বন্যায় প্রাণিসম্পদ খাতে শতকোটি টাকার ক্ষতি, আক্রান্ত ৩০ লাখের বেশি হাঁস-মুরগি ও প্রায় ৪ লাখ গবাদিপশু
- আপডেট সময় : ১২:৩২:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬ ৪৪ বার পড়া হয়েছে
বন্যায় প্রাণিসম্পদ খাতে শতকোটি টাকার ক্ষতি, আক্রান্ত ৩০ লাখের বেশি হাঁস-মুরগি ও প্রায় ৪ লাখ গবাদিপশু
সাম্প্রতিক বন্যায় উপকূলীয় ও পাহাড়ি অঞ্চলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অন্যতম। কৃষিজমি তলিয়ে যাওয়া, ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়া এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগের প্রাণিসম্পদ খাত বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বন্যার কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার ৪১টি উপজেলা এবং ১৮৩টি ইউনিয়নে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে প্রায় চার লাখ গবাদিপশু এবং ৩০ লাখের বেশি হাঁস-মুরগি বিভিন্নভাবে আক্রান্ত হয়েছে। প্রাণিসম্পদ, খামার, খাদ্য ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি মিলিয়ে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটিরও বেশি বলে সংশ্লিষ্ট দফতরের তথ্য থেকে জানা গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচ জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায়। জেলার ১৫টি উপজেলা ও ১০৮টি ইউনিয়ন বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজারের ৮টি উপজেলার ৩১টি ইউনিয়ন, বান্দরবানের ৭টি উপজেলার ২৪টি ইউনিয়ন, রাঙামাটির ২টি উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন এবং খাগড়াছড়ির ৯টি উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে পানি জমে থাকায় খামার, চারণভূমি এবং পশুপাখির খাদ্যসংরক্ষণ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বন্যায় মোট প্রায় চার লাখ গবাদিপশু আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার ৮৭৩টি গরু, ৪ হাজার ৬২০টি মহিষ, ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪২টি ছাগল এবং প্রায় ৩০ হাজার ভেড়া। পাশাপাশি ২৭ লাখ ৯১ হাজার ৬৫৭টি মুরগি এবং ৫৯ হাজার ৪৭৫টি হাঁস বিভিন্ন রোগ, খাদ্যসংকট ও বন্যার পানির কারণে আক্রান্ত হয়েছে। প্রাণিসম্পদের এই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি খামারিদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক সংকট সৃষ্টি করেছে।
দুর্যোগে বহু প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় ৬০টি গরু, ১১৫টি ছাগল, ৪৪টি ভেড়া, ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৭৪টি মুরগি এবং ২ হাজার ৩১টি হাঁস মারা গেছে। এছাড়া প্রায় ১০ হাজার ৪৯ একর চারণভূমি প্লাবিত হওয়ায় পশুখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। চারণভূমি পানির নিচে থাকায় গবাদিপশুর জন্য পর্যাপ্ত ঘাসের জোগান ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক খামারিকে অতিরিক্ত ব্যয়ে বিকল্প খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।
বন্যার কারণে শুধু পশুপাখিই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাজার হাজার খামারও। প্রায় ৪ হাজার ৫৫০টি গবাদিপশুর খামার এবং ৩৪ হাজার ৩৫৭টি হাঁস-মুরগির খামার বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক খামারের ঘরবাড়ি, খাদ্যসংরক্ষণাগার, পানির উৎস এবং উৎপাদন ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। এতে খামারিদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিপুল পরিমাণ পশুখাদ্যও নষ্ট হয়েছে। প্রায় ৬১২ টন দানাদার পশুখাদ্য, ১৪ হাজার ১৯০ টন খড় এবং ৮ হাজার ৫৭৮ টন ঘাস পানিতে বিনষ্ট হয়েছে। খাদ্যের এই সংকটের কারণে আক্রান্ত পশুপাখির স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়েছে। মৃত প্রাণীর ক্ষতি, খাদ্য নষ্ট হওয়া, খামারের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সম্মিলিত প্রভাবে প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় ১০০ কোটিরও বেশি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রাণিসম্পদ বিভাগ জরুরি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় টিকাদান, চিকিৎসাসেবা, রোগ প্রতিরোধ, জীবাণুনাশক প্রয়োগ এবং মৃত পশুপাখি দ্রুত অপসারণের কাজ অব্যাহত রয়েছে। এ পর্যন্ত ৯ হাজার ৩২১টি গবাদিপশু এবং ১২ হাজার ৪২৭টি হাঁস-মুরগিকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে ৭ হাজার ৭৭৫টি গবাদিপশু এবং ৭৩ হাজার ২৬টি হাঁস-মুরগিকে। একই সঙ্গে খামারিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও জরুরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে, যাতে বন্যা-পরবর্তী সময়ে সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধ করা যায় এবং প্রাণিসম্পদ খাত দ্রুত পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়।
গত ৫ জুলাই থেকে টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে আট লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন এবং অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটে। মানুষের পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ খাতেও এই দুর্যোগের প্রভাব অত্যন্ত গভীর হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত পুনর্বাসন, পর্যাপ্ত পশুখাদ্য সরবরাহ, ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের আর্থিক সহায়তা এবং প্রাণিসম্পদের স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা না হলে এই ক্ষতির প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে বহন করতে হবে।


















