সোমবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০৮:৩০ অপরাহ্ন

সন্ধিপূজা ও বলিদান

ড. বিরাজলক্ষ্মী ঘোষ
  • Update Time : শুক্রবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২১
  • ১৩৯ Time View

ছবি বিরাজলক্ষী ঘোষ

‘ঘোষ বাড়ির সদস্যরা হিংস পন্থায় বিশ্বাসী নন। এখানে অহিংস বলির জন্য ব্যাবহার করা হয় চালকুমড়া, আখ ও আদা’

আশ্বিন মাসে প্রায় দশ দিন ধরে দুর্গা পুজোর উৎসব পালিত হয়। যদিও প্রকৃত অর্থে, উৎসব শুরু হয় ষষ্ঠির দিন থেকে। দুর্গাপুজোর পাঁচ দিন মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী, মহানবমী এবং বিজয়া দশমী হিসেবে পরিচিত। পৌরাণিক মতে বিশ্বাস করা হয় যে, দেবী দুর্গা মহাষ্টমীতে মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন। এই দিন ভক্তেরা পুষ্পাঞ্জলির মাধ্যমে দেবীকে আরাধানা করেন। দুর্গা পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বেশ কিছু নিয়মকানুন।

 

আশ্বিনের শুক্লাষ্টমীর বিশেষ মাহেন্দ্রক্ষণে দেবী দুর্গার সন্ধিপুজো হয়। বলা হয় অষ্টমী ও নবমী তিথির শুভ সন্ধিক্ষণই আসলে সন্ধিপুজো। এই বিশেষ তিথিকে শুভ বলে মানা হয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অনেকগুলি বিশেষ নিয়ম। তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হল, দেবী দুর্গার পায়ে উৎসর্গ করা হয় ১০৮ টি লাল পদ্ম। সেই একই সময়ে জ্বালানো হয় ১০৮ টি প্রদীপ। কোনো

কোনো ক্ষেত্রে বলিদানও করা হয়। প্রকৃত অর্থে ছাগ বলি মানে পাঁঠা বলি নয়। শাস্ত্র মতে ছাগ কথার অর্থ হল ষড়রিপু। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য্য এই ষড়রিপুকে এক কথায় ছাগ বলে। প্রকৃত অর্থে এই ষড়রিপুকে বলি দিতে হয়।

যজ্ঞে দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদ্য যা কিছু তাকে বলি বলা হয়। যজ্ঞের আগুনে ঝলসে তা প্রথমে দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হত, পরে তা প্রসাদ হিসাবে গ্রহণ করতেন মুণি-ঋষিরা। পশু থেকে কোনও ফল-সামগ্রী সব কিছু বলি হতে পারে। তবে জনমানসে ধারণা রয়েছে বলি মানেই পশুবলির কথা বলা হয়। দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে এই উৎসর্গ ছিল প্রতীকী। দুর্গাপুজোতেও প্রতীকী হিসাবেই এই বলি দেওয়ার রীতি প্রচলতি ছিল।

অষ্টমী এবং নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে স্বর্ণ ভূষণে সজ্জিতা হন দেবী দুর্গা। স্বর্ণ বর্ণ ধারণ করেন। মহিষাসুর বধের প্রস্তুতি শুরু করেন তিনি। তবে মহিষাসুর দেবীর এই অভীষ্ট সাধনে বাধা দান করতে তার দুই অনুচর চণ্ড এবং মুণ্ডকে দেবীকে একযোগে আক্রমণ করতে পাঠান। অত্যন্ত

আকস্মিক ভাবে পিছন থেকে তারা দেবীকে আক্রমণ করেন। সে সময় দেবী ক্রোধে রক্তবর্ণা হয়ে ওঠেন। ধারণ করেন চামুণ্ডা রূপ। খড়্গরে কোপে চণ্ড ও মুণ্ডের মুণ্ডচ্ছেদ করেন দেবী। এর সঙ্গেই অশুভ শক্তির বিনাশ হয়।

অন্যদিকে কৃত্তিবাসের রামায়ণে উল্লেখ আছে, রাক্ষসরাজ রাবণকে বধ করার জন্য আশ্বিন মাসেই রামচন্দ্র অকাল বোধন করেন। সেখানেও সন্ধি পুজোর বিশেষ তিথিতে দেবীকে ১০৮ টি পদ্ম নিবেদন করা হয়। সেই সময় হনুমানকে দেবীদহ থেকে ১০৮টি পদ্ম ফুল তুলে আনতে বলা হয়। কিন্তু সেখানে পাওয়া যায় ১০৭ টি পদ্ম। তখন রাম নিজে তাঁর পদ্ম সমান নেত্র দান করার

জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং দেবী আবির্ভূত হয়ে বরদান করেন যে, তিনি রাবণের থেকে নিজেও সুরক্ষা সরিয়ে নেবেন। ষষ্ঠীর দিন রামচন্দ্র পুজো শুরু করেন। অষ্টমী এবং নবমী তিথির মাঝে রামের অস্ত্র প্রবেশ করে এবং দশমীর দিন রাবণের বিনাশ হয়।

সে কারণেই চণ্ড-মুণ্ডের প্রতীক হিসাবে মনের অশুভ ভাবনা, পাশবিক প্রবৃত্তিকে দেবীর সামনের যজ্ঞে আগুনে ভস্ম করতে বলি দেওয়ার রীতি প্রচলিত। মহিষাসুরের প্রতীক হিসাবে বেশিরভাগ যজ্ঞে আগে মোষ বলি দেওয়ার রীতি ছিল। পরবর্তীতে তা অনেক ক্ষেত্রে পাঁঠাবলিতে রূপান্তরিত

হয়। প্রকৃত অর্থে ছাগ বলি মানে পাঁঠা বলি নয়। শাস্ত্র মতে ছাগ কথার অর্থ হল ষড়রিপু। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য্য এই ষড়রিপুকে এক কথায় ছাগ বলে। প্রকৃত অর্থে এই ষড়রিপুকে বলি দিতে হয়। অপরাজিতা, বেল, বকুল, কুদ ও জবা ফুল সহযোগে পূজা করার

বিশেষ নিয়ম প্রচলিত। প্রতিদিন থাকে শিউলি ফুল। অষ্টমী পুজো সমাপ্ত হলে অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে শুরু হয় সন্ধি পুজো। এই পুজোয় থাকে কিছু বিশেষ উপাচার। এই দিন কুড়ি কেজি ওজনের চালের ভোগ দেওয়া হয় তার ওপর দেওয়া হয় একটি রাজ নাড়ু। মাকে সোনার নথ ও

রূপার নোয়া দেওয়া হয় নতুন বস্ত্রের সঙ্গে। একশো আট পদ্ম ও একশো আট প্রদীপ সহযোগে দেবীর আরাধনা করা হয়। পুজো শেষে ব্রাহ্মণকে দান করা হয়। প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী গুরু বাড়িতে বাসন শয্যা দান করার প্রথা প্রচলিত। পূর্বে সন্ধী পুজো শুরু হবার পাঁচ মিনিট পূর্বে বাড়ির

কামান দাগা হতো। এবং সন্ধি পুজো শুরু হবার সময় আবার দাগা হতো। এতে এলকাবাসী বুঝতে পারতেন যে পুজো শুরু হবার সময় এসেছে এবং সকলে যোগ দিতেন। সন্ধি পুজো শেষ হবার পর যে অনুষ্ঠানটি হয়, সেটি হলো বলি। তবে ঘোষ বাড়ির সদস্যরা হিংস পন্থায় বিশ্বাসী নন। তাই এখানে অহিংস বলির জন্য ব্যাবহার করা হয় চালকুমড়া, আখ ও আদা।

শোনা যায় মা এসময় চামুণ্ডা রূপ ধরেন এবং সেই কারণে মার আসন থেকে বলির স্থান পর্যন্ত পথ শূন্য করে রাখা হয়। যাতে মা বলি গ্রহণ করতে পারেন। বলির পর নবমীর পুজো শুরু হয়। নবমীর পুজো শেষে হোম ও পুজো উদযাপন হয়।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2017 voiceekattor
কারিগরি সহযোগিতায়: সোহাগ রানা
11223