ভারতের ‘বৃক্ষমাতা’ তুলসী গৌড়া, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের অনন্য নজির
- আপডেট সময় : ১২:৫২:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬ ৭৭ বার পড়া হয়েছে
শেষ বিদায়, কিন্তু অমর উত্তরাধিকার, তিনি এক সবুজ বিপ্লবের নীরব স্থপতি
ভারতের ‘বৃক্ষমাতা’ তুলসী গৌড়া একটি নাম, যা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কর্ণাটকের হালাক্কি আদিবাসী সম্প্রদায়ের এই নারী শুধু গাছ লাগাননি, তিনি একাই গড়ে তুলেছেন এক সবুজ দর্শন, যা আজ বিশ্বজুড়ে পরিবেশপ্রেমীদের অনুপ্রেরণা জোগায়।
শিকড়ের গল্প: দারিদ্র্য থেকে দৃঢ়তা
কর্ণাটকের প্রত্যন্ত গ্রাম হোনাল্লিতে জন্ম নেওয়া তুলসী গৌড়া খুব ছোট বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। মাত্র দুই বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর তাঁর পরিবার চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর জীবনে কখনোই আসেনি, কিন্তু প্রকৃতিই হয়ে ওঠে তাঁর বিদ্যালয়, আর বনভূমি তাঁর শ্রেণিকক্ষ।
মায়ের সঙ্গে নার্সারিতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতে করতেই তিনি গাছের সঙ্গে এক আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বীজ বপন, চারার পরিচর্যা, মাটির গুণাগুণ বোঝা-এসবই তিনি শিখেছেন অভিজ্ঞতা আর পর্যবেক্ষণ থেকে। ধীরে ধীরে এই সাধারণ শ্রমিকই হয়ে ওঠেন এক অসাধারণ জ্ঞানভাণ্ডার।

বনই তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়
যেখানে অনেকেই বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করেন, সেখানে তুলসী গৌড়া প্রকৃতির কাছ থেকেই শিখেছেন সবকিছু। শত শত প্রজাতির গাছ তিনি শুধু দেখে নয়, স্পর্শ করেই শনাক্ত করতে পারতেন। কোন গাছের বীজ কবে সংগ্রহ করতে হবে, কোন মাটিতে কোন গাছ ভালো জন্মায়, এসব বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ছিল বিস্ময়কর।
এই অনন্য দক্ষতার জন্যই তাঁকে বলা হয় ‘অরণ্যের বিশ্বকোষ’। এমনকি বন বিভাগের প্রশিক্ষিত কর্মকর্তারাও অনেক সময় তাঁর পরামর্শ নিতেন। তাঁর জ্ঞানের পরিধি প্রমাণ করে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থেকেও জ্ঞানের গভীরতা অর্জন সম্ভব।
সবুজ বিপ্লবের একক সৈনিক
তুলসী গৌড়ার কর্মজীবন শুধু একটি চাকরি ছিল না, এটি ছিল তাঁর জীবনদর্শন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে ৩০,০০০-এরও বেশি গাছ রোপণ করেছেন এবং প্রায় ১ লাখের মতো চারাগাছের পরিচর্যা করেছেন। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা বনভূমি আজ অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল।
কর্ণাটক বন বিভাগ-এর সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করে তিনি বনায়ন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর অবদানে শক্তিশালী হয়েছে কমিউনিটি রিজার্ভ, টাইগার রিজার্ভ ও অসংখ্য বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য।
তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, প্রকৃতিকে শুধু সংরক্ষণ নয়, পুনরুজ্জীবিত করা। তিনি এমন অনেক অনুর্বর জমিকে সবুজে পরিণত করেছেন, যা একসময় সম্পূর্ণ প্রাণহীন ছিল।

ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের এক জীবন্ত ভাণ্ডার
তুলসী গৌড়ার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর আদিবাসী ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এই জ্ঞান তিনি শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, তিনি তা ছড়িয়ে দিয়েছেন অন্যদের মাঝেও।
কোন উদ্ভিদের কী ঔষধি গুণ, কীভাবে টেকসইভাবে বনসম্পদ ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা যায়—এসব বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ছিল অমূল্য। আধুনিক পরিবেশবিদ্যার সঙ্গে এই আদিবাসী জ্ঞানের মেলবন্ধনই তাঁকে করেছে অনন্য।
স্বীকৃতি, কিন্তু বিনম্রতা অটুট
তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ভারত সরকার ২০২১ সালে তাঁকে প্রদান করে পদ্মশ্রী। এর আগে তিনি পেয়েছেন ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী বৃক্ষমিত্র পুরস্কার এবং কর্ণাটক রাজ্যোৎসব সম্মাননাও।
তবে এত বড় সম্মান পাওয়ার পরও তাঁর বিনম্রতা ছিল অবিচল। তিনি নিজেই বলেছেন, পুরস্কারের চেয়ে বন আর গাছপালাই তাঁর কাছে বেশি মূল্যবান।

প্রকৃতি রক্ষায় সংগ্রামী এক জীবন
গাছ লাগানোর পাশাপাশি তুলসী গৌড়া কাজ করেছেন বন রক্ষায়ও। চোরাশিকার প্রতিরোধ, বন আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে তিনি ছিলেন এক নিরলস যোদ্ধা। তাঁর কাছে বন শুধু জীবিকা নয়, এটি ছিল এক পবিত্র দায়িত্ব।
শেষ বিদায়, কিন্তু অমর উত্তরাধিকার
২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর ৮৬ বছর বয়সে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর রোপণ করা প্রতিটি গাছ আজও জীবন্ত স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর হাতে গড়া বনভূমি, তাঁর শেখানো জ্ঞান-সবকিছুই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য সম্পদ।
তুলসী গৌড়া আমাদের মনে করিয়ে দেন, একজন মানুষের দৃঢ়তা, ভালোবাসা আর নিষ্ঠা কতটা শক্তিশালী হতে পারে। তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃতিকে ভালোবাসলে প্রকৃতিও তার প্রতিদান দেয়।
তিনি শুধু একজন পরিবেশবিদ নন, তিনি এক সবুজ বিপ্লবের নীরব স্থপতি।



















