বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে আমদানির বিদ্যুৎ গিলছে অবৈধ ব্যাটারি অটোরিকশা
- আপডেট সময় : ১০:৩১:১৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
পুলিশের তথ্য অরনুযায়ী ঢাকায় চিহ্নিত অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা ৪৮ হাজার ১৩৬টি
অবৈধ গ্যারেজ রয়েছে ৯৯২টি
রাজপথে হুকিং, বাসাবাড়ির মিটারে বাণিজ্য
দেশজুড়ে অবৈধ অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জে
প্রতিদিন প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিদ্যুৎ আমদানি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি। দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। পাশাপাশি কয়লা, এলএনজি (LNG) ও জ্বালানি তেল আমদানির মাধ্যমেও বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে হচ্ছে। ফলে জ্বালানি খাতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর ক্রমাগত চাপ তৈরি হচ্ছে।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে ভারত থেকে আদানি পাওয়ার, এনভিভিএন, পিটিসি ইন্ডিয়া ও সেম্বকর্প—এই চার উৎস থেকে বাংলাদেশ প্রায় ১ হাজার ৬৪১ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ আমদানি করেছে। এর মূল দাম বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৯৯৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে আদানি পাওয়ারকে ১১ হাজার ৯৩৩ কোটি ৪৪ লাখ, এনভিভিএনকে ৩ হাজার ৪৫৭ কোটি ৮২ লাখ, পিটিসি ইন্ডিয়াকে ১ হাজার ৬৫১ কোটি ৩২ লাখ এবং সেম্বকর্পকে ১ হাজার ৯৫৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এনভিভিএনের বিদ্যুতের জন্য ২১১ কোটি ৭১ লাখ টাকা হুইলিং চার্জ পরিশোধ করা হয়। সব মিলিয়ে চার উৎস থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে মোট ব্যয় হয়েছে ১৭ হাজার ২১১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখতে বিপুল পরিমাণ কয়লা, এলএনজি ও জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। এসব পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ডলারে পরিশোধ করতে হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের প্রধান খাত হলো বিদ্যুৎ, কয়লা, এলএনজি এবং জ্বালানি তেল আমদানি। সরাসরি বিদ্যুৎ কেনা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি সংগ্রহ দুই ক্ষেত্রেই বৈদেশিক মুদ্রার বড় ধরনের বহিঃপ্রবাহ ঘটছে।
এ অবস্থায় ঢাকায় অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের অবৈধ ব্যবহার। বিদ্যুতের খুঁটি থেকে সরাসরি তার টেনে কিংবা আবাসিক মিটারের সংযোগ ব্যবহার করে চলছে এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ।
সড়কের পাশে, ফুটপাত ও আবাসিক এলাকার গলিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজ। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৮টি অপরাধ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকায় চিহ্নিত অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা ৪৮ হাজার ১৩৬টি। অবৈধ গ্যারেজ রয়েছে ৯৯২টি।
বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও সরঞ্জাম জব্দ করা হলেও অনেক স্থানে ফের চালু হচ্ছে এই অবৈধ কার্যক্রম। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) হিসাবে, দেশজুড়ে অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জে প্রতিদিন প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে, যা মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ। এর একটি বড় অংশ অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে রাত হলেই ফুটপাত ও সড়কের পাশে সারিবদ্ধভাবে অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। কোথাও বিদ্যুতের খুঁটি থেকে সরাসরি তার টানা হয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এসব তার পথচারী ও চালকদের জন্যও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে।
সাতরাস্তা, দক্ষিণ বেগুনবাড়ী, বেগুনবাড়ী পোস্ট অফিস ও বিটাক-সিদ্দিক মাস্টার মোড় এলাকায় শত শত অটোরিকশা চার্জ দেওয়া হয়। স্থানীয় গ্যারেজকর্মীদের ভাষ্য, এসব এলাকায় দেড় শতাধিক গ্যারেজ রয়েছে। প্রতিদিন সেখানে প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার অটোরিকশা চার্জ দেওয়া হয়।
শুধু হুকিং নয়, আবাসিক মিটারের বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও চলছে বাণিজ্যিক চার্জিং। মোহাম্মদপুরের একটি আবাসিক এলাকার গলিতে টিনশেডের একটি গ্যারেজে একসঙ্গে প্রায় ৩০টি অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। আবাসিক সংযোগের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে প্রতি রিকশার ব্যাটারি চার্জ বাবদ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
ডেসকোর চলতি বছরের মে মাসের একটি নথি অনুযায়ী, তাদের আওতাধীন এলাকায় বৈধ চার্জিং সংযোগ ছিল ২ হাজার ৯৯৭টি। এসব সংযোগে প্রায় ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য রয়েছে।
অবৈধ চার্জিং বন্ধে গত জুলাইয়ে তেজগাঁও ও হাতিরঝিলে ডিপিডিসি ও ডিএমপি যৌথ অভিযান চালায়। সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। সর্বশেষ ১৮ আগস্টও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ও হাতিরঝিলে অভিযান চালিয়ে ছয়টি ব্যাটারিচালিত ভ্যান ও চারটি ব্যাটারি জব্দ করা হয়। এ সময় পুলিশ ও অটোরিকশাচালকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে।
ডিএমপির ট্রাফিক উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মো. শাহজাহান হোসেন বলেন, অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট বিচ্ছিন্ন করতে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা চাইলে পুলিশ সর্বাত্মক সহায়তা করবে।


















