কালো টাকা সাদা করা নিয়ে যা বললেন এনবিআর চেয়ারম্যান
- আপডেট সময় : ০৭:৫১:১৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬ ৬৪ বার পড়া হয়েছে
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগ’ প্রসঙ্গ। অর্থবিলে জমি, ভবন ও অ্যাপার্টমেন্ট কেনাবেচার ক্ষেত্রে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার একটি বিধান রাখায় অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের একটি অংশ সমালোচনা করেছে। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলছেন, এটিকে প্রচলিত অর্থে ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগ’ বলা ঠিক হবে না; বরং এটি সম্পত্তির প্রকৃত লেনদেনমূল্য প্রদর্শনের একটি ব্যবস্থা।
শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন তিনি।
কালো টাকা বলতে কী বোঝায়?
সাধারণভাবে যে আয় বা সম্পদের তথ্য সরকারকে জানানো হয় না, কিংবা যার ওপর আইন অনুযায়ী কর পরিশোধ করা হয়নি, তাকে অপ্রদর্শিত আয় বা প্রচলিত ভাষায় ‘কালো টাকা’ বলা হয়। তবে সব অপ্রদর্শিত অর্থই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে আসে না। অনেক সময় বৈধ উৎস থেকে অর্জিত অর্থও বিভিন্ন কারণে আয়কর নথিতে দেখানো হয় না বা সম্পদের প্রকৃত মূল্য দলিলে উল্লেখ করা হয় না। পরবর্তীতে সেই অর্থের হিসাব দিতে গিয়ে করদাতারা জটিলতায় পড়েন।
বাংলাদেশে জমি ও ফ্ল্যাট কেনাবেচার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে একটি বাস্তবতা হলো—দলিলে যে মূল্য দেখানো হয়, প্রকৃত লেনদেনের মূল্য অনেক সময় তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি থাকে। ফলে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের কাছেই একটি অপ্রদর্শিত অর্থের অংশ থেকে যায়।
এনবিআর চেয়ারম্যানের ব্যাখ্যা
আব্দুর রহমান খান বলেন, এবারের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার কোনো নতুন বিধান রাখা হয়নি। বরং গত অর্থবছরে চালু করা একটি ব্যবস্থার পরিধি বাড়ানো হয়েছে।
তার ভাষায়, একজন ব্যক্তি যদি ৫ কোটি টাকায় জমি বিক্রি করেন কিন্তু রেজিস্ট্রেশনের সময় দলিলে মূল্য দেখানো হয় ১ কোটি টাকা, তাহলে বাকি ৪ কোটি টাকার হিসাব নিয়ে তিনি সমস্যায় পড়েন। যদিও অর্থটি তার বৈধ উপার্জন বা সম্পত্তি বিক্রির অর্থ।
এই সমস্যা সমাধানে গত বছর বিক্রেতাদের জন্য একটি সুযোগ রাখা হয়েছিল। যদি তারা ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনের প্রমাণ, বায়নানামা বা প্রয়োজনীয় দলিল দেখাতে পারেন, তাহলে নিয়মিত কর এবং মূলধনী মুনাফার ওপর প্রযোজ্য কর পরিশোধ করে সেই অর্থ বৈধভাবে প্রদর্শন করতে পারবেন।
এবার একই ধরনের সুবিধা সম্পত্তির ক্রেতাদের জন্যও রাখা হয়েছে।
কেন ক্রেতাদের জন্য সুযোগ?
এনবিআর চেয়ারম্যান উদাহরণ দিয়ে বলেন, কেউ যদি ২০ কোটি টাকা দিয়ে একটি ফ্ল্যাট কিনেন কিন্তু দলিলে মূল্য দেখানো হয় মাত্র ৩ কোটি টাকা, তাহলে পরবর্তীতে কর কর্মকর্তারা প্রকৃত লেনদেনের তথ্য পেলে ওই ব্যক্তির কাছে অতিরিক্ত ১৭ কোটি টাকার উৎস জানতে চাইতে পারেন।
সেই ক্ষেত্রে তাকে কর, জরিমানা এবং আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। এসব পরিস্থিতি এড়াতে ক্রেতাকে স্বেচ্ছায় প্রকৃত ক্রয়মূল্য ঘোষণা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, করদাতারা যদি নিজেরাই অপ্রদর্শিত অংশ ঘোষণা করেন, তাহলে নির্ধারিত কর ও অতিরিক্ত কর পরিশোধের মাধ্যমে সেটি বৈধভাবে দেখাতে পারবেন। এর ফলে ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধে ওই অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে না।
অর্থবিলে কী বলা হয়েছে?
অর্থবিল অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি স্বপ্রণোদিত হয়ে জমি, ভবন বা অ্যাপার্টমেন্টের প্রকৃত ক্রয়মূল্য কিংবা বিক্রয়মূল্য ঘোষণা করলে এবং নির্ধারিত কর পরিশোধ করলে সেই অর্থের উৎস নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না।
ক্রেতার ক্ষেত্রে দলিলমূল্য ও প্রকৃত মূল্যের মধ্যে পার্থক্য থাকলে সেই অতিরিক্ত অর্থের ওপর নিয়মিত আয়কর হার অনুযায়ী কর দিতে হবে।
অন্যদিকে বিক্রেতার ক্ষেত্রে দলিলমূল্যের বাইরে পাওয়া অর্থের ওপর মূলধনী মুনাফার জন্য প্রযোজ্য হারে কর দিতে হবে। বর্তমানে এই করহার ১৫ শতাংশ।
তবে কেউ যদি স্বেচ্ছায় ঘোষণা করার আগেই কর কর্তৃপক্ষের অডিট বা তদন্তের আওতায় চলে আসেন, তাহলে তাকে নির্ধারিত করের পাশাপাশি অতিরিক্ত ২০ শতাংশ করও দিতে হবে।
সমালোচনা কোথায়?
বাজেট ঘোষণার পর গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডিসহ বিভিন্ন মহল থেকে এ ব্যবস্থার সমালোচনা করা হয়েছে। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ কর-শৃঙ্খলার জন্য ইতিবাচক বার্তা দেয় না।
সমালোচকদের মতে, যারা নিয়মিত কর পরিশোধ করেন তাদের তুলনায় দীর্ঘদিন আয় গোপনকারীরা বিশেষ সুবিধা পেয়ে যান। ফলে করদাতাদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হয় এবং কর সংস্কৃতি দুর্বল হতে পারে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য
সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সমস্যার মূল কারণ হলো সরকারি নির্ধারিত মৌজা রেট ও বাজারমূল্যের বিশাল পার্থক্য।
তিনি জানান, সরকার সারা দেশে মৌজাভিত্তিক সম্পত্তির মূল্য পুনর্নির্ধারণের কাজ শুরু করেছে। বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মৌজা রেট নির্ধারণ করা গেলে দলিলে কম মূল্য দেখানোর প্রবণতা কমে যাবে।
অর্থমন্ত্রীর মতে, মৌজা রেট বাস্তবসম্মত করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার প্রয়োজনও অনেকাংশে কমে আসবে।
সারকথা
সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি প্রচলিত অর্থে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নয়; বরং সম্পত্তি কেনাবেচার প্রকৃত মূল্যকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার একটি উদ্যোগ। তবে সমালোচকদের মতে, অপ্রদর্শিত অর্থের ওপর কর দিয়ে বৈধতা পাওয়ার সুযোগ থাকলে সেটি কার্যত কালো টাকা সাদা করার ব্যবস্থাই। ফলে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক এখনও অব্যাহত রয়েছে এবং অর্থবিল পাসের আগে এ নিয়ে আরও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

















