প্রকৃতি ও পরিবেশ চাঁইয়ের ফাঁদে পাঙাশ নিধন উপকূলের নদ-নদীতে মাছশূন্য ভবিষ্যতের অশনিসংকেত
- আপডেট সময় : ০১:৩১:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬ ৩০ বার পড়া হয়েছে
প্রতিবছর ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত ৩০ সেন্টিমিটারের কম দৈর্ঘ্যের পাঙাশ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
কিন্তু আইন অমান্য করে অবাধে এই পোনা আহরণ ও বিপণন চললেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি
উপকূলীয় নদ-নদী ও বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন বিস্তীর্ণ জলরাশি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র। কিন্তু অবৈধভাবে স্থাপন করা ‘চাঁই’ নামের নিষিদ্ধ ফাঁদের কারণে এই প্রাকৃতিক সম্পদ আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। পরিবেশবিদ, মৎস্য গবেষক এবং মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এভাবে নির্বিচারে পাঙাশের পোনা নিধন চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের নদ-নদীতে প্রাকৃতিকভাবে পাঙাশ মাছের প্রাপ্ততা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে। একই সঙ্গে জলজ জীববৈচিত্র্য ও খাদ্যনিরাপত্তাও বড় সংকটে পড়বে।
বঙ্গোপসাগরের কূলঘেঁষা বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার পদ্মা স্লুইস এলাকায় সম্প্রতি পরিবেশকর্মী আরিফুর রহমানের উদ্যোগে চারটি বিশাল আকৃতির চাঁই উদ্ধার করা হয়। পরে স্থানীয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে নিষিদ্ধ ফাঁদগুলো পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, উদ্ধার হওয়া এই চারটি চাঁই বৃহত্তর সমস্যার ক্ষুদ্র একটি অংশমাত্র। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নদী ও মোহনায় শত শত চাঁই এখনও সক্রিয় রয়েছে।
পরিবেশকর্মী আরিফুর রহমান জানান, একটি চাঁই তৈরিতে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। বাঁশ, জাল ও কাঠ দিয়ে তৈরি এসব ফাঁদ এতটাই বড় যে ভেতরে দুই থেকে তিনজন মানুষ অনায়াসে প্রবেশ করতে পারেন। বিশেষ ধরনের প্রলোভনসৃষ্টিকারী মণ্ড ব্যবহার করে নদীর ৪০ থেকে ৫০ ফুট গভীরে এসব চাঁই স্থাপন করা হয়। শুঁটকি, খৈল, কুঁড়া, চিনি, চিড়া ও মাছের তেলের মিশ্রণে তৈরি এই মণ্ডের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে অসংখ্য পাঙাশের পোনা ফাঁদে ঢুকে পড়ে।
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার একটি সংঘবদ্ধ চক্র এসব চাঁই ও বিশেষ মণ্ড তৈরি করে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করছে। ফলে প্রতিদিনই প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্রে ভয়াবহ হারে পোনা নিধন হচ্ছে।
পাথরঘাটা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা হাসিবুল হক বলেন, মৎস্য বিভাগের অভিযান এড়াতে অসাধু জেলেরা এখন প্রযুক্তিরও অপব্যবহার করছে। তারা হোয়াটসঅ্যাপের লাইভ লোকেশন ব্যবহার করে একে অপরকে চাঁইয়ের অবস্থান জানিয়ে দেয়, ফলে অভিযান পরিচালনা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. রাজিব সরকারের গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, একটি চাঁইয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০ কেজি পাঙাশের পোনা ধরা পড়ে। এসব পোনা এতটাই ছোট যে এক কেজিতে প্রায় ৪০টি পর্যন্ত পোনা থাকে। তাঁর আশঙ্কা, এই ধারা অব্যাহত থাকলে মাত্র ছয় মাসেই প্রায় দুই কোটি পোনা নিধন হতে পারে, যা দেশের প্রাকৃতিক পাঙাশ উৎপাদনের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।

বাংলাদেশ মৎস্য শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এস. এম. জাকির হোসেন জানান, চাঁইয়ে ধরা পড়া পোনাগুলোর দৈর্ঘ্য মাত্র ৩ থেকে ৭ ইঞ্চি। বাজারে এগুলো কৌশলে নদীর ট্যাংরা বা পাঙাশ-ট্যাংরা নামে বিক্রি করা হয়। ফলে সাধারণ ক্রেতা কিংবা অনেক ক্ষুদ্র মাছ বিক্রেতাও বুঝতে পারেন না যে তারা নিষিদ্ধ পাঙাশের পোনা কিনছেন।
বরিশাল পোর্ট রোডের মৎস্য আড়তদার জহির শিকদার জানান, বর্তমানে এসব নিষিদ্ধ পোনা প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী প্রতিবছর ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত ৩০ সেন্টিমিটারের কম দৈর্ঘ্যের পাঙাশ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু আইন অমান্য করে অবাধে এই পোনা আহরণ ও বিপণন চললেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্রজননক্ষেত্রগুলোর মধ্যে পটুয়াখালী ও ভোলার হাদির চর, চরগুণী, মাঝের চর, পাতার চর, চর বোরহান, চর কলমি ও চর মন্তাজসহ অন্তত ১২টি এলাকা বর্তমানে এই অবৈধ চক্রের দখলে রয়েছে। একইভাবে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের নলবুনিয়া-সংলগ্ন মেঘনা, সুগন্ধা, আড়িয়াল খাঁ, কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদী এবং বরগুনার পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর মোহনাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
সামুদ্রিক প্রাণীবিশেষজ্ঞ ড. মো. কামরুল ইসলাম বলেন, মাত্র ২০ জন জেলে প্রতিদিন কয়েক মণ পোনা ধরে ফেললেই প্রাকৃতিক প্রজননচক্রের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। নদীতে জন্ম নেওয়ার আগেই যখন কোটি কোটি পোনা নিধন করা হয়, তখন ভবিষ্যতে পূর্ণবয়স্ক মাছের সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়া স্বাভাবিক। এর প্রভাব শুধু পাঙাশের ওপর নয়, পুরো নদীকেন্দ্রিক জলজ বাস্তুতন্ত্রের ওপরও পড়ে।
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করেন, এই অবৈধ পদ্ধতি সম্পূর্ণ বন্ধ করা গেলে অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই নদ-নদীতে পাঙাশের প্রাকৃতিক প্রাচুর্য বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। তবে এজন্য শুধু নদীতে অভিযান চালালেই হবে না; যেসব এলাকায় চাঁই তৈরি ও সরবরাহ করা হয়, বিশেষ করে বাউফলের মতো উৎপাদনকেন্দ্রগুলোতে কঠোর নজরদারি, নিয়মিত অভিযান এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে পরিবেশ ধ্বংস, অন্যদিকে মাছের স্বাভাবিক বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হওয়ার ফলে দেশের নদ-নদী ক্রমেই মাছশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। তাই ‘চাঁইয়ে পাঙাশের নাশ’ বন্ধে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মৎস্য বিভাগ, স্থানীয় জনগণ ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দেশের প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং জলজ জীববৈচিত্র্য এক অপূরণীয় সংকটের মুখে নিপতিত হবে।
প্রয়োজনে আমি এটিকে আরও সংবাদপত্রের ফিচারধর্মী, অনুসন্ধানী বা সম্পাদকীয় শৈলীতে রূপান্তর করে দিতে পারি।



















