দুবাইয়ে গ্রেপ্তার সাবেক আইজিপি বেনজীর প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু
- আপডেট সময় : ০৮:৪০:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬ ২৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত নাম সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থপাচারের অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাকে অবশেষে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় পুলিশ।
আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে পরিচালিত এই অভিযানে তাঁকে আটক করা হয়েছে বলে বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। তাঁর গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দেশের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
বাংলাদেশ পুলিশের সদর দপ্তরের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (এআইজি) শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোলের সহযোগিতায় বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকারকে তাঁর গ্রেপ্তারের বিষয়টি অবহিত করে।
জাতীয় সংসদে দেওয়া এক বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল। সেই নোটিশের ভিত্তিতেই দুবাই পুলিশ তাঁকে আটক করে। বর্তমানে তিনি ইউএই কর্তৃপক্ষের হেফাজতে রয়েছেন এবং তাঁকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, আবুধাবির ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) জানিয়েছে যে, দেশটির আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তারের ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠাতে হবে। ইতোমধ্যে এনসিবি ঢাকা আন্তর্জাতিক সমন্বয়, ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়ার বেশ কিছু ধাপ সম্পন্ন করেছে। পরবর্তী পর্যায়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইউএই সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানো হবে।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বর্তমানে প্রতারণা, জালিয়াতি, দুর্নীতি, সম্পদের তথ্য গোপন, অর্থপাচার এবং পাসপোর্ট আইনের বিভিন্ন ধারায় একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার বেশ কয়েকটিতে আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছেন।
একসময় বাংলাদেশের অন্যতম ক্ষমতাধর পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের পুলিশ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
তাঁর কর্মজীবন যেমন আলোচিত ছিল, তেমনি বিতর্কও ছিল ব্যাপক। বিশেষ করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সেই তালিকায় বেনজীর আহমেদের নামও অন্তর্ভুক্ত হয়। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে ২০২৪ সালে।
ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কয়েক মাস আগে বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের বিপুল সম্পদের তথ্য সামনে আসে। এর পরপরই দুর্নীতি দমন কমিশন তাঁর সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে নামে এবং একটি বিশেষ অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে।
দুদকের তদন্তে যে চিত্র উঠে আসে, তা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। বিভিন্ন জেলা ও শহরে জমি, ফ্ল্যাট, প্লট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক হিসাব এবং সঞ্চয়পত্রের তথ্য তদন্তকারীদের হাতে আসে।
সব মিলিয়ে তাঁর পরিবারের নামে প্রায় ৬৯৭ বিঘা জমির সন্ধান পাওয়া যায় বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে যে, রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় তাঁর পরিবারের মালিকানায় একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে।
আদাবরে একটি ভবনের ছয়টি ফ্ল্যাটের মালিক হিসেবে তাঁর স্ত্রীর নাম পাওয়া যায়। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায় প্রায় ২৪ কাঠার একটি মূল্যবান প্লটের তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে আদালতের নির্দেশে তাঁর এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা বহু সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
গোপালগঞ্জে একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট ও প্রাসাদ নির্মাণ নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবারের জমি বিভিন্ন উপায়ে অধিগ্রহণ করে সেখানে বিলাসবহুল স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছিল।
পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে জমি ক্রয় এবং সম্পদ অর্জনের অভিযোগও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোই এখনো বিচারাধীন এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
তদন্ত শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই বেনজীর আহমেদ দেশ ত্যাগ করেন। দুদকের অনুসন্ধান অব্যাহত থাকা অবস্থায় তিনি পরিবারসহ বিদেশে চলে যান বলে জানা যায়। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে আন্তর্জাতিকভাবে তাঁকে খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ সরকার।
ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি হওয়ার পর থেকেই তাঁকে গ্রেপ্তারের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার শুধু একজন সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ দেশের দুর্নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে। সরকারও এই ঘটনাকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এ ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে যে, অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি যতই ক্ষমতাধর হোন না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার একটি বহুল আলোচিত ঘটনা। প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সফল হলে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম নতুন গতি পাবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
একই সঙ্গে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর প্রকৃত সত্যও আদালতের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।



















