হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নতুন কৌশল: এবার লক্ষ্য বৈশ্বিক ইন্টারনেট ও ডেটা প্রবাহ
- আপডেট সময় : ০৪:০৭:১০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬ ৪৩ বার পড়া হয়েছে
ইরান এবার হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্বকে নতুনভাবে কাজে লাগানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। তেল পরিবহনের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই জলপথ এখন বৈশ্বিক ইন্টারনেট ও আর্থিক যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কারণ ইউরোপ, এশিয়া ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ইন্টারনেট ও ডেটা আদান-প্রদান হয় সমুদ্রতলের সাবসি ক্যাবলের মাধ্যমে, যার একটি অংশ হরমুজ প্রণালীর নিচ দিয়ে গেছে। এই অবকাঠামোকে কেন্দ্র করেই নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ তৈরির চেষ্টা করছে তেহরান।
সম্প্রতি ইরানের সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ঘোষণা দেন যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া সাবসি ইন্টারনেট ক্যাবলের ওপর ফি আরোপ করা হবে।
ইরানের রাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলোও জানিয়েছে, গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা ও অ্যামাজনের মতো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইরানের আইন মেনে লাইসেন্স ফি দিতে হবে।
পাশাপাশি সাবমেরিন ক্যাবলের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজ শুধুমাত্র ইরানি কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে পরিচালনার কথাও বলা হয়েছে।
যদিও এখনো পরিষ্কার নয় যে সংশ্লিষ্ট সব ক্যাবল ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়ে গেছে কি না, তবুও তেহরানের বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
কারণ যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য সরাসরি ইরানকে অর্থ প্রদান করা প্রায় অসম্ভব। ফলে বিশ্লেষকদের অনেকে এটিকে কৌশলগত চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবেই দেখছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাবসি ক্যাবল বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান অবকাঠামো। বিশ্বের অধিকাংশ ইন্টারনেট ট্রাফিক, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেন, সামরিক যোগাযোগ, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবার বড় অংশ এই ক্যাবলের ওপর নির্ভরশীল।
তাই এসব ক্যাবলে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে শুধু ইন্টারনেটের গতি কমবে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।

ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান দিনা এসফান্দিয়ারির মতে, ইরানের এই অবস্থান মূলত বিশ্বকে বার্তা দেওয়ার কৌশল। তার ভাষায়, ইরান এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় যাতে দেশটির বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে বিশ্বশক্তিগুলো অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করতে বাধ্য হয়।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীর ওমান অংশ দিয়ে বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক সাবসি ক্যাবল গেছে। দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অপারেটররা সচেতনভাবেই ইরানের জলসীমা এড়িয়ে চলেছে। তবে ফ্যালকন ও গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল (জিবিআই) নামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবল ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়েও গেছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরান সরাসরি ক্যাবল নাশকতার হুমকি না দিলেও দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সক্ষমতা উদ্বেগের কারণ। ডুবুরি ইউনিট, ছোট সাবমেরিন এবং পানির নিচের ড্রোন ব্যবহার করে এই বাহিনী সাবসি অবকাঠামোতে হামলা চালাতে সক্ষম বলে ধারণা করা হয়। এমন কোনো ঘটনা ঘটলে তা ডিজিটাল বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং অনলাইন সেবা বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে। একই সঙ্গে ভারত, সিঙ্গাপুর ও ইউরোপের মধ্যে ডেটা যোগাযোগও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে ভারতের আউটসোর্সিং শিল্প বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের ব্যাংকিং, ফ্রিল্যান্সিং, আউটসোর্সিং এবং আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সেবার একটি বড় অংশ বৈশ্বিক সাবসি নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল।
ফলে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে কোনো বড় ধরনের সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

















