ঢাকা ০৫:৫৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ইরানি প্রতিনিধিদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ যুক্তরাষ্ট্র: তেহরানের কড়া মন্তব্য ২১ ঘণ্টার আলোচনায়ও সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান: জেডি ভ্যান্স ভোলা সেতু: খুলে যাবে দক্ষিণ জনপথের অর্থনীতির নতুন দুয়ার আমদানি বৃদ্ধি ও পণ্য রপ্তানি বাণিজ্যঘাটতি বেড়ে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার লেবাননে হামলা বন্ধ না হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকে বসবে না ইরান চারুকলায় বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রস্তুতি: দুয়ারে কড়া নাড়ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ পাহাড়ে বৈসুর প্রস্তুতি: গরাইয়া নাচে মাতোয়ারা ত্রিপুরাপাড়া ইরানের আঘাতে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলো কার্যত অকার্যকর শর্ত মেনে : হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ১৫ জাহাজ যেতে পারবে: ইরান জ্বালানিতে স্বস্তি: ১৫ এপ্রিল এলএনজি-এলপিজি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়বে আরও ৫ জাহাজ

যাঁর রক্তে ভিজে আছে প্রতিটি বাংলা বর্ণমালা, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

ভয়েস ডিজিটাল ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১০:৩৭:১৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ নভেম্বর ২০২৫ ২৬১ বার পড়া হয়েছে

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত  (২রা নভেম্বর, ১৮৮৬ – ২৯শে মার্চ ১৯৭১)  বাংলা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার ইতিহাসে যে নামটি দীপ্ত অক্ষরে লেখা রয়েছে, তিনি শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত—যাঁর রক্তে ভিজে আছে বাংলাদেশের মাটি, ভিজে আছে প্রতিটি বাংলা বর্ণমালা।

১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তান রাষ্ট্রের বয়স তখন মাত্র ছয় মাস। করাচিতে বসেছে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন। সেখানে প্রস্তাব ওঠে—ইংরেজির সঙ্গে উর্দুকে পাকিস্তান গণপরিষদের সরকারি ভাষা করা হবে। ঠিক সেই সময়েই ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সাহসিকতার সঙ্গে সংশোধনী প্রস্তাব দেন—বাংলাকেও সমান মর্যাদা দিয়ে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

তাঁর যুক্তি ছিল অটল, স্পষ্ট এবং পরিসংখ্যানভিত্তিক, পাকিস্তানের মোট ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখই বাংলাভাষী। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাকে যদি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া হয়, তবে তা হবে অন্যায় ও অবিচার।

তিনি গণপরিষদে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী উত্থাপন করেছিলেন—

১️⃣ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া,
২️⃣ প্রতি বছর অন্তত একবার ঢাকায় পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন আয়োজন।

তাঁর বক্তব্যে আবেগের চেয়ে যুক্তির জোরই ছিল বেশি। পূর্ব বাংলার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন—পোস্ট অফিসে মানিঅর্ডার ফরম পূরণ করতে গিয়েও একজন সাধারণ মানুষ উর্দু ফর্মে হিমশিম খান। সেই বাস্তবতা দিয়েই তিনি যুক্তি দাঁড় করান মাতৃভাষার মর্যাদার পক্ষে।

তবে তিনি জানতেন, এই দাবি সহজ হবে না। তবু আশা করেছিলেন, পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগ নেতারা হয়তো সমর্থন জানাবেন। কিন্তু তমিজুদ্দিন খানের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ একযোগে তাঁর প্রস্তাবের বিরোধিতা করে।

১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি, স্পিকার তমিজুদ্দিন খান ঘোষণা দেন—ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব গৃহীত হচ্ছে না। এর ফলেই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে তরুণ প্রজন্ম। পরদিন, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ঢাকায় ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে রাস্তায় নামে। শুরু হয় প্রতিবাদ ও ধর্মঘট। এরপর ১১ মার্চ সারা প্রদেশে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়—যে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, রমেশদাশ গুপ্তসহ অসংখ্য ছাত্রনেতা।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রত্যাখ্যাত প্রস্তাবই সেই আগুন জ্বেলে দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলনের প্রেরণা হয়ে ওঠে। তাঁর সাহসিকতাই ছিল ভাষা সংগ্রামের প্রথম মশাল।

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয়ের পর অবশেষে ৯ মে পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে, যে স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।

কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় আরও করুণ, আরও গৌরবময়। ১৯৭১ সালের মার্চে, স্বাধীনতার উষালগ্নে, কুমিল্লার নিজ বাড়ির আঙিনায় তিনি উত্তোলন করেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। কয়েকদিন পর, ২৯ মার্চ, পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে ধরে নিয়ে যায় ছোট ছেলে দিলীপকুমার দত্তসহ। ময়নামতি সেনানিবাসে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করা হয় এই প্রবীণ রাজনীতিবিদকে। তার রক্তে ভিজে থাকে প্রতিটি বাংলা বর্ণমালা।

তিনি শুধু ভাষা আন্দোলনের প্রথম কণ্ঠস্বর নন,
তিনি আমাদের চেতনার দিশারী,
ভাষা আন্দোলনের ধ্রুব নক্ষত্র — শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

যাঁর রক্তে ভিজে আছে প্রতিটি বাংলা বর্ণমালা, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

আপডেট সময় : ১০:৩৭:১৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ নভেম্বর ২০২৫

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত  (২রা নভেম্বর, ১৮৮৬ – ২৯শে মার্চ ১৯৭১)  বাংলা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার ইতিহাসে যে নামটি দীপ্ত অক্ষরে লেখা রয়েছে, তিনি শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত—যাঁর রক্তে ভিজে আছে বাংলাদেশের মাটি, ভিজে আছে প্রতিটি বাংলা বর্ণমালা।

১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তান রাষ্ট্রের বয়স তখন মাত্র ছয় মাস। করাচিতে বসেছে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন। সেখানে প্রস্তাব ওঠে—ইংরেজির সঙ্গে উর্দুকে পাকিস্তান গণপরিষদের সরকারি ভাষা করা হবে। ঠিক সেই সময়েই ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সাহসিকতার সঙ্গে সংশোধনী প্রস্তাব দেন—বাংলাকেও সমান মর্যাদা দিয়ে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

তাঁর যুক্তি ছিল অটল, স্পষ্ট এবং পরিসংখ্যানভিত্তিক, পাকিস্তানের মোট ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখই বাংলাভাষী। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাকে যদি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া হয়, তবে তা হবে অন্যায় ও অবিচার।

তিনি গণপরিষদে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী উত্থাপন করেছিলেন—

১️⃣ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া,
২️⃣ প্রতি বছর অন্তত একবার ঢাকায় পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন আয়োজন।

তাঁর বক্তব্যে আবেগের চেয়ে যুক্তির জোরই ছিল বেশি। পূর্ব বাংলার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন—পোস্ট অফিসে মানিঅর্ডার ফরম পূরণ করতে গিয়েও একজন সাধারণ মানুষ উর্দু ফর্মে হিমশিম খান। সেই বাস্তবতা দিয়েই তিনি যুক্তি দাঁড় করান মাতৃভাষার মর্যাদার পক্ষে।

তবে তিনি জানতেন, এই দাবি সহজ হবে না। তবু আশা করেছিলেন, পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগ নেতারা হয়তো সমর্থন জানাবেন। কিন্তু তমিজুদ্দিন খানের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ একযোগে তাঁর প্রস্তাবের বিরোধিতা করে।

১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি, স্পিকার তমিজুদ্দিন খান ঘোষণা দেন—ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব গৃহীত হচ্ছে না। এর ফলেই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে তরুণ প্রজন্ম। পরদিন, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ঢাকায় ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে রাস্তায় নামে। শুরু হয় প্রতিবাদ ও ধর্মঘট। এরপর ১১ মার্চ সারা প্রদেশে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়—যে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, রমেশদাশ গুপ্তসহ অসংখ্য ছাত্রনেতা।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রত্যাখ্যাত প্রস্তাবই সেই আগুন জ্বেলে দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলনের প্রেরণা হয়ে ওঠে। তাঁর সাহসিকতাই ছিল ভাষা সংগ্রামের প্রথম মশাল।

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয়ের পর অবশেষে ৯ মে পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে, যে স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।

কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় আরও করুণ, আরও গৌরবময়। ১৯৭১ সালের মার্চে, স্বাধীনতার উষালগ্নে, কুমিল্লার নিজ বাড়ির আঙিনায় তিনি উত্তোলন করেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। কয়েকদিন পর, ২৯ মার্চ, পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে ধরে নিয়ে যায় ছোট ছেলে দিলীপকুমার দত্তসহ। ময়নামতি সেনানিবাসে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করা হয় এই প্রবীণ রাজনীতিবিদকে। তার রক্তে ভিজে থাকে প্রতিটি বাংলা বর্ণমালা।

তিনি শুধু ভাষা আন্দোলনের প্রথম কণ্ঠস্বর নন,
তিনি আমাদের চেতনার দিশারী,
ভাষা আন্দোলনের ধ্রুব নক্ষত্র — শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।