জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর গণভবনে শেষ পরিকল্পনা, তবু টিকল না শেখ হাসিনার ক্ষমতা
- আপডেট সময় : ০৩:৪১:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬ ২৮ বার পড়া হয়েছে
‘২০২৪ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে দিনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ২০২৪ সালের এই দিনে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-এর ব্যানারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলন শুরু হয়। এর আগে ৫ জুন হাইকোর্ট ২০১৮ সালে জারি করা কোটা বাতিলসংক্রান্ত সরকারি পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করলে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ মোট ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহালের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা মাঠে নামেন। ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ, মিছিল ও সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হয় এবং ৪ জুলাই পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সময়ে জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জগন্নাথ ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী ৩৬ দিনের ধারাবাহিক আন্দোলন, সংঘাত ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ একপর্যায়ে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে’
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান এক যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর দুই বছর পূর্তিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া বিভিন্ন সাক্ষ্য, তদন্ত প্রতিবেদন এবং আদালতে উপস্থাপিত তথ্যপ্রমাণে আন্দোলনের শেষ পর্যায়ের নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ৪ আগস্ট রাতে গণভবনে অনুষ্ঠিত শেষ বৈঠক এবং ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকাতে নেওয়া পরিকল্পনার বিষয়গুলো উঠে এসেছে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের রাজসাক্ষ্যে।
ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, জুলাই আন্দোলন শুরু হওয়ার পর সরকার আন্দোলন দমনে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করে। ১৯ জুলাই থেকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসভবনে নিয়মিত কোর কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো। এসব বৈঠকে প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নিতেন। সেখানে আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি, সমন্বয়কদের কার্যক্রম এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হতো।

রাজসাক্ষ্যে তিনি দাবি করেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের গ্রেপ্তার বা বিচ্ছিন্ন করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল। গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি আদালতকে জানান। তার ভাষ্যমতে, আন্দোলনকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করে রাজপথের চাপ কমিয়ে আনার চেষ্টা ছিল সরকারের অন্যতম কৌশল।
পরিস্থিতি যখন ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল, তখন ৪ আগস্ট সকালে গণভবনে নিরাপত্তা সমন্বয় কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে আন্দোলনের পরিস্থিতি, গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা হয়।
তবে সেদিনের আলোচনাতেই বিষয়টির সমাপ্তি হয়নি। রাজসাক্ষ্য অনুযায়ী, দিনভর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠলে রাতে আবারও গণভবনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডেকে পাঠানো হয়। সেই বৈঠকে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি প্রতিরোধের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সেনাবাহিনীর সমন্বিত তৎপরতার মাধ্যমে রাজধানীর প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে আদালতে উল্লেখ করেন সাবেক আইজিপি।
বৈঠক শেষে তিনি সেনাবাহিনীর অপারেশন কন্ট্রোল রুমে যান। সেখানে রাজধানীর প্রবেশমুখে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন, নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্দোলনকারীদের ঢাকায় প্রবেশ ঠেকানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা দ্রুত বদলে যেতে থাকে। ৫ আগস্ট ভোর থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকার দিকে রওনা হন। উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে রাজধানীতে প্রবেশ করতে শুরু করে জনতার ঢল।

অন্যদিকে আন্দোলনের নেতৃত্বও নিজেদের কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম জানান, প্রথমে ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনের নেতৃত্বের কাছে তথ্য আসে যে, ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করে সমন্বয়কদের গ্রেপ্তার, গুম বা হত্যার চেষ্টা হতে পারে। এ আশঙ্কা থেকেই কর্মসূচি একদিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়।
নাহিদের ভাষ্যমতে, ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সরকার পতনের এক দফা ঘোষণা করা হয় এবং দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হয়। আন্দোলনের সাংগঠনিক প্রস্তুতির পাশাপাশি সম্ভাব্য রাজনৈতিক রূপান্তর নিয়েও আলোচনা চলছিল বলে তিনি আদালতে উল্লেখ করেন।
৫ আগস্ট সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, শহীদ মিনার, চানখারপুলসহ কয়েকটি এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। একই সময়ে শাহবাগ এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। একপর্যায়ে সেনাবাহিনী সড়ক ছেড়ে দিলে রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে বিপুল সংখ্যক মানুষ জমায়েত হতে থাকেন।

দুপুরের দিকে আন্দোলনকারীদের বিশাল মিছিল শাহবাগ থেকে গণভবনের দিকে অগ্রসর হয়। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানীতে প্রবেশ করা মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে সরকারের পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। জনস্রোতের মুখে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে হেলিকপ্টারে গণভবন ত্যাগ করেন। পরে তারা ভারতে আশ্রয় নেন।
গণভবন ত্যাগের মধ্য দিয়ে শেষ হয় টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসন। এরপর দেশজুড়ে বিজয় মিছিল, উল্লাস এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা ঘটে। পরবর্তী সময়ে জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত, সাক্ষ্য এবং উপস্থাপিত নথিপত্রে আন্দোলনের শেষ পর্যায়ের ঘটনাপ্রবাহের নানা দিক উঠে এসেছে। এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট হয় যে একদিকে সরকার প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কৌশলের মাধ্যমে আন্দোলন দমন করতে চেয়েছিল, অন্যদিকে আন্দোলনের নেতৃত্ব দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে নিজেদের পরিকল্পনা পরিবর্তন করেছিল। শেষ পর্যন্ত ৪ আগস্ট রাতের বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত কিংবা রাজধানীর প্রবেশপথে নিরাপত্তা জোরদার—কোনো কিছুই জনতার স্রোত থামাতে পারেনি।
ফলে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতন নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতা, জনআকাঙ্ক্ষা এবং গণআন্দোলনের সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।



















