ঢাকা ১০:৫৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া ঠেকাতে সাপ্তাহিক পরিচ্ছন্নতা অভিযানের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর নাহিদ রানার ঝড়ো বোলিংয়ে পাকিস্তান পুড়ল, ২০৯ বল বাকি রেখে জয় বাংলাদেশের বড়পুকুরিয়া কয়লার পাহাড়, আগুনে নষ্ট হচ্ছে বিপুল মজুদ সূর্যমুখীর হলুদ হাসিতে ভরেছে টাঙ্গাইলের মাঠ, স্বপ্ন দেখছেন কৃষক ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিনেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত, শপথ নেবেন স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার ভোলার চরাঞ্চলে ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ: কৃষকের স্বপ্নে অর্থনৈতিক মুক্তির সম্ভাবনা প্রান্তিক নারীদের আয়বৃদ্ধিমূলক দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দিতে হবে: বিএনপিএস নদী ভাঙনের হুমকিতে মধ্যনগরের মহিষখলা জাতীয় স্মৃতিসৌধ ট্রাম্প-পুতিনের ফোন আলোচনা ইরান যুদ্ধ ও তেল বাজার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি, ১,৩২৭ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা বাংলাদেশের

বইপ্রেমীরা কখনো একা হয় না

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:১৫:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৪ ১৮৫ বার পড়া হয়েছে
ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

গল্পটা কয়েক বছরের জমানো

লোকটা বইয়ের উপর ঝুঁকে আছে। মনে হয়েছে, পৃথিবীতে বইয়ের চেয়ে আপন

তার আর কিছু নেই

 

সাহানারা খাতুন

গত কয়েকবছর ধরে আমার প্রতিদিনের যাতায়াতের রাস্তায় এক মাঝ বয়সের লোককে দেখে আসছি। অভিশপ্ত করোনার পর থেকে পাকাপাকি রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখি মানুষটাকে । রাস্তার পাশে ভাঙা পাঁচিল কিংবা পৌরসভার বাঁধানো জলাশয়ের ঘাটে, ফুটপাতে তার রাত দিন কাটে। কোথায় ঘুমায় কখন ঘুমায় কিছুই এতোদিনে উদ্ধার করতে পারিনি। কিন্তু খুব সকাল হোক বা রাত যখনই ওই রাস্তা দিয়ে যাই দেখা পাবো নিশ্চিত ।

সামনে পথচলতি মানুষ দেখলেই হাত উঁচু করে বলে ওঠে কিছু সাহায্য করবেন? ভিক্ষা করা অপরাধ আর অবশ্যই এটা একটা সামাজিক সমস্যা জেনেও মানবিক কারণে আমরা সবাই কমবেশি তাদের সাহায্য করে থাকি । ভিখারি বললে ঠিক যে ছবিটা আমাদের চোখের সামনে ফুটে ওঠে ছেঁড়া মলিন পোষাক, হাতে ভিক্ষার পাত্র এই লোকটা তেমন নয়। এই এলাকার সবাই তাকে চেনে জানে ।কখনো দেখি সামনে রাখা ফয়েলের প্লেটে ভাত তরকারি ।

কখনো গামছা পেতে গাছে মাথা ঠেকিয়ে বসে থাকে। মাঝে মাঝে ভাবি আপন বলতে কি কেউ নেই তার ! থাকলে হয়তো এতদিনে খোঁজ নিত বা নিয়ে যেত । অনেকেই জানার চেষ্টা করেছে কিন্তু বিশেষ কিছু লাভ হয়নি । তার সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করলে শুধু মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে । অবশ্য তাকে দিয়ে কোনোদিন এ পাড়ার কারো কোনো ক্ষতি হয়েছে বলে শুনিনি। নিরুত্তাপ মানুষটা ওই একটাই বাক্য ব্যবহার করে থাকে কিছু সাহায্য করবেন ? তার ওই কিছু চাওয়ার মধ্যে আবেদন বা অনুরোধ বলে কিছু ছিল না অথচ প্রশ্ন আছে।

বরাবরই অন্য ভিখারির থেকে তাকে আলাদা বলে মনে হতো আমার । সব সময় পাশে রাখা থাকে একটা ঢাউস ব্যাগ আর একটা লাঠি ।বেশিরভাগ ভিখারিকে ধর্মের কথা ব্যবহার করে ভিক্ষা করতে দেখা যায় । ভগবান তোমার ভালো করবে’ শুনলেই বেশিরভাগ মানুষ বিগলিত হয়ে যায় দেখি কারণ সেখানে গোপনে একটা আধ্যাত্মিক লেনদেনের বিষয় থাকে বলে বোধহয়! এপারে হোক বা ওপারে ভালো কিছু নিশ্চিত হবে জেনেই দান করার আগ্রহ অনেকের বেড়ে যায়। যাই হোক যে কথাই ছিলাম এই লোকটাকে আজ পর্যন্ত কিছু সাহায্য করবেন’ বলা ছাড়া কিছু বলতে শুনিনি ।

একদিন এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটলো ও দুর্লভ একটি অভিজ্ঞতা হল তাকে নিয়ে আমার । কয়েকটি জরুরী কাজ নিয়ে অন্যদিনের তুলনায় একটু দ্রুত হেঁটে যাচ্ছিলাম সেদিন। যথারীতি রাস্তার পাশে মুখ নিচু করে বসেছিল লোকটা । পাশ কাটিয়ে চলে গিয়ে হঠাৎ আমার মনে হল আজ তো কোনো প্রশ্ন এলো না! একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকিয়ে যা দেখলাম তাতে আমার সমস্ত কাজের তাড়া স্তব্ধ হয়ে গেল । আমি আশ্চর্য হয়ে দেখলাম তার দু পায়ের ফাঁকে একটা মোটা বই । লোকটা বইয়ের উপর ঝুঁকে আছে। মনে হয়েছে, পৃথিবীতে বইয়ের চেয়ে আপন তার আর কিছু নেই।

জীবনে এই প্রথমবার একটি ভিখারিকে রাস্তার পাশে বই পড়তে দেখলাম । আমি । আমি কয়েকপা পিছিয়ে তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম । ততক্ষণে আরও একাধিক মানুষ সামনে থেকে হেঁটে চলে গেলেও বই থেকে মুখ তুললো না একটাবারও । লোকটার কাছে বেশ কয়েক মিনিট দাড়িয়ে  ভাবলাম, বই পড়লে মানুষ যেগুলো অর্জন করে যেমন জ্ঞান বুদ্ধি বাড়ে ,মনোযোগ বাড়ে , স্মৃতিশক্তি বাড়ে। তার যে কোন প্রয়োজনটা মিটছে জানিনা ! তার প্রয়োজন তো দু বেলা দুমুঠো পেটে খাবার জোগানো । অবশ্য বই পড়লে মানসিক শান্তি পাওয়া যায় বটে । ভাবছিলাম ওই শিক্ষিত মানুষটার অবস্থার কথা । এসব ভেবে কিছুটা সংকোচ নিয়ে তাকে প্রশ্ন করলাম তুমি বই পড়তে পারো ? সটান মাথা তুলে চোখে চোখ রেখে বললো হুঁ।

দেখলাম বুক পকেটে সাত আটটা কলম। পাশে রাখা ব্যাগের মধ্যে আরও একটা বই উঁকি দিচ্ছে । আমি আর তাকে বিরক্ত না করে খানিকটা দূরে গিয়ে দেখলাম আবার ঠিক আগের মত বইয়ের উপর মুখ ঝুঁকে পড়ছে । এই মহামূল্যবান দৃশ্যের একটা ছবি তুলে নিলাম আমি। তারপর নিজের কাজে বেরিয়ে পড়লাম ।সেদিন সারাদিন আমি যে যে কাজের মধ্যে ছিলাম সারাক্ষণ ওই মানুষটার কথা ভেবেছি ফাঁকে ফাঁকে ।

কোন মানুষের জীবনের পরিণতি কখন যে কেমন হয় তা বোঝা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয় । প্রায় দিনই তাকে ওই ভাবেই দেখি । কত শিশু তার মায়ের হাত ধরে ওই রাস্তা দিয়ে বিদ্যালয়ে যায় । কলেজ পড়ুয়ারাও যায় । মাঝে মাঝে ওই দৃশ্য দেখে আমার মনে হয় মানুষটা যেন মডেল হয়ে বসে আছে আর অনবরত বার্তা দিয়ে যাচ্ছে যে বইপ্রেমীরা কখনো একা হয় না ।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

বইপ্রেমীরা কখনো একা হয় না

আপডেট সময় : ০৮:১৫:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৪

 

গল্পটা কয়েক বছরের জমানো

লোকটা বইয়ের উপর ঝুঁকে আছে। মনে হয়েছে, পৃথিবীতে বইয়ের চেয়ে আপন

তার আর কিছু নেই

 

সাহানারা খাতুন

গত কয়েকবছর ধরে আমার প্রতিদিনের যাতায়াতের রাস্তায় এক মাঝ বয়সের লোককে দেখে আসছি। অভিশপ্ত করোনার পর থেকে পাকাপাকি রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখি মানুষটাকে । রাস্তার পাশে ভাঙা পাঁচিল কিংবা পৌরসভার বাঁধানো জলাশয়ের ঘাটে, ফুটপাতে তার রাত দিন কাটে। কোথায় ঘুমায় কখন ঘুমায় কিছুই এতোদিনে উদ্ধার করতে পারিনি। কিন্তু খুব সকাল হোক বা রাত যখনই ওই রাস্তা দিয়ে যাই দেখা পাবো নিশ্চিত ।

সামনে পথচলতি মানুষ দেখলেই হাত উঁচু করে বলে ওঠে কিছু সাহায্য করবেন? ভিক্ষা করা অপরাধ আর অবশ্যই এটা একটা সামাজিক সমস্যা জেনেও মানবিক কারণে আমরা সবাই কমবেশি তাদের সাহায্য করে থাকি । ভিখারি বললে ঠিক যে ছবিটা আমাদের চোখের সামনে ফুটে ওঠে ছেঁড়া মলিন পোষাক, হাতে ভিক্ষার পাত্র এই লোকটা তেমন নয়। এই এলাকার সবাই তাকে চেনে জানে ।কখনো দেখি সামনে রাখা ফয়েলের প্লেটে ভাত তরকারি ।

কখনো গামছা পেতে গাছে মাথা ঠেকিয়ে বসে থাকে। মাঝে মাঝে ভাবি আপন বলতে কি কেউ নেই তার ! থাকলে হয়তো এতদিনে খোঁজ নিত বা নিয়ে যেত । অনেকেই জানার চেষ্টা করেছে কিন্তু বিশেষ কিছু লাভ হয়নি । তার সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করলে শুধু মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে । অবশ্য তাকে দিয়ে কোনোদিন এ পাড়ার কারো কোনো ক্ষতি হয়েছে বলে শুনিনি। নিরুত্তাপ মানুষটা ওই একটাই বাক্য ব্যবহার করে থাকে কিছু সাহায্য করবেন ? তার ওই কিছু চাওয়ার মধ্যে আবেদন বা অনুরোধ বলে কিছু ছিল না অথচ প্রশ্ন আছে।

বরাবরই অন্য ভিখারির থেকে তাকে আলাদা বলে মনে হতো আমার । সব সময় পাশে রাখা থাকে একটা ঢাউস ব্যাগ আর একটা লাঠি ।বেশিরভাগ ভিখারিকে ধর্মের কথা ব্যবহার করে ভিক্ষা করতে দেখা যায় । ভগবান তোমার ভালো করবে’ শুনলেই বেশিরভাগ মানুষ বিগলিত হয়ে যায় দেখি কারণ সেখানে গোপনে একটা আধ্যাত্মিক লেনদেনের বিষয় থাকে বলে বোধহয়! এপারে হোক বা ওপারে ভালো কিছু নিশ্চিত হবে জেনেই দান করার আগ্রহ অনেকের বেড়ে যায়। যাই হোক যে কথাই ছিলাম এই লোকটাকে আজ পর্যন্ত কিছু সাহায্য করবেন’ বলা ছাড়া কিছু বলতে শুনিনি ।

একদিন এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটলো ও দুর্লভ একটি অভিজ্ঞতা হল তাকে নিয়ে আমার । কয়েকটি জরুরী কাজ নিয়ে অন্যদিনের তুলনায় একটু দ্রুত হেঁটে যাচ্ছিলাম সেদিন। যথারীতি রাস্তার পাশে মুখ নিচু করে বসেছিল লোকটা । পাশ কাটিয়ে চলে গিয়ে হঠাৎ আমার মনে হল আজ তো কোনো প্রশ্ন এলো না! একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকিয়ে যা দেখলাম তাতে আমার সমস্ত কাজের তাড়া স্তব্ধ হয়ে গেল । আমি আশ্চর্য হয়ে দেখলাম তার দু পায়ের ফাঁকে একটা মোটা বই । লোকটা বইয়ের উপর ঝুঁকে আছে। মনে হয়েছে, পৃথিবীতে বইয়ের চেয়ে আপন তার আর কিছু নেই।

জীবনে এই প্রথমবার একটি ভিখারিকে রাস্তার পাশে বই পড়তে দেখলাম । আমি । আমি কয়েকপা পিছিয়ে তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম । ততক্ষণে আরও একাধিক মানুষ সামনে থেকে হেঁটে চলে গেলেও বই থেকে মুখ তুললো না একটাবারও । লোকটার কাছে বেশ কয়েক মিনিট দাড়িয়ে  ভাবলাম, বই পড়লে মানুষ যেগুলো অর্জন করে যেমন জ্ঞান বুদ্ধি বাড়ে ,মনোযোগ বাড়ে , স্মৃতিশক্তি বাড়ে। তার যে কোন প্রয়োজনটা মিটছে জানিনা ! তার প্রয়োজন তো দু বেলা দুমুঠো পেটে খাবার জোগানো । অবশ্য বই পড়লে মানসিক শান্তি পাওয়া যায় বটে । ভাবছিলাম ওই শিক্ষিত মানুষটার অবস্থার কথা । এসব ভেবে কিছুটা সংকোচ নিয়ে তাকে প্রশ্ন করলাম তুমি বই পড়তে পারো ? সটান মাথা তুলে চোখে চোখ রেখে বললো হুঁ।

দেখলাম বুক পকেটে সাত আটটা কলম। পাশে রাখা ব্যাগের মধ্যে আরও একটা বই উঁকি দিচ্ছে । আমি আর তাকে বিরক্ত না করে খানিকটা দূরে গিয়ে দেখলাম আবার ঠিক আগের মত বইয়ের উপর মুখ ঝুঁকে পড়ছে । এই মহামূল্যবান দৃশ্যের একটা ছবি তুলে নিলাম আমি। তারপর নিজের কাজে বেরিয়ে পড়লাম ।সেদিন সারাদিন আমি যে যে কাজের মধ্যে ছিলাম সারাক্ষণ ওই মানুষটার কথা ভেবেছি ফাঁকে ফাঁকে ।

কোন মানুষের জীবনের পরিণতি কখন যে কেমন হয় তা বোঝা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয় । প্রায় দিনই তাকে ওই ভাবেই দেখি । কত শিশু তার মায়ের হাত ধরে ওই রাস্তা দিয়ে বিদ্যালয়ে যায় । কলেজ পড়ুয়ারাও যায় । মাঝে মাঝে ওই দৃশ্য দেখে আমার মনে হয় মানুষটা যেন মডেল হয়ে বসে আছে আর অনবরত বার্তা দিয়ে যাচ্ছে যে বইপ্রেমীরা কখনো একা হয় না ।