হাওরের ফসল রক্ষায় সরকারের মহাপরিকল্পনা, ড্রেজিং হবে ১৩ নদী, বাঁচবে লাখো কৃষকের স্বপ্ন
- আপডেট সময় : ০১:০৮:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬ ২৬ বার পড়া হয়েছে
হাওরের কৃষকরা এখন এই প্রকল্প বাস্তবায়নের অপেক্ষায়, বছরের পর বছর ফসলহানির যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানো কৃষকদের মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা বিশ্বাস করছেন, সরকারের এই সময়োপযোগী ও টেকসই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে হাওরে আবারও স্বস্তি ফিরবে, কৃষকের ঘরে উঠবে সোনালি ধান, আর দেশের খাদ্যভান্ডার হবে আরও সমৃদ্ধ
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা দেশের অন্যতম শস্যভান্ডার। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে উৎপাদিত বোরো ধান দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু প্রতিবছর আগাম বন্যা, পাহাড়ি ঢল এবং নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে কৃষকের স্বপ্নভঙ্গ হয়।
ফসল ঘরে তোলার আগেই ঢলের জলে তলিয়ে যায় হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান। এতে কৃষকরা যেমন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন, তেমনি দেশের খাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এই দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে এবার বড় উদ্যোগ নিয়েছে তারেক রহমান সরকার। হাওর অঞ্চলের ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ নদী ড্রেজিং, খাল পুনঃখনন এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে আগাম বন্যা মোকাবিলার একটি সমন্বিত প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
হাওর অঞ্চলের আগাম বন্যা ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন (১ম পর্যায়) শীর্ষক এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কৃষকের ফসল রক্ষা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
সরকারের প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৪২৯ কোটি টাকা। এর আওতায় ৩০৩ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং করা হবে। প্রতি ঘনমিটার মাটি অপসারণে প্রায় ১৯৩ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো নদীগুলোর পানি ধারণ ও নিষ্কাশন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা, যাতে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত ভাটির দিকে নেমে যেতে পারে এবং হাওরের বোরো ফসল দীর্ঘসময় পানির নিচে আটকে না থাকে।

প্রকল্পের আওতায় সুরমা, বাউলাই, ধনু, ঘোড়াউত্রা, আপার মেঘনা, পুরাতন সুরমা, দাড়াইন, চামতি, সোমেশ্বরী, কাউনাই, বাউলাই-পাটনাই, গাং ও আবুয়া নদী খনন করা হবে। এর মধ্যে আটটি নদী সুনামগঞ্জে এবং পাঁচটি কিশোরগঞ্জে অবস্থিত।
পাশাপাশি বিভিন্ন খাল পুনঃখনন ও ড্রেনেজ আউটলেট নির্মাণের কাজও করা হবে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় এক লাখ ৬৫ হাজার ২৩০ হেক্টর কৃষিজমি আগাম বন্যার ক্ষতি থেকে সুরক্ষা পাবে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) জানিয়েছে, ড্রেজিং কার্যক্রম তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রিভার সিস্টেমকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হবে। এগুলো হলো, সুরমা-বাউলাই-আপার মেঘনা রিভার সিস্টেম, পুরাতন সুরমা রিভার সিস্টেম এবং আবুয়া-পাটনাই-কাউনাই রিভার সিস্টেম।

এসব নদীর তলদেশে বছরের পর বছর পলি ও বালু জমে নাব্যতা কমে গেছে। ফলে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে না। এতে আকস্মিক বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হক জানিয়েছেন, ভারতের মেঘালয় ও আসাম অঞ্চলে অতিবৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে এসে সুনামগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলে প্রবেশ করে। কিন্তু নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেই পানি দ্রুত নামতে পারে না।
ফলে আগাম বন্যা সৃষ্টি হয় এবং কৃষকের বোরো ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তিনি বলেন, নদী ড্রেজিং করা হলে পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা বাড়বে এবং কৃষকের ধান রক্ষা করা সম্ভব হবে।
প্রতিবছর আগাম বন্যার কারণে শুধু ফসলের ক্ষতিই হয় না, কৃষকদের পরবর্তী মৌসুমের প্রস্তুতিও বাধাগ্রস্ত হয়। হাওরের পানি দীর্ঘসময় আটকে থাকায় বীজতলা তৈরি ও চারা রোপণের সময় কমে আসে।

এতে উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং কৃষকের ব্যয় বাড়ে। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নদী ড্রেজিং ও পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।
সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পটির বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লি প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পের কার্যক্রম চলবে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার ১৬টি উপজেলায়।
সভায় প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠলেও বাপাউবো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেন। প্রকল্পের আওতায় ১২টি মোটরসাইকেল কেনার জন্য ১৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যাতে তিন জেলার প্রকল্প কার্যক্রম তদারকি সহজ হয়।
এছাড়া একটি পরিদর্শন বাংলো নির্মাণ এবং কয়েকটি ভবন সংস্কারের বিষয়েও আলোচনা হয়। পরে প্রকল্পের বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায় সেগুলোর যৌক্তিকতা গ্রহণ করা হয়।

এই প্রকল্পের আওতায় এক হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতিপূরণ বাবদ ২৫ কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা কিছুটা আর্থিক সহায়তা পাবেন।
একই সঙ্গে ড্রেনেজ আউটলেট ও খাল পুনঃখননের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা সমস্যারও সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১৫ লাখ টন বোরো ধান আগাম বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে। এতে দেশের খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে কৃষকের জীবনমান উন্নত হবে এবং হাওরাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
হাওরের কৃষকরা এখন এই প্রকল্প বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন। বছরের পর বছর ফসলহানির যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানো কৃষকদের মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা বিশ্বাস করছেন, সরকারের এই সময়োপযোগী ও টেকসই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে হাওরে আবারও স্বস্তি ফিরবে, কৃষকের ঘরে উঠবে সোনালি ধান, আর দেশের খাদ্যভান্ডার হবে আরও সমৃদ্ধ।
















