শ্রমিক অসন্তোষ পাঁচটি শিল্পাঞ্চলে ৩০০ পোশাক কারখানায় ছুটি
- আপডেট সময় : ০৬:৪৫:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬ ২৬ বার পড়া হয়েছে
৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম বেতন দাবি, ছাঁটাই বন্ধ ও বকেয়া পরিশোধের দাবিতে বিক্ষোভ; ৮০ কারখানায় ছুটি, মিরপুরে অগ্নিসংযোগ-নাশকতার অভিযোগে ১১ জন আটক
শ্রমিক অসন্তোষের জেরে বাংলাদেশের পাঁচটি শিল্পাঞ্চলে তিন শতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে রবিবার (১ নভেম্বর) রাজধানীর মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে বিক্ষোভে নামেন পোশাকশ্রমিকেরা। বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং সরকারি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
গ্রেফতার করা হয়েছে ১৩ জনকে। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাভার ও আশুলিয়ায় ১৭৭টি এবং গাজীপুরে শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার মো. মুমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, নিরাপত্তার স্বার্থে কারখানাগুলি বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন আশা প্রকাশ করেন, সোমবার থেকে কারখানাগুলিতে উৎপাদন স্বাভাবিক হবে। মিরপুরে সংঘর্ষ ও সরকারি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবির দাবি, গ্রেফতার ব্যক্তিরা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত এবং বিভিন্ন জেলা থেকে এসে নাশকতার চেষ্টা করেছিলেন। এই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা অবশ্য তদন্তসাপেক্ষ।
এদিকে, শ্রমিক অসন্তোষ মোকাবিলায় রবিবার সন্ধ্যায় জরুরি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অর্থ, স্বরাষ্ট্র ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ ছয় থেকে সাতজন মন্ত্রী ও উপদেষ্টাকে বৈঠকে ডাকা হয়। এর আগে শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। শ্রমিকদের দাবিদাওয়া ও শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সরকার কী পদক্ষেপ করে, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের প্রধান দাবি, মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে শ্রমিকদের ছাঁটাই বা কালো তালিকাভুক্ত না করা, বকেয়া বেতন-বোনাস পরিশোধ, কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মপরিবেশের উন্নয়নের দাবিও জানানো হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় অতিরিক্ত গরমের জন্য বিশেষ ভাতা বা ‘হিট অ্যালাউন্স’ চালুর দাবিও উঠেছে।

রোববার সকাল থেকে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ শুরু হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। কোথাও মহাসড়ক অবরোধ, কোথাও কারখানার সামনে অবস্থান এবং কয়েকটি স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং শিল্পাঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
গাজীপুরে পিকআপ ও কারখানার গোডাউনে আগুন
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার রতনপুর এলাকায় করনী নিট কম্পোজিট, নিট এশিয়াসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিয়ে সফিপুর বাজার এলাকায় মহাসড়কে অবস্থান নেন। তাদের বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে আশপাশের অন্তত ৩০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
এদিকে, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এর কিছুক্ষণ পর একই এলাকায় ট্রপিক্যাল নামের একটি পোশাক কারখানার ঝুটের গোডাউনে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম জানান, ট্রপিক্যাল কারখানার গোডাউনে আগুন লাগার খবর পেলেও শ্রমিক আন্দোলনের কারণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে বাধার মুখে পড়েন।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

আশুলিয়ায় অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি
গাজীপুরের পাশাপাশি সাভারের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভ ও অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কায় অর্ধশতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, শ্রমিক আন্দোলনের কারণে অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন, ১১ নেতাকর্মী আটক
এদিকে, রাজধানীর মিরপুরে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম বেতনের দাবিতে চলা শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে মিশে নাশকতার চেষ্টা করার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ১১ নেতাকর্মীকে আটক করেছে ডিবি।
রোববার ডিবি মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খাঁন আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, কয়েক দিন ধরে শ্রমিকেরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করছেন। তবে শনিবার থেকে আন্দোলনে সহিংসতার ঘটনা বাড়তে থাকে। রোববারও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
ডিবির এই কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা নাশকতার চেষ্টা করছেন। মিরপুর ১০ ও আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১১ জনকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিরা বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার তৃণমূল পর্যায়ের নেতা বলে জানান তিনি।
তিনি আরও দাবি করেন, পলাতক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার ভাগ্নে আলিফ মোল্লা এ নাশকতার সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছেন। ঢাকার বাইরে থেকে নেতাকর্মীদের এনে জড়ো করার অভিযোগও করেন তিনি। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও আটকের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান ডিবির এই কর্মকর্তা।

মিরপুরে সড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
রোববার বেলা ১১টার দিকে মিরপুর ১১ নম্বরে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এর আগে সড়ক থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে ওই এলাকার যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ জলকামান, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। এ সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে আন্দোলনকারীদের সড়ক থেকে সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয় পুলিশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আন্দোলনকারী শ্রমিকদের সঙ্গে সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো চক্র যুক্ত হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে।
তিনি জানান, পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তার সহায়তায় সড়ক পরিষ্কার করা হয়েছে। জনভোগান্তি কমাতে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। এ সময় সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হলেও লাঠিপেটা করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
পোশাকশিল্পে উৎপাদন ও রপ্তানি নিয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস তৈরি পোশাকশিল্প। এ খাতে দীর্ঘস্থায়ী শ্রমিক অসন্তোষের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলে সময়মতো পণ্য সরবরাহ, রপ্তানি আদেশ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একদিকে শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মপরিবেশসংক্রান্ত দাবির সমাধান, অন্যদিকে কারখানার নিরাপত্তা ও উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা—দুই দিক সামাল দেওয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ। শ্রমিক-মালিকপক্ষের মধ্যে কার্যকর আলোচনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির মাধ্যমে দ্রুত সংকট নিরসন না হলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ শিল্প খাতে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।









