শিশুহত্যার অভিযুক্ত বাবা-ছেলেকে ঘিরে আদিতমারীতে রণক্ষেত্র, এসপিসহ আহত ২০
- আপডেট সময় : ০৯:১২:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ ৩২ বার পড়া হয়েছে
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকাসক্ত বিধান চন্দ্র প্রতিবেশী শিশু নন্দিনীকে ফুসলিয়ে ভুট্টাখেতে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করে। পরে লাশ বস্তায় ভরে মাটিচাপা দেয়। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় শিশুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধারের ঘটনায় আটক বাবা-ছেলেকে ঘিরে পুলিশ ও বিক্ষুব্ধ জনতার মধ্যে প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার এ সংঘর্ষে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আটক দুজনকে দেখতে ও তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘটনাস্থলে জড়ো হলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে জনতার সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করতে হয়। সংঘর্ষে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি), থানার ওসিসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নিহত নন্দিনী কান্ত রায় (৭) একই গ্রামের নলিনী কান্ত রায়ের মেয়ে। আটক দুজন হলেন ফলিমারী গ্রামের রণজিৎ কুমার ও তার ছেলে বিধান চন্দ্র রায় (২২)।
এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা লালমনিরহাট জেলা প্রশাসকের (ডিসি) গাড়িসহ প্রশাসনের অন্তত সাতটি সরকারি যানবাহনে ভাঙচুর চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ তিন রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে আদিতমারী থানার ওসিকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বিকাল থেকে শিশু নন্দিনী নিখোঁজ ছিল। স্বজনরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি। মঙ্গলবার সকালে বাড়ির পাশের একটি ভুট্টাখেতে সদ্য খুঁড়ে রাখা নরম মাটি দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়।

পরে মাটি খুঁড়ে বস্তাবন্দি অবস্থায় শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
স্থানীয়দের বরাতে পুলিশ জানায়, সোমবার সন্ধ্যায় অভিযুক্ত বিধান চন্দ্রকে ওই ভুট্টাখেত থেকে কোদাল হাতে ফিরতে দেখেছিলেন এক প্রতিবেশী। এ সন্দেহের জেরে মঙ্গলবার দুপুরে এলাকাবাসী বিধানের বাড়িতে গিয়ে তাকে খুঁজতে থাকেন।
গ্রেফতার এড়াতে বিধান নিজের ঘরে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে ভেতরে আত্মগোপন করেছিলেন বলে জানা যায়। পরে উত্তেজিত জনতা তালা ভেঙে তাকে আটক করে পেটানোর চেষ্টা চালায়।
খবর পেয়ে আদিতমারী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিধানকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। এ সময় জনতা অভিযুক্তকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজেদের হাতে তাৎক্ষণিক বিচার করার দাবি জানায়। পুলিশ এতে অস্বীকৃতি জানালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং পুরো গ্রাম রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
পরে লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক, বিজিবি-১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমামসহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের সদস্যদের অবরুদ্ধ করে ফেলে।
প্রায় তিন ঘণ্টা পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ তিন রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে। এরপর অভিযুক্ত বিধান ও তার বাবাকে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগের সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে চারদিক থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়।
ইটের আঘাতে পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, আদিতমারী থানার ওসি নাজমুল হকসহ প্রশাসনের অন্তত ২০ জন আহত হন। ভাঙচুর করা হয় জেলা প্রশাসকের গাড়িসহ সাতটি সরকারি যানবাহন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকাসক্ত বিধান চন্দ্র প্রতিবেশী শিশু নন্দিনীকে ফুসলিয়ে ভুট্টাখেতে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করে। পরে লাশ বস্তায় ভরে মাটিচাপা দেয়। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, আমি সকাল থেকেই ঘটনাস্থলে ছিলাম। জনতার ছোড়া ইটের আঘাতে আমিও আহত হয়েছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তিন রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে হয়েছে।
তিনি আরও জানান, নন্দিনী হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং মূল অভিযুক্তসহ দুজনকে আটক করা হয়েছে। সরকারি কাজে বাধা ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় পৃথক আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক বলেন, নৃশংস এ শিশু হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আপাতত থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।



















