শস্যভান্ডার রংপুর কৃষিভিত্তিক শিল্পই হতে পারে উন্নয়নের নতুন পথ
- আপডেট সময় : ১০:৩৪:৫২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬ ২৭ বার পড়া হয়েছে
রংপুর অঞ্চলের অর্থনীতি ও জীবিকার প্রধান চালিকাশক্তি হলো কৃষি। বিশেষ করে আমন ও বোরো এবং আলুর পাশাপাশি ভুট্টা চাষে ব্যাপক সাফল্য এসেছে এই অঞ্চলে। সমতল ভূমিতে চা, কফি এবং উন্নত জাতের ফল আঙুর চাষ করে রংপুর বিভাগের কৃষকরা কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছেন
রংপুরে কৃষির সাফল্য দেশের খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ধান, আলু, ভুট্টা, আম, লিচু ও চায়ের মতো কৃষিপণ্যে এ অঞ্চল আজ জাতীয় অর্থনীতির শক্তিশালী অবদানকারী। দেশের মোট খাদ্য উৎপাদনের বড় অংশ আসে রংপুর বিভাগ থেকে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক গভীর বাস্তবতা। কৃষকের আয় অনিশ্চিত, শ্রমিকের কাজ মৌসুমি, আর শিল্পায়নের অভাবে লাখো মানুষ জীবিকার সংকটে ভুগছে। কৃষিকে ঘিরে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো না থাকায় সেই সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি বাস্তবতায় রূপ নিতে পারেনি।
রংপুর বিভাগের বিস্তীর্ণ উর্বর জমি দেশের কৃষি উৎপাদনে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। এখানে বছরে একাধিকবার চাষাবাদ হয়। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জাতীয় কৃষি উৎপাদনের প্রায় এক–চতুর্থাংশ আসে এই অঞ্চল থেকে। ধান উৎপাদনে রংপুর দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে আমন ধান উৎপাদনে এ অঞ্চলের কৃষকেরা অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছেন। একই সঙ্গে দেশের মোট ভুট্টা উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি রংপুর বিভাগে উৎপাদিত হয়। দিনাজপুর জেলায় সবচেয়ে বেশি ভুট্টা উৎপাদন হয়, যা দেশের পোলট্রি ও পশুখাদ্য শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সরবরাহ করে।

আলু উৎপাদনেও রংপুরের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। দেশের মোট আলু উৎপাদনের প্রায় ৩৫ শতাংশ আসে এই বিভাগের আট জেলা থেকে। কৃষকরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ালেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, সংরক্ষণ সংকট এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে অনেক সময় ক্ষতির মুখে পড়েন। বিশেষ করে পর্যাপ্ত হিমাগার না থাকায় কৃষকদের অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে আলু বিক্রি করেন।
শুধু ধান, আলু বা ভুট্টা নয়, রংপুরের হাঁড়িভাঙা আম, দিনাজপুরের লিচু এবং পঞ্চগড়ের সমতলের চা নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। হাঁড়িভাঙা আম এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও পরিচিতি পাচ্ছে। কিন্তু যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প না থাকায় বিপুল পরিমাণ ফল নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুলতে পারলে রংপুর অঞ্চল দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
তবে কৃষিতে এই সাফল্যের বিপরীতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কর্মসংস্থানের অভাব। কৃষিকাজ মৌসুমি হওয়ায় বছরের নির্দিষ্ট সময় ছাড়া শ্রমিকদের হাতে কাজ থাকে না। ফলে হাজারো কৃষিশ্রমিক জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছেন। কেউ নির্মাণশ্রমিক, কেউ রাজমিস্ত্রি, আবার কেউ দিনমজুর হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু সেখানেও কাজের নিশ্চয়তা নেই। অনেকে বাধ্য হয়ে ঢাকা বা চট্টগ্রামে পাড়ি জমাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে টেকসই করতে হলে কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের কোনো বিকল্প নেই। আলু থেকে চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ও স্টার্চ উৎপাদন, ভুট্টা থেকে পশুখাদ্য ও খাদ্যপণ্য তৈরি, আম ও লিচু প্রক্রিয়াজাত করে জুস, জ্যাম ও শুকনো ফল উৎপাদনের মতো উদ্যোগ ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। এতে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাবেন, একই সঙ্গে তরুণদের জন্য স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
রংপুর অঞ্চলে শিল্পায়ন পিছিয়ে থাকার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো গ্যাস–সংযোগের অভাব। বড় শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি প্রয়োজন, যা এখনো এ অঞ্চলে পর্যাপ্ত নয়। এছাড়া স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতির ঘাটতিও বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। ফলে উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।
তবে আশার খবরও রয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে নতুন ইপিজেড স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে। কুড়িগ্রামে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। রংপুরের কাউনিয়ায় কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক শিল্প বিকাশের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে শিল্প ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতির অংশে পরিণত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, সহজ ঋণ সুবিধা, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা। পাশাপাশি কৃষকদের বাজার ব্যবস্থাপনায় সহায়তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি সম্প্রসারণ জরুরি।
রংপুরের কৃষি আজ দেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি। কিন্তু কৃষকের জীবনে স্থায়ী উন্নয়ন আনতে হলে কৃষিকে ঘিরে শিল্পায়নের পথ তৈরি করতে হবে। কৃষকের ঘামে উৎপাদিত ফসল যদি স্থানীয় শিল্পে ব্যবহার হয়, তবে শুধু খাদ্যনিরাপত্তাই নয়, কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় এবং আঞ্চলিক উন্নয়নও নিশ্চিত হবে। কৃষি বাঁচলে দেশ বাঁচবে, এটি শুধু স্লোগান নয়, বাস্তব উন্নয়নের মূল ভিত্তি। তাই রংপুরের কৃষি সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত শিল্পায়নই হতে পারে উত্তরবঙ্গের দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূর করার সবচেয়ে কার্যকর পথ।


















