নৃশংস ৭ বছরের শিশুর হাত চেপে ধরেন স্ত্রী আঙ্গুল কাটেন পুলিশ কনস্টেবল
- আপডেট সময় : ০৬:২০:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬ বার পড়া হয়েছে
আইনের রক্ষক যখন নিজেই আইনের সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও আস্থার জায়গাটি কোথায় দাঁড়ায়, নাটোরের সাত বছরের শিশু বায়েজিদ বিন মাহমুদের ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনা সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে।
পারিবারিক বিরোধের জেরে একটি শিশুকে জোর করে ঘরে আটকে রেখে তার হাতের আঙুল ধারালো বঁটি দিয়ে কেটে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক পুলিশ কনস্টেবল ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে। অভিযোগটি শুধু একটি শিশুর ওপর নৃশংস হামলাই নয়, বরং একজন পুলিশ সদস্যের দায়িত্ব ও মানবিকতার প্রশ্নেও গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়।
অভিযুক্ত পুলিশ কনস্টেবল শাকিল হোসেন সবশেষ নাটোর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। তার স্ত্রী নাহরিনের বিরুদ্ধেও একই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করেছে। একই সঙ্গে ঘটনার বিষয়ে বিভাগীয় তদন্তের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনার সূত্রপাত একটি পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে। বুধবার সন্ধ্যায় নাটোর পৌরসভার হরিশপুর চেয়ারম্যান রোড এলাকায় মাহমুদুল হাসান মিলনের বাড়িতে পরিবারের সদস্য ও ভাড়াটিয়াদের নিয়ে পিকনিকের আয়োজন করা হয়। একপর্যায়ে শাকিল হোসেনের শিশুসন্তানের সঙ্গে মিলনের সাত বছরের ছেলে বায়েজিদের মারামারি হয়। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে মীমাংসা করে দেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, এর জের ধরে পরদিন সকালে শাকিল হোসেন ও তার স্ত্রী নাহরিন ওই বাসায় প্রবেশ করেন। তারা বায়েজিদকে জোর করে নিজেদের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরিবারের সদস্যরা বাধা দিলে তাদের সরিয়ে দিয়ে শিশুটিকে একটি কক্ষে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
এরপর শিশুটির ভাষ্য অনুযায়ী, নাহরিন তার ডান হাতের শাহাদাত আঙুল ধরে রাখেন এবং শাকিল হোসেন ধারালো বঁটি দিয়ে সেই আঙুলে উপর্যুপরি কোপ দেন। এতে শিশুটির আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

একটি শিশুর জন্য আঙুল হারানোর যন্ত্রণা শুধু শারীরিক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আতঙ্ক, নিরাপত্তাহীনতা এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষত। যে বয়সে একটি শিশুর খেলাধুলা, পড়াশোনা ও স্বাভাবিক শৈশব কাটানোর কথা, সেই বয়সেই তাকে এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার পর পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা শিশুটিকে উদ্ধার করে নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সে সেখানে চিকিৎসাধীন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিশুটির বাবা মাহমুদুল হাসান মিলন বৃহস্পতিবার নাটোর থানায় মামলা করেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়ের আলম জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় মামলা রেকর্ড করা হয়েছে এবং শাকিল ও তার স্ত্রীকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তও করা হবে।
পুলিশের পোশাক মানুষের কাছে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও আস্থার প্রতীক। সেই পোশাক পরা একজন সদস্যের বিরুদ্ধে যদি একটি শিশুকে অপহরণের মতো করে তুলে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রমাণের বিষয় হলেও ঘটনাটির নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত, শিশুটির যথাযথ চিকিৎসা এবং তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
কারণ একটি শিশুর আঙুলের ক্ষত হয়তো চিকিৎসায় কিছুটা সেরে উঠবে, কিন্তু তার মনে তৈরি হওয়া ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার ক্ষত সারাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সহায়তা। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা এমন অভিযোগের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করাই পারে সাধারণ মানুষের আস্থা অটুট রাখতে।

















