খেলার মাঠ থেকে নদীতে: উপকূলের শিশুদের কঠিন জীবন
- আপডেট সময় : ০৫:৫৪:৩৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
খেলার বয়সে স্কুলব্যাগ কাঁধে নেওয়ার কথা। অথচ পটুয়াখালীর উপকূলজুড়ে হাজারো শিশুর কাঁধে এখন শ্রমের ভার। কারও হাতে মাছ ধরার জাল, কারও মাথায় মাছের ঝুড়ি, কেউ আবার বরফকলে দিনমজুর। দারিদ্র্য, নদীভাঙন ও জলবায়ু সংকট মিলিয়ে তাদের শৈশব কেড়ে নিয়েছে নির্মম বাস্তবতা।
রাঙ্গাবালী, গলাচিপা, কলাপাড়া ও বাউফল উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সূর্য ওঠার আগেই শিশুদের কর্মব্যস্ত দিন শুরু হয়। কেউ নৌকা নিয়ে নদী বা সাগরে যায়, কেউ ছুটে যায় বরফকল বা শুঁটকি পল্লীতে। স্কুলের ঘণ্টাধ্বনি তাদের জীবনে প্রায় অনুপস্থিত।
নৌকাই ঘর, নদীই জীবন
গলাচিপার বোয়ালিয়া ঘাটে আগুনমুখা নদীর তীরে একটি নৌকায় বাস করে ১২ বছর বয়সী জাহাঙ্গীর। নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে বহু বছর আগে পরিবারটি এখানে আশ্রয় নেয়। আট বছর বয়স থেকেই সে মাছ ধরার কাজে যুক্ত। প্রতিদিন ভোরে সাগরের দিকে যাত্রা করে, ঝড়-ঢেউ উপেক্ষা করে।
জাহাঙ্গীরের কণ্ঠে হতাশা, “পড়াশোনা করতে ইচ্ছা ছিল, কিন্তু ঘরে ভাত নাই। বাবা অসুস্থ, মা যা আয় করে তা দিয়ে চলে না। তাই ছোটবেলা থেকেই কাজ করি।” মাছ ধরা বন্ধ থাকলে সে জাল সেলাই করে আয় করে।
একই বাস্তবতা ১৪ বছর বয়সী রুমান সরদারের। চতুর্থ শ্রেণির পর দারিদ্র্যের কারণে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয় সে। এখন বরফকলে কাজ করে দিনে ২০০-৩০০ টাকা আয় করে। তার কথায়, “স্কুলে গেলে খাওন পাওয়া যায় না, কাজ করলে অন্তত ভাত জোটে।”
রুবেল হাওলাদারের গল্প আরও করুণ। মা মারা যাওয়ার পর বাবার নতুন সংসার হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই জীবিকার দায় তার কাঁধে। কখনো স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। এখন মাছ ধরেই নিজের ও নানার ভরণপোষণ চালায়।
শিশুশ্রমে ভর করছে উপকূল
চরমোন্তাজ মান্তা পল্লীতে দেখা যায় ৭ থেকে ১৫ বছর বয়সী শতাধিক শিশু শ্রমে যুক্ত। কেউ বাবা-মায়ের সঙ্গে, কেউ অন্যের নৌকায় মাছ ধরে। সারা দিন নদীর ঢেউ আর রোদ-বৃষ্টির সঙ্গে লড়াই করে তারা। সন্ধ্যায় তীরে ফিরে কিছু সময় খেলাধুলা করলেও পরদিন আবার একই চক্রে ফিরে যেতে হয়।
অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকের অভাব পূরণ করতেই শিশুদের কাজে নামানো হচ্ছে। যেমন সাকিব (৮), যে মায়ের সঙ্গে নদীতে মাছ ধরে। তার মা জানান, স্বামী অসুস্থ হওয়ায় ছেলেকেই সহযোগী হিসেবে নিতে হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম বড় কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে উপকূলের মানুষ বারবার সর্বস্বান্ত হচ্ছে। ফলে পরিবারগুলো টিকে থাকার জন্য শিশুদের শ্রমে ঠেলে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষকের মতে, “উপকূলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। দারিদ্র্য বাড়ছে, আর সেই চাপ সরাসরি পড়ছে শিশুদের ওপর। অনেক পরিবারে শিশুরাই প্রধান উপার্জনকারী হয়ে উঠছে।”
ইউনিসেফ-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ শিশু জলবায়ু ঝুঁকিতে রয়েছে, যার মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৪৫ লাখ শিশু নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ সংকট
চিকিৎসকদের মতে, অল্প বয়সে কঠোর শ্রম শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। পুষ্টিহীনতা, সংক্রমণ ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকা বা রোদে কাজ করার ফলে তারা বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে।
সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুশ্রম বন্ধে শুধু আইন করলেই হবে না। দরকার পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি, এবং উপকূলীয় অঞ্চলে সহজপ্রাপ্য শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
পর্যাপ্ত স্কুল, নিরাপদ যাতায়াত এবং দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা ছাড়া এই বাস্তবতা বদলানো কঠিন। অন্যথায় উপকূলের হাজারো শিশুর শৈশব হারানোর এই চক্র অব্যাহত থাকবে।









