তিস্তা পারের মানুষের ভাঙন আতঙ্ক বন্যার ক্ষতি শুধু অর্থনীতিতে নয়, মানুষের জীবনেও গভীর ক্ষত
- আপডেট সময় : ০৮:৩৬:৩৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬ ৩৩ বার পড়া হয়েছে
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টি ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পানির চাপে আবারও ফুলেফেঁপে উঠেছে তিস্তা নদী। বুধবার সকালে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার মাত্র ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় তিস্তা তীরবর্তী মানুষ নতুন করে বন্যা ও নদীভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে।
তবে নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের উদ্বেগও বাড়ছে, কারণ তিস্তার বন্যা শুধু ফসল বা ঘরবাড়ি নয়, মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও জীবিকার ভিত্তিকেও ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
বুধবার সকাল ৯টায় ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানির সমতল রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ১৪ মিটার, যেখানে বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। যদিও সন্ধ্যা ৬টার দিকে পানি কিছুটা নেমে বিপৎসীমার ১৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়, তবুও উজানের প্রবাহ অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা কাটেনি। একই সময়ে কাউনিয়া পয়েন্টেও তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার নিচে ছিল।
আদিতমারীর গোবর্ধন গ্রামের বাসিন্দা আবদুর রশিদ ও কালীগঞ্জের শৈলমারী চরের বাসিন্দা আবদুল গফ্ফর জানান, সকাল থেকেই পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে চরাঞ্চলের নিচু এলাকায় পানি ঢুকেছে। তাঁদের আশঙ্কা, পানি আরও বাড়লে দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়া বাঁধগুলো ভেঙে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। নদীপারের মানুষের কাছে বর্ষা মানেই নির্ঘুম রাত, ঘর রক্ষার যুদ্ধ আর কখন নদী সবকিছু গিলে খাবে সেই উৎকণ্ঠা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবাহ অব্যাহত থাকায় তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যারাজের সবগুলো প্রয়োজনীয় জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে এবং নদীতীরবর্তী ও চরাঞ্চলের মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং পানি আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিস্তার পানি কয়েক সপ্তাহ ধরেই বিপৎসীমার আশপাশে ওঠানামা করছে। এরই মধ্যে রংপুরের গঙ্গাচড়া এলাকায় নদীর তীব্র স্রোতে স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত প্রতিরক্ষা বাঁধে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত দুই দিনে অন্তত পাঁচটি বসতভিটা, ফসলি জমি ও পুকুর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে কাজ শুরু করেছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থায়ী ও টেকসই নদীশাসনের অভাবে প্রতিবছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিস্তার বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কেবল টাকার অঙ্কে হিসাব করলে প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে না। একটি পরিবার যখন নদীগর্ভে ঘর হারায়, তখন শুধু একটি বাড়ি নয়, হারিয়ে যায় বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সঞ্চয়, স্মৃতি, সামাজিক পরিচয় এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।
অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে আশ্রয়কেন্দ্র, বাঁধ কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে মানবেতর জীবনযাপন করে। শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, কৃষকের ফসল নষ্ট হয়, গবাদিপশু রক্ষাও কঠিন হয়ে পড়ে।
নদীভাঙনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। যাদের সামান্য জমিই ছিল জীবিকার একমাত্র অবলম্বন, ভাঙনের পর তারাই হয়ে পড়েন ভূমিহীন। অনেকেই শহরমুখী হয়ে দিনমজুরি বা অনিশ্চিত পেশায় যুক্ত হন। ফলে বন্যা শুধু তাৎক্ষণিক দুর্যোগ নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি ও সামাজিক বৈষম্যেরও অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, উজানের পানির প্রবাহ বৃদ্ধি এবং নদীর স্বাভাবিক গতিপথের পরিবর্তনের কারণে তিস্তা অববাহিকায় বন্যা ও ভাঙনের ঝুঁকি আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। তাই শুধু জরুরি ত্রাণ বা অস্থায়ী বাঁধ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা, কার্যকর ড্রেজিং, টেকসই নদীতীর সংরক্ষণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
প্রতিবছরের মতো এবারও তিস্তার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের হাজারো মানুষের মনে ফিরে এসেছে পুরোনো আতঙ্ক। তাঁদের একটাই প্রশ্ন আর কত বছর একইভাবে ঘর হারানোর ভয় নিয়ে বাঁচতে হবে? তিস্তার ভাঙন রোধে স্থায়ী উদ্যোগ না নেওয়া হলে নদীপারের মানুষের এই অনিশ্চয়তা, বাস্তুচ্যুতি ও দারিদ্র্যের চক্র থেকে মুক্তি মিলবে না। তাই বন্যার ক্ষয়ক্ষতি শুধু অর্থনীতির পরিসংখ্যান নয়, এটি মানুষের জীবন, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ রক্ষারও একটি বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জ।



















