বিশনোই: দ্য পাওয়ার অব রিলিজিয়ন
- আপডেট সময় : ১০:১৪:৪২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ ৩৪৮ বার পড়া হয়েছে
সৃষ্টির আদিকাল থেকে প্রকৃতি পূজিত কখনও দেবতা রূপে কখনও শক্তি রূপে।প্রকৃতিকে তুষ্ট রাখার জন্য আদিম মানুষ তার পূজা করতেন।কারণ তারা প্রাকৃতিক বিপির্যয় গুলির বৈজ্ঞানিক
ব্যাখ্যা জানতেন না।কখন প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে আবার কখনওবা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে মানুষ আদকাল থেকেই প্রকৃতির পূজা করে আসছে।এরকমই একটি অনন্য উদাহরণ আছে ভারতবর্ষের
ইতিহাসে।রাজস্থানের থর মরুভূমির পশ্চিমাংশে ছোটো একটি গ্রামে।এখানে বসবাস করে একটি
উপদলীও গোষ্ঠী বিশনোই। এরা হিন্দুধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই পরেন। এদের উপাস্য দেবতা জাম্বেশ্বর।একই এরা গুরু বা ঈশ্বর চেতনায় মেনে আসছেন।এই গোষ্ঠী বর্মন জন সংখ্যা প্রায় দশ
লক্ষ। এরা গুরু কর্তৃক নির্ধারিত ২৯ টি অনুশাসন মেনে জীবন অতিবাহিত করেন। যা তাদের ধ্যান জ্ঞান আত্মা।এই ২৯টি অনুশাসন মানার জন্য অর্থাৎ ২০অর্থে বিশ এবং ৯ অর্থে আরো ৯টি এদের নাম করণ করা হয়েছে বিশনোই।
১৪৮৫ সনে গুরু জাম্বেশ্বর ১২০শব্দে তার শিক্ষণীয় বিষয় গুলি সম্পর্কে বলে যান।যেগুলিকে বলা হয় সাবধানবাণী।যা তিনি বিভিন্ন স্থানে প্রচার করেছেন।তার এই বাণী গুলি এই উপদলের যাবতীয় জাগতিক ও আধ্যাত্মিক চেতনার মূল উৎস।এই নীতি গুলি হলো:
১.শিশু জন্মের পরবর্তী একমাস শিশু ও মাতাকে সমস্ত রকম গৃহস্থালির কাজকর্ম থেকে দূরে রাখা।
২. রজস্বলা নারীদের ৫দিন পৃথকীকরণ ও পর্যবেক্ষণ এর সঙ্গে রাখা।
৩.প্রতিদিন সূর্যোদয়ের আগে স্নান।
৪.জীবনের আদর্শ গুলি অনুসরণ যেমন বিনয়, ধৈর্য্য,প্রশান্তি ও পরিচ্ছন্নতা।
৫.প্রত্যহ দুইবার প্রার্থনা করা।
৬.সন্ধারতি করা।
৭.কল্যাণ,প্রীতি ও ত্যাগের নিরিখে যজ্ঞ করা।
৮.পরিশোধিত পানীয় জল ,দুধ ও জ্বালানি কাঠ ব্যাবহার।
৯.নিষ্ঠার সঙ্গে পবিত্র শব্দ ব্যাবহার।
১০.অন্তর হতে ক্ষমাশীল হতে শেখা।
১১.নিষ্ঠার সঙ্গে অনুগ্রহ প্রদর্শন।
১২.চুরি না করা অবশ্যই মনোবৃত্তি না রাখা।
১৩.সমালোচনা বিমুখ থাকা।
১৪.মিথ্যা না বলা।
১৫.তর্ক না করা।

১৬.অমাবস্যায় অভুক্ত থাকা।
১৭.ভগবান ভিশান কে ভালোবাসার সহিত পূজা করা।
১৮.সমগ্র প্রাণী সম্পদ ও প্রকৃতির প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া।
১৯.সবুজ গাছ না কটা ও পরিবেশ রক্ষা করা।
২০.সমস্ত লোভ,ক্রোধ,ও অনুসঙ্গ ত্যাগ করা।
২১.নিজের খাদ্য নিজে প্রস্তুত করা।
২২.অনাথ পশুদের আশ্রয় দান ও কসাইখানা ও বধ হওয়া থেকে বাঁচানো।
২৩.নিবীর্য করণ থেকে পশুদের রক্ষা করা।
২৪.আফিম ব্যাবহার ও ব্যাবসা বন্ধ করা।
২৫.তামাক বর্জন ও ধূমপান বন্ধ করা।
২৬.ভাং জাতীয় খাদ্য বর্জন।
২৭.মদ্যপান বর্জন ।
২৮.নিরামিষাশী হওয়া।
২৯নীল গাছ থেকে প্রাপ্ত বেগুনি ও নীল রং বর্জন।

ভাবতে অবাক লাগে যে এই ধরনের ধর্মীয় অনুশাসন গুলির পিছনে লুকিয়ে আছে অসাধারণ এক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।এভাবে এক অসাধারন জীবন শৈলী কে তুলে ধরা হইয়েছে ধর্মীয় ও
আধ্যাত্মিকতার স্পর্শে।এই অনুশাসন গুলির প্রথম দশ টি ব্যাক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি।যার প্রত্যেকটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি উওপর প্রতিষ্ঠিত।পরবর্তী চারটি নীতি প্রতিষ্ঠিত ঈশ্বর এর আরাধনার জন্য।যার
মধ্যে নিহিত আছে আত্মিক প্রশান্তি ও মেডিটেশন।এর পরবর্তী সাত টি নীতি প্রতিষ্ঠিত আদর্শ সামাজিক পরিবেশ ও যথাযথ আচরণবিধি শিক্ষার উপর।এবং আটটি নীতি প্রতিষ্ঠিত
পরিবেশ,জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ এর উপর।কি অভাবনীয় বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা হইছে ধর্মের মোড়কে।যা মানলে মানুষের তথ্য সমস্ত প্রাণী ও উদ্ভিদ কুলের সার্বিক সুস্থ জীবন যাপন অবশ্যম্ভাবী।
ভারতের পরিবেশ আন্দোলন গুলির মধ্যে অন্যতম হলো বিশনোই অরণ্য বাঁচাও আন্দোলন।১৭৩০সনে যোধ পুরের মহারাজা অভয় সিংহ তার নতুন প্রসাদ তৈরির পরিকল্পনা করে খেজরালি
অঞ্চলের জঙ্গল থেকে কাঠ সংগ্রহ করার জন্য সৈন্য পাঠান।এই সময় অমৃতা দেবী এর তীব্র প্রতিবাদ করেন একটি গাছ কে আলিঙ্গন করে।তার দেখা দেখি তার পরিবার ও বহু গ্রামবাসী
প্রতিবাদে এগিয়ে আসে।কিছু মানুষ এই সময় মারা যান। সম্ভাব্য জৈবিক ও পরিবেশ গত ক্ষতির সম্ভাবনা থেকেই তারা এভাবে নিজেদের প্রাণ দিতে প্রস্তুত হন ও এগিয়ে আসেন।পরবর্তীতে ১৯৭৩
সনে চিপিকো আন্দোলনে ঠিক একই ভাবে এই কৌশল টি অনুসরণ করা হয়।এটি প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করে ও সাফল্য লাভ করে।বিশনোই রা আজও পশুদের পরম স্নেহে পালন
করেন এবং মাতৃহারা পশুদের মাতৃ দুগ্ধ দান করেন।এই অঞ্চলের বন্যপ্রাণী অনেক সুরক্ষিত।
আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ কোনো বিশেষ অনুশীলন নই বরং এটি জীবন যাপনের একটি ধরন।অনেক
যত্নে যেমন গাছে ফুল ফোটে তেমনি মানুষ যদি তার শরীর মন আবেগ শক্তি এগুলির যত্ন করে তখন একটা বিশেষ দিক পরিস্ফুট হয়। সেটি আধ্যাত্মিকতা।এটা হলো জগতের সমস্ত কিছুর
সাথে নিবিষ্ট হওয়া।অর্থাৎ সর্বত্র বিরাজমান।অবস্থান করা।সমস্ত চেতনাকে আত্তীকরণ করা।জীবনের প্রতিবস্তুর প্রতি একভাবে নিজেকে সমর্পন করা।এটি একটি অনুভূতি যা অতি সচেতন মনকে জাগরিত করে।

অন্যদিকে সারা বিশ্ব একটি ইন্টার কানেক্টেড নেটওয়ার্ক এর মত যা বিজ্ঞান বিশ্বাস করে। সৃষ্টির প্রতি জিনিসে রয়েছে একটি রিদম যা একে অপরকে যুক্ত করেছে এটি চরম সত্য।এর কোনো একটির বিচ্যুতি সমগ্র জগত কে ভারসাম্য হীন করবে।
বিশনোই জীবন যাত্রা ও ধর্মীয় অনুশাসন গুলির মধ্যে আশ্চর্য্য জনক ভাবে এই আধ্যাত্মিকতা ও বিজ্ঞানের সংমিশ্রণ ঘটে এক অনন্য জীবন বাণী তৈরি হয়েছে।যেখানে মানবাত্মার সার্বিক চেতনার উপলব্ধির মধ্যে দিয়ে জগতের সকল প্রাণী ও প্রকৃতির বন্দনা স্বীকৃতি পেয়েছে।।

























