেওয়া হয়েছিল

আত্মসমর্পণের পর প্রথমদিকে এসব যুদ্ধবন্দিকে ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে রাখা হয়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার চেয়েছিল দেশে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ তখন খাদ্য, আশ্রয় ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত। এত বিপুল সংখ্যক বন্দির নিরাপত্তা, খাবার ও আবাসনের ব্যবস্থা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। পাশাপাশি পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার কারণে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ছিল, যা বন্দিদের নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

এছাড়া আত্মসমর্পণ চুক্তিতে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধবন্দিদের নিরাপত্তা ও মানবিক আচরণের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়—বন্দিদের ভারতে স্থানান্তর করা হবে।

ভারতে বন্দিশিবিরে রাখা

আত্মসমর্পণের কিছুদিনের মধ্যেই স্থল ও আকাশপথে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের ভারতে পাঠানো হয়। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিমানে এবং সাধারণ সৈন্যদের ট্রাক ও ট্রেনে করে স্থানান্তর করা হয়।

ভারতের কলকাতা, জব্বলপুর, আগ্রা, রাঁচি, বিহারসহ বিভিন্ন স্থানে বন্দিশিবির গড়ে তোলা হয়। জেনারেল নিয়াজী তার স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেন, প্রথমে তাকে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে রাখা হয়, পরে জব্বলপুরের একটি বিশেষ শিবিরে স্থানান্তর করা হয়। এসব শিবির ছিল কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত—কাঁটাতারের বেড়া, প্রহরী টাওয়ার ও সার্বক্ষণিক পাহারায় আবদ্ধ।

বন্দিদের ঘিরে কূটনৈতিক টানাপোড়েন

এই ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দি দ্রুতই একটি বড় কূটনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। পাকিস্তান তাদের দ্রুত মুক্তির দাবি জানায় এবং জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে।

ভারত জানায়, বিষয়টি এককভাবে তাদের সিদ্ধান্ত নয়—বাংলাদেশের সম্মতি ছাড়া বন্দিদের মুক্তি সম্ভব নয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ স্পষ্ট করে দেয়, পাকিস্তানের কারাগারে আটক থাকা জাতির নেতা শেখ মুজিবুর রহমান-এর মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বন্দিদের বিষয়ে কোনো আলোচনা হবে না।

এই চাপের মুখে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান। এতে কূটনৈতিক সমীকরণ বদলে যায়।

ঢাকায় আত্মসমর্পণ: কীভাবে দেশে ফিরেছিল ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য?
ঢাকায় আত্মসমর্পণ: কীভাবে দেশে ফিরেছিল ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য?

সিমলা চুক্তি: মোড় ঘোরানো মুহূর্ত

১৯৭২ সালের জুলাই মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো-এর মধ্যে সিমলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ‘সিমলা চুক্তি’ নামে পরিচিত।

এই চুক্তির মূল বিষয়গুলো ছিল—

  • ভারত ও পাকিস্তান পারস্পরিক বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করবে
  • কাশ্মীর সীমান্তে নিয়ন্ত্রণরেখা (LoC) বজায় থাকবে
  • পাকিস্তান বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করবে
  • ভারত পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের ফেরত পাঠাবে

এই চুক্তির মাধ্যমেই যুদ্ধবন্দিদের দেশে ফেরার পথ মূলত উন্মুক্ত হয়।

দিল্লি চুক্তি ও বন্দি বিনিময়

পরবর্তী ধাপে ১৯৭৩ সালের আগস্টে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দিল্লিতে ত্রিপক্ষীয় একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

এই চুক্তিতে বলা হয়—

  • ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ছাড়া বাকি সব বন্দিকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হবে
  • পাকিস্তানে আটক বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে
  • বাংলাদেশে থাকা উর্দুভাষী বিহারিদের পাকিস্তানে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে

এই চুক্তির ফলে যুদ্ধবন্দিদের প্রত্যাবাসন কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।

ঢাকায় আত্মসমর্পণ: কীভাবে দেশে ফিরেছিল ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য?
ঢাকায় আত্মসমর্পণ: কীভাবে দেশে ফিরেছিল ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য?

প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া

১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ধাপে ধাপে বন্দিদের ফেরত পাঠানো শুরু হয়। স্থলপথে প্রধানত ওয়াঘা সীমান্ত ব্যবহার করা হয়। হাজার হাজার বন্দিকে পর্যায়ক্রমে ভারতে থাকা শিবির থেকে এনে পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

প্রথমে সাধারণ সৈন্য ও বেসামরিক বন্দিদের পাঠানো হয়। তবে ১৯৫ জন অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীকে বাংলাদেশ বিচারের জন্য রেখে দিতে চেয়েছিল।

শেষ পর্যায় ও নিয়াজীর প্রত্যাবর্তন

পাকিস্তান সরকার এসব ১৯৫ জনকেও ফেরত নেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। পরবর্তীতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকার শেষ পর্যন্ত তাদের ফেরত পাঠাতে সম্মত হয়।

১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে সর্বশেষ যুদ্ধবন্দি হিসেবে জেনারেল নিয়াজীকে ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দেড় বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই বিশাল যুদ্ধবন্দি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সমাপ্তি ঘটে।

উপসংহার

একাত্তরের ৯৩ হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দির ঘটনা শুধু সামরিক ইতিহাস নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও মানবিক আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক পুনর্গঠন, শেখ মুজিবের মুক্তি, এমনকি কাশ্মীর ইস্যুতেও এই বন্দিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

সবশেষে বলা যায়, যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয়ের পর বন্দিত্ব—আর তারপর কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে প্রত্যাবর্তন-এই পুরো প্রক্রিয়াটি দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এক অনন্য নজির হয়ে আছে। সূত্র বিবিসি

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :