নদী মরছে, বিপন্ন হচ্ছে নগরসভ্যতা
- আপডেট সময় : ১২:৫২:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে
ঢাকার চারপাশের জলধারা রক্ষায় এখনই প্রয়োজন জলবায়ু–সহনশীল ও টেকসই পদক্ষেপ
একটি শহরের সভ্যতা কতটা উন্নত, তার পরিচয় শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা দ্রুতগতির যানবাহনে পাওয়া যায় না। সেই শহর তার নদী, খাল, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে কতটা নিরাপদ রাখতে পেরেছে, তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একটি নগরের প্রকৃত সভ্যতার পরিচয়। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা আজ এক গভীর পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি।
মেগাসিটি ঢাকা নদী ও জলধারায় ঘেরা একটি প্রাচীন নগর। দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা, পূর্বে বালু ও শীতলক্ষ্যা এবং উত্তর-পশ্চিমে তুরাগ, একসময় এসব নদী ছিল ঢাকার জীবন ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। নদীর পানি ছিল স্বচ্ছ, ছিল মাছ ও জলজ প্রাণের সমৃদ্ধ আবাস। নদীপথে চলত বাণিজ্য, মানুষের যাতায়াত এবং নগরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কিন্তু দখল, শিল্পবর্জ্য, পয়োনিষ্কাশন, অপরিশোধিত তরল বর্জ্য ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপে সেই নদীগুলো এখন ক্রমেই বিষাক্ত হয়ে উঠছে।
ঢাকার প্রাণপ্রবাহ বুড়িগঙ্গার সংকট সবচেয়ে প্রকট। নদীতে প্রতিনিয়ত প্রবেশ করছে শিল্পকারখানার বর্জ্য, নগরের পয়োবর্জ্য এবং ড্রেনের দূষিত পানি। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়ায় এর আত্মশুদ্ধির ক্ষমতাও দুর্বল হয়েছে। ফলে দূষণ শুধু পানিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না, নদীতীরবর্তী মানুষের জীবন, জীবিকা ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
এটি এখন আর কেবল পরিবেশের সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির সমস্যাও। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বব্যাংক ঢাকার পানি দূষণ কমানো, স্যানিটেশন ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং নদী-খাল পুনরুদ্ধারে ৩৭০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। সংস্থাটির তথ্য বলছে, ঢাকার আন্তঃসংযুক্ত জলপথে ৮০ শতাংশের বেশি অপরিশোধিত বর্জ্যপানি ও পয়োবর্জ্য গিয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ঢাকার অর্ধেকের বেশি খাল হারিয়ে গেছে বা আবর্জনা ও দখলে আটকে গেছে।

শিল্পদূষণের চিত্রও উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ঢাকার আশপাশে সাত হাজারের বেশি কারখানা প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত বর্জ্যপানি জলপথে ছাড়ে। এর ফলে নদী ও খালের পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
বাংলাদেশের রাজধানীর এই সংকটের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্কও গভীর। ঢাকা একটি নিম্নভূমি ও বন্যাপ্রবণ বদ্বীপ অঞ্চলের নগর। অতিবৃষ্টি, উজানের পানির চাপ এবং নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে যদি অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাভূমি ভরাট ও নদীর প্রবাহ সংকট যুক্ত হয়, তাহলে জলাবদ্ধতা ও নগর বন্যার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায়ও বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে ভারী ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে, যা ঢাকার বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়াবে।
অর্থাৎ নদী দূষণ ও নদী দখলকে বিচ্ছিন্ন পরিবেশগত অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নদীর প্রবাহ কমে গেলে নগরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল হয়, জলাভূমি হারিয়ে গেলে বৃষ্টির পানি ধারণের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা নষ্ট হয়, আর দূষিত নদীর পানি যখন বন্যা বা জলাবদ্ধতার সময় নগরে ঢুকে পড়ে, তখন পরিবেশগত সংকট রূপ নেয় জনস্বাস্থ্য সংকটে।
এই বাস্তবতায় নদী রক্ষায় সরকারি নজরদারি ও আইন প্রয়োগের উদ্যোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক অভিযানে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা এলাকায় নদীদূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং তরল বর্জ্যের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক পরিদর্শনে পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকা এবং বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা ছাড়া উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি উঠে এসেছে। সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষার জন্য গবেষণাগারে পাঠানো হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা নদী ও এর সংযোগ খালসংলগ্ন ১০৩টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত তরল বর্জ্য নির্গমনের দায়ে ২ কোটি ৯২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে। এর মধ্যে আদায় হয়েছে ৯৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা। একই সময়ে ইটিপিবিহীন নয়টি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, জরিমানা, অভিযান ও বিচ্ছিন্ন সংযোগের পরও যদি নদীতে দূষণ চলতে থাকে, তাহলে স্থায়ী সমাধান কোথায়?

এর উত্তর খুঁজতে হলে নদীকে শুধু পানি প্রবাহের পথ হিসেবে নয়, নগরের প্রাকৃতিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নদী ও খাল পুনরুদ্ধার, শিল্পবর্জ্য পরিশোধন, পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, এসবকে একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।
এখানে জলবায়ু অর্থায়নের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাতিসংঘের জলবায়ু কাঠামোর আওতায় তার তৃতীয় জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান বা NDC 3.0 জমা দিয়েছে। এখন সেই প্রতিশ্রুতিকে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় রূপ দিতে হলে রাজধানীর নদী ও জলাভূমি রক্ষাকে জলবায়ু অভিযোজনের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কারণ ঢাকার নদী রক্ষা মানে শুধু পানি পরিষ্কার করা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে লাখো মানুষের স্বাস্থ্য, নগরের পানি নিষ্কাশন, জলাবদ্ধতা মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, নগর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবন।
এই জায়গাতেই সামনে আসছে COP31-এর গুরুত্ব। ২০২৬ সালের ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন COP31 অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি, জলবায়ু অর্থায়ন এবং নগর সহনশীলতার প্রশ্নগুলো আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
ঢাকার নদীগুলো সেই আলোচনার একটি বাস্তব উদাহরণ হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় শুধু বাঁধ, ড্রেন বা কংক্রিটের অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়, প্রকৃতিনির্ভর সমাধানও জরুরি। নদী ও খালের প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, জলাভূমি সংরক্ষণ, সবুজ ও নীল অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং দূষণের উৎসে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন ও নগর ব্যবস্থাপনার কাজ।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক ঢাকার পানি নিরাপত্তা ও সহনশীলতা কর্মসূচিতেও নদী ও খাল পুনরুদ্ধার, দূষণ পর্যবেক্ষণ, শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং ঢাকার চারটি প্রধান নদীর জন্য সমন্বিত পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে কোনো প্রকল্পই সফল হবে না যদি তার সঙ্গে থাকে না দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, কঠোর আইন প্রয়োগ, স্বচ্ছতা, জনসম্পৃক্ততা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়। নদী রক্ষার দায়িত্ব শুধু পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা কোনো একটি সংস্থার নয়; এটি রাষ্ট্র, শিল্পমালিক, নগর কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ নাগরিক, সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
আজকের ঢাকা তার নদীগুলোর কাছে একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি, আমরা কি নদীকে বাঁচিয়ে একটি বাসযোগ্য নগর রেখে যেতে চাই, নাকি উন্নয়নের নামে নদী হারিয়ে একটি বিপন্ন নগরসভ্যতার উত্তরাধিকার তৈরি করতে চাই?
বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনার প্রেক্ষাপটে ঢাকার নদী কেবল বাংলাদেশের স্থানীয় সমস্যা নয়। এটি দেখিয়ে দেয়, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে একটি শহরের পরিবেশ রক্ষা, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়ন একই সুতোয় বাঁধা। নদীকে বাঁচানো মানে প্রকৃতিকে বাঁচানো, প্রকৃতিকে বাঁচানো মানে মানুষকে বাঁচানো; আর মানুষকে বাঁচানোই একটি সভ্যতার সবচেয়ে বড় সাফল্য।



















