তারল্য সকট মোকাবিলায় ২,৫০০ কোটি টাকার ঋণ দিল বাংলাদেশ ব্যাংক
- আপডেট সময় : ০৮:৫৩:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬ ২৩ বার পড়া হয়েছে
ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে গুরুতর আর্থিক ও তারল্য সংকটের মুখে পড়েছে। ব্যাংকটির এই নাজুক অবস্থার পেছনে এস আলম গ্রুপের নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ ঋণ উত্তোলন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন, নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিরতা এবং গ্রাহকদের মধ্যে আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এস আলম গ্রুপ ও তাদের সহযোগীরা ইসলামী ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশ, অর্থাৎ ১ লাখ ৮৭ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা বিভিন্নভাবে বের করে নিয়েছে। এর ফলে ব্যাংকটিতে বর্তমানে ৯৫ হাজার ৬২৯ কোটি টাকার বিপুল খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হয়েছে।
সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংকটির মালিকানা ও পরিচালনায় পরিবর্তন আসে। সম্প্রতি নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিতর্ক, আন্দোলন এবং বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ায় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
এদিকে চলমান অনিশ্চয়তা ও গুজবের কারণে আতঙ্কিত গ্রাহকরা গত এক সপ্তাহে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত তুলে নিয়েছেন। অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের এই চাপ ব্যাংকটিকে চরম তারল্য সংকটে ফেলেছে। ফলে অনেক এটিএম বুথে নগদ অর্থের সংকট দেখা দিয়েছে এবং কিছু বুথে টাকা শূন্য হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
এমন পরিস্থিতিতে তারল্য সংকট মোকাবিলা এবং গ্রাহকদের তাৎক্ষণিক অর্থ উত্তোলনের চাহিদা পূরণে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ১০ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা (ঋণ) চেয়েছে।
তারল্য সংকট মোকাবিলায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিশেষ ঋণ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রোববার সকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সিদ্ধান্ত নেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকা ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাবে এ অর্থ জমা করা হয়েছে।
এর ফলে ব্যাংকটির চেক নিষ্পত্তি কার্যক্রম পুনরায় স্বাভাবিকভাবে চালু হয়েছে। ব্যাংকটির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক হারে আমানত উত্তোলনের প্রবণতা দেখা দিয়েছে। নগদ অর্থের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকটি তারল্য সংকটে পড়ে।
ইসলামী ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, নতুন আমানত প্রায় না থাকলেও গ্রাহকেরা ধারাবাহিকভাবে টাকা তুলছেন। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কিছু শাখার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাই গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগপ্রাপ্ত স্বতন্ত্র পরিচালকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। পবিত্র ঈদুল আজহার আগে, ২৪ মে ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন।
পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে স্বতন্ত্র পরিচালক ও নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগের পর থেকেই ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে একদল গ্রাহক সাত দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। রোববার সকালে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা।
চেয়ারম্যানের পদত্যাগসহ বিভিন্ন দাবিতে আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ শেয়ারবাজার থেকে নামে-বেনামে শেয়ার কিনে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকটি এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয় এবং বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ইসলামী ব্যাংকের মোট ঋণের ৫০ শতাংশেরও বেশি বর্তমানে খেলাপি, যার বড় একটি অংশ এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে বিতরণ করা হয়েছিল।



















