সর্বনাশা ঢল: হাওরের কান্নায় ডুবে যাচ্ছে স্বপ্ন, নিঃস্ব কৃষকের অসহায় আর্তনাদ
- আপডেট সময় : ১০:২১:৪৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে
কোমর সমান পানিতে নেমে ধান কাটছেন কৃষকরা। রোববার কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের বড় হাওর থেকে তোলা: ছবি সংগ্রহ
হাওর-বাংলার শস্যভান্ডার, জীবনের ছন্দ, উৎসবের রঙ। বছরের এই সময়টায় যখন নতুন ধানের ঘ্রাণে ভরে ওঠে গ্রাম, উঠোনে সাজে পিঠা-পুলি, তখনই যেন এক নির্মম বাস্তবতা এসে সবকিছু কেড়ে নিল। অতিরিক্ত বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ডুবে গেল সোনালি স্বপ্ন।
সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার এই সাত জেলার হাওরজুড়ে এখন একটাই দৃশ্য: পানির নিচে তলিয়ে থাকা ধানক্ষেত, আর নিঃস্ব হয়ে পড়া কৃষকের দীর্ঘশ্বাস। কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্টদের হিসাবে অন্তত এক লাখ হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় দেড় লাখ কৃষক পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই।
যে মাঠে কিছুদিন আগেও ছিল ব্যস্ততা, সেখানে এখন শুধু পানি আর পচা ধানের গন্ধ। অনেক জায়গায় কাটা ধানও রক্ষা পায়নি, মাড়াইয়ের আগেই পানিতে ভিজে অঙ্কুর গজিয়েছে, নষ্ট হয়েছে ফসল।
এই বিপর্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে। নিজের চোখের সামনে ফসল হারানোর শোক সইতে না পেরে কৃষক আক্তার হোসেন (৫৮) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। ঋণের বোঝা আর জীবনের একমাত্র অবলম্বন হারানোর কষ্ট তাকে শেষ করে দিয়েছে। এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি পুরো কৃষক সমাজের অসহায়তার প্রতীক।
এদিকে ক্ষতি কমানোর জন্য যে উদ্যোগগুলো নেওয়ার কথা ছিল, তার বাস্তবতা হতাশাজনক। ১১ হাজার ধান শুকানোর ড্রায়ার দেওয়ার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে কোথাও তা পৌঁছায়নি। শ্রমিক সংকটও চরমে-যেখানে প্রয়োজন ছিল দ্রুত সমন্বয়, সেখানে দেখা গেছে উদাসীনতা। অনেক কৃষক জানান, সময়মতো শ্রমিক পেলে অন্তত কিছু ফসল বাঁচানো যেত।

যন্ত্রনির্ভর কৃষির কথাও এখানে ব্যর্থ। কম্বাইন হার্ভেস্টার থাকলেও কোমরসমান পানিতে তা ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে শ্রমিকদের মজুরি বেড়ে দাঁড়িয়েছে দিনে দেড় হাজার টাকা, তবুও শ্রমিক মিলছে না। ফলে অনেক কৃষকের শত শত মণ ধান পানির নিচেই পড়ে আছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ক্ষয়ক্ষতির তথ্য নিয়েও বিভ্রান্তি। মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে সরকারি প্রতিবেদনের মিল নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। কৃষকরা বলছেন, দুর্যোগের সময় যখন তারা মাঠেই নামতে পারেননি, তখন কিভাবে ধান কাটার হার বেড়ে গেল, এই প্রশ্নের উত্তর মিলছে না।
এই সংকট শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়; এটি সমন্বয়ের অভাব, সময়মতো উদ্যোগ না নেওয়া এবং বাস্তবতার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন পরিকল্পনারও ফল। এখন প্রয়োজন দ্রুত, কার্যকর ও মানবিক পদক্ষেপ-ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য জরুরি আর্থিক সহায়তা, বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে খাদ্য সহায়তা, কৃষিঋণ মওকুফ বা পুনঃতফসিল, দ্রুত শুকানোর ব্যবস্থা ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যতের জন্য টেকসই বন্যা ব্যবস্থাপনা।
হাওরের কৃষক শুধু ফসল হারাননি, তারা হারিয়েছেন স্বপ্ন, নিরাপত্তা আর আগামী দিনের ভরসা। এই কান্না যেন কাগজে-কলমে আটকে না থাকে; বাস্তব সহায়তার হাত যেন পৌঁছে যায় তাদের কাছে।














