মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা তেলের দাম ৯২ ডলার ছাড়াল নতুন মূল্যস্ফীতির শঙ্কায় দরিদ্র দেশগুলো
- আপডেট সময় : ১২:৩৮:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ ৫৪ বার পড়া হয়েছে
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯২ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশসহ তেল আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে, কমবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বুধবার এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯২ দশমিক ০৯ ডলারে ওঠে, যা গত ১১ জুনের পর সর্বোচ্চ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি ৮৫ দশমিক ২৩ ডলার। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় ইরানের হামলা এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগ তীব্র হওয়ায় বাজারে এই ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে। বাংলাদেশ বছরে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করে। ফলে বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে সরকারের আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে জ্বালানি তেলের স্থানীয় মূল্য, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এবং পরিবহন খাতে। পরিবহন ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষিপণ্য, খাদ্যপণ্য, নির্মাণসামগ্রী, ওষুধসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যের সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধি পায়। শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ বাড়ায় উৎপাদকরা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হন, যার চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি শুধু নিত্যপণ্যের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি সামগ্রিক অর্থনীতিতে ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’ বা ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতির জন্ম দেয়। এতে খাদ্য মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি অখাদ্য মূল্যস্ফীতিও বাড়ে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, আমদানি বিল বৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদনে ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি মন্থর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়, অথচ আয় সেই হারে বৃদ্ধি পায় না। ফলে দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়ে।
এদিকে ইরান দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করা নির্দেশনা অমান্যকারী দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়ে সেগুলোর চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। তাই এ নৌপথে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশসহ অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।



















