ঢাকা ০৫:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে ঢাকা-নয়াদিল্লির নতুন প্রত্যাশা খুব দ্রুত বিশ্ববাজারে কমবে জ্বালানি তেলের দাম: ট্রাম্প ইসরায়েলে বহুমুখী হামলার প্রস্তুতি, মিত্রদের একজোট করছে ইরান এলএনজি সংরক্ষণ ও গ্যাসে রূপান্তরে বিনিয়োগে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র নিউ মেক্সিকো’র নাম পরিবর্তন করে নিউ আমেরিকা রাখার প্রস্তাব ট্রাম্পের রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের অন্যতম বড় সংকট : প্রধানমন্ত্রী সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটো নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতের আহ্বান জনপ্রশাসন উপদেষ্টার ডেঙ্গুর ভয়াবহ ছোবল একদিনে রেকর্ড ১,৫৫৮ ভর্তি, মৃত্যু ৪ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানে গুরুত্ব

প্রাচীন ইতিহাসের নীরব অনুসন্ধানী ও লোকসাহিত্য গবেষক হাবিবুল্লা পাঠান

আমিনুল হক ভূইয়া
  • আপডেট সময় : ০৭:২৯:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬ ১৫৬ বার পড়া হয়েছে

প্রাচীন ইতিহাসের নীরব অনুসন্ধানী ও লোকসাহিত্য গবেষক হাবিবুল্লা পাঠান: ছবি সংগ্রহ

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

‘লুকানো ইতিহাসকে আলোর মুখ দেখানোর জন্যই তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন। তার অবদান বাংলার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে’

বাংলার প্রাচীন ইতিহাসের এক নীরব অনুসন্ধানী, প্রত্নতত্ত্ববিদ ও লোকসাহিত্য গবেষক মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান।

উয়ারী-বটেশ্বর নামটি উচ্চারণ করলেই যে মানুষটির কথা প্রথমে মনে পড়ে, তিনি ছিলেন ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া স্তরগুলোকে তুলে আনার এক নিরলস সাধক। ঈদের দিন, নরসিংদীর বেলাব উপজেলার নিজ গ্রাম বটেশ্বরে তার মৃত্যু যেন একটি যুগের অবসানই নির্দেশ করে।

১৯৩৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া হাবিবুল্লা পাঠানের শৈশব থেকেই ইতিহাসের সঙ্গে এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তার বাবা হানিফ পাঠান ছিলেন লোকসাহিত্য সংগ্রাহক ও গবেষক।

বাবার হাত ধরেই তিনি প্রবেশ করেন প্রত্নতত্ত্বের জগতে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই তিনি যুক্ত হন উয়ারী-বটেশ্বরের প্রাচীন নিদর্শন অনুসন্ধানের কাজে, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়।

উয়ারী-বটেশ্বর আজ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের নাম। কিন্তু একসময় এটি ছিল প্রায় বিস্মৃত। বাবা-ছেলের যৌথ উদ্যোগে এই স্থানটির গুরুত্ব সামনে আসে।

উয়ারী-বটেশ্বর বাংলাদেশের ঢাকা বিভাগের নরসিংদীতে অবস্থিত প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ
উয়ারী-বটেশ্বর বাংলাদেশের ঢাকা বিভাগের নরসিংদীতে অবস্থিত প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ: ছবি সংগ্রহ

দীর্ঘদিনের গবেষণা ও সংগ্রহের ফলে এখানে প্রাচীন সভ্যতার নানা নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়, যা প্রমাণ করে এটি ছিল প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার বছরের পুরোনো একটি সমৃদ্ধ নগরী ও বাণিজ্যকেন্দ্র।

তাদের এই প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় ২০০০ সালে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক খননকাজ, যা বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্বে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

শুধু প্রত্নতত্ত্ব নয়, লোকসাহিত্য সংগ্রহেও ছিল তার সমান আগ্রহ। গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া গল্প, প্রবাদ, গান ও ঐতিহ্য তিনি সংগ্রহ করে বই আকারে প্রকাশ করেছেন।

তার লেখা ১৬টি গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উয়ারী-বটেশ্বর: শেকড়ের সন্ধানে, যা তিনি সূফী মোস্তাফিজুর রহমান-এর সঙ্গে যৌথভাবে রচনা করেন। এই বইটি গবেষণাধর্মী কাজের জন্য ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে।

হাবিবুল্লা পাঠানের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০০৯ সালে বাংলা একাডেমি-এর ফেলো নির্বাচিত হন এবং ২০২০ সালে লাভ করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। তার গবেষণা কেবল ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেনি, বরং নতুন প্রজন্মকে নিজস্ব শিকড়ের সন্ধান পেতেও সাহায্য করেছে।

লুকানো ইতিহাস ওয়ারী বটেশ্বর

লুকানো ইতিহাস ওয়ারী বটেশ্বর : ছবি সংগ্রহ

বাবা-ছেলে মিলে প্রতিষ্ঠিত ‘বটেশ্বর প্রত্ন সংগ্রহশালা’ আজও ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য আকর্ষণ। সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে হাজার বছরের পুরোনো নিদর্শন, দুষ্প্রাপ্য বই ও সাময়িকী, যা তার জীবনব্যাপী সংগ্রামের সাক্ষ্য বহন করে।

জীবনের শেষ সময়ে তিনি ফুসফুসের ক্যানসারে ভুগছিলেন। তবু ইতিহাসের প্রতি তার ভালোবাসা কখনো কমেনি। তার মৃত্যুতে শুধু একজন গবেষকের বিদায় নয়, হারিয়ে গেল এক জীবন্ত ইতিহাসভাণ্ডার।

হাবিবুল্লা পাঠানের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং মাটির নিচে, মানুষের স্মৃতিতে এবং লোকজ সংস্কৃতির গভীরে লুকিয়ে থাকে।

সেই লুকানো ইতিহাসকে আলোর মুখ দেখানোর জন্যই তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন। তার অবদান বাংলার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

প্রাচীন ইতিহাসের নীরব অনুসন্ধানী ও লোকসাহিত্য গবেষক হাবিবুল্লা পাঠান

আপডেট সময় : ০৭:২৯:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬

‘লুকানো ইতিহাসকে আলোর মুখ দেখানোর জন্যই তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন। তার অবদান বাংলার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে’

বাংলার প্রাচীন ইতিহাসের এক নীরব অনুসন্ধানী, প্রত্নতত্ত্ববিদ ও লোকসাহিত্য গবেষক মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান।

উয়ারী-বটেশ্বর নামটি উচ্চারণ করলেই যে মানুষটির কথা প্রথমে মনে পড়ে, তিনি ছিলেন ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া স্তরগুলোকে তুলে আনার এক নিরলস সাধক। ঈদের দিন, নরসিংদীর বেলাব উপজেলার নিজ গ্রাম বটেশ্বরে তার মৃত্যু যেন একটি যুগের অবসানই নির্দেশ করে।

১৯৩৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া হাবিবুল্লা পাঠানের শৈশব থেকেই ইতিহাসের সঙ্গে এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তার বাবা হানিফ পাঠান ছিলেন লোকসাহিত্য সংগ্রাহক ও গবেষক।

বাবার হাত ধরেই তিনি প্রবেশ করেন প্রত্নতত্ত্বের জগতে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই তিনি যুক্ত হন উয়ারী-বটেশ্বরের প্রাচীন নিদর্শন অনুসন্ধানের কাজে, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়।

উয়ারী-বটেশ্বর আজ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের নাম। কিন্তু একসময় এটি ছিল প্রায় বিস্মৃত। বাবা-ছেলের যৌথ উদ্যোগে এই স্থানটির গুরুত্ব সামনে আসে।

উয়ারী-বটেশ্বর বাংলাদেশের ঢাকা বিভাগের নরসিংদীতে অবস্থিত প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ
উয়ারী-বটেশ্বর বাংলাদেশের ঢাকা বিভাগের নরসিংদীতে অবস্থিত প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ: ছবি সংগ্রহ

দীর্ঘদিনের গবেষণা ও সংগ্রহের ফলে এখানে প্রাচীন সভ্যতার নানা নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়, যা প্রমাণ করে এটি ছিল প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার বছরের পুরোনো একটি সমৃদ্ধ নগরী ও বাণিজ্যকেন্দ্র।

তাদের এই প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় ২০০০ সালে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক খননকাজ, যা বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্বে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

শুধু প্রত্নতত্ত্ব নয়, লোকসাহিত্য সংগ্রহেও ছিল তার সমান আগ্রহ। গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া গল্প, প্রবাদ, গান ও ঐতিহ্য তিনি সংগ্রহ করে বই আকারে প্রকাশ করেছেন।

তার লেখা ১৬টি গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উয়ারী-বটেশ্বর: শেকড়ের সন্ধানে, যা তিনি সূফী মোস্তাফিজুর রহমান-এর সঙ্গে যৌথভাবে রচনা করেন। এই বইটি গবেষণাধর্মী কাজের জন্য ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে।

হাবিবুল্লা পাঠানের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০০৯ সালে বাংলা একাডেমি-এর ফেলো নির্বাচিত হন এবং ২০২০ সালে লাভ করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। তার গবেষণা কেবল ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেনি, বরং নতুন প্রজন্মকে নিজস্ব শিকড়ের সন্ধান পেতেও সাহায্য করেছে।

লুকানো ইতিহাস ওয়ারী বটেশ্বর

লুকানো ইতিহাস ওয়ারী বটেশ্বর : ছবি সংগ্রহ

বাবা-ছেলে মিলে প্রতিষ্ঠিত ‘বটেশ্বর প্রত্ন সংগ্রহশালা’ আজও ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য আকর্ষণ। সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে হাজার বছরের পুরোনো নিদর্শন, দুষ্প্রাপ্য বই ও সাময়িকী, যা তার জীবনব্যাপী সংগ্রামের সাক্ষ্য বহন করে।

জীবনের শেষ সময়ে তিনি ফুসফুসের ক্যানসারে ভুগছিলেন। তবু ইতিহাসের প্রতি তার ভালোবাসা কখনো কমেনি। তার মৃত্যুতে শুধু একজন গবেষকের বিদায় নয়, হারিয়ে গেল এক জীবন্ত ইতিহাসভাণ্ডার।

হাবিবুল্লা পাঠানের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং মাটির নিচে, মানুষের স্মৃতিতে এবং লোকজ সংস্কৃতির গভীরে লুকিয়ে থাকে।

সেই লুকানো ইতিহাসকে আলোর মুখ দেখানোর জন্যই তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন। তার অবদান বাংলার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।