জ্বালানি-বিদ্যুতের সংকটে শিল্প উৎপাদন ও কৃষি সেচে স্থবিরতা
- আপডেট সময় : ০৪:৪৭:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এখন এক গভীর চাপের মুখে। যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে শিল্প, কৃষি ও সাধারণ মানুষের জীবনে। ২০২৬ সালের এপ্রিলের চিত্র বলছে, চাহিদা ও সরবরাহের সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই খাত সামান্য চাপেই নড়বড়ে হয়ে পড়ছে। গ্রীষ্মকালীন তাপদাহ ও বোরো মৌসুমের সেচের কারণে দেশের পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪,৫০০ থেকে ১৫,০০০ মেগাওয়াটে। অনেক সময় এই চাহিদা আরও বাড়ছে। ফলে বাস্তবে প্রতিদিনই গড়ে ৫০০ থেকে ১,০০০ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা অনেক সময় আরও বেশি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সর্বোচ্চ উৎপাদন ১৬,৭৯৪ মেগাওয়াট পর্যন্ত গেলেও তা নিয়মিত ধরে রাখা কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না।
এই ঘাটতির ফলেই দেশজুড়ে বাড়ছে লোডশেডিং। শহরাঞ্চলেও দিনে কয়েক দফা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা দেখা যাচ্ছে, আর গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন এলাকায় দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ উঠছে। অনেক জায়গায় আধা ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে এক থেকে দেড় ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, এ যেন নতুন বাস্তবতা। লোড ম্যানেজমেন্টে সমন্বয়হীনতার কারণে কোথাও কোথাও টানা কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে ভোক্তাদের।

বিদ্যুতের এই সংকট সরাসরি আঘাত হানছে কৃষি খাতে। বোরো ধান চাষের জন্য প্রয়োজনীয় সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ পাম্প চালানো যাচ্ছে না, ফলে জমিতে পানি দেওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, শিল্প খাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বিদ্যুৎ ঘাটতি ও জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং রপ্তানি আয়েও চাপ পড়ছে।
জ্বালানি তেলের বাজারেও একই ধরনের অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন পাম্পে দীর্ঘ লাইন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তেল না পাওয়ার অভিযোগ বাড়ছে। যদিও সরকার দাবি করছে, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং নিয়মিত আমদানি অব্যাহত আছে। ইতোমধ্যে ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে দুই দফায় ১৩ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়েছে এবং আরও জাহাজ আসছে। তবুও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। অভিযোগ উঠছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে জ্বালানি মজুত করছে এবং সংকটকে পুঁজি করে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করছে। একই সঙ্গে গুজবও বাজারে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে, ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। নতুন দামে প্রতি লিটার অকটেন ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা, ডিজেল ১১৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন খরচ বাড়ানোর মাধ্যমে নিত্যপণ্যের দামেও প্রভাব ফেলতে পারে, যা সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতিকে আরও ত্বরান্বিত করবে। বিশ্ববাজারেও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবহন হয়, ফলে সেখানে কোনো ধরনের অস্থিরতা বৈশ্বিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এই সংকট দেশের অর্থনীতিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, কৃষিতে অনিশ্চয়তা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সবকিছু মিলিয়ে অর্থনীতি এখন এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



















