উজানের ঢলে ভেসে গেছে কৃষকের সোনালি স্বপ্ন: সুনামগঞ্জে ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি
- আপডেট সময় : ০১:২৫:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ মে ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
গত ৮ বছরে ৮৭৩ কোটিরও বেশি টাকা বাঁধ সংস্কার ও মেরামতে খরচ হয়েছে। কিন্তু অপরিকল্পিত নির্মাণ ও অনিয়মের কারণে এসব বাঁধ দুর্বল হয়ে কোথাও কোথাও ইতোমধ্যে ভেঙে গেছে
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী হাওরে পাকা ধানের প্রায় ৯ হাজার ৪৯ হেক্টর জমিতলিয়ে গেছে। এসব জমিতে ৫০ হাজার টনের বেশি ধান উৎপাদনের আশা ছিল। ফসল নষ্ট হয়ে গিয়ে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকা
উজানের ঢল, টানা বৃষ্টি আর ভেঙে পড়া ফসলরক্ষা বাঁধ-সব মিলিয়ে সুনামগঞ্জের হাওরজুড়ে এবার বৈশাখ নিয়ে এসেছে এক গভীর বেদনা। যে সময়টাতে সোনালি ধানের ঢেউয়ে ভরে ওঠার কথা ছিল হাওর, সেই সময়েই এখন চারদিকে শুধু পানি আর নিস্তব্ধতা। কৃষকের মুখে নেই হাসি, আছে অনিশ্চয়তা আর হাহাকার।
জেলার বিভিন্ন হাওরে প্রায় ৯ হাজার ৪৯ হেক্টর জমির পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, এসব জমি থেকে ৫০ হাজার টনেরও বেশি ধান উৎপাদনের আশা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা বৃষ্টির কারণে সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা, যা শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, হাজারো কৃষক পরিবারের জীবিকার গল্প।
শনির হাওরের কৃষক রুবেল মিয়া কোমরসমান পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছিলেন। তাঁর চোখেমুখে ক্লান্তি আর হতাশার ছাপ স্পষ্ট। তিনি বলেন, ধান না কাটলে পানিতে পচে যাবে, আবার কেটে আনলেও শুকানোর জায়গা নেই। দুই দিকেই ক্ষতি।
তাঁর মতো অসংখ্য কৃষক এখন একই সংকটে পড়েছেন। কেউ শ্রমিক পাচ্ছেন না, আবার কেউ বেশি মজুরি দিয়েও কাজ করাতে পারছেন না। হারভেস্টার মেশিন পানিতে কাজ করতে পারছে না, আর যেখানে পারছে, সেখানে ভাড়া বেড়ে গেছে কয়েকগুণ।

বৃষ্টি না থামায় নতুন করে আরেক বিপদ দেখা দিয়েছে। কাটা ধান শুকানোর সুযোগ না পেয়ে অনেক জায়গায় চারা গজিয়ে গেছে, কোথাও কোথাও পচন ধরেছে। খলায় জমিয়ে রাখা ধান চোখের সামনে নষ্ট হতে দেখেও কিছু করার নেই কৃষকদের। এমন পরিস্থিতিতে তারা যেন এক ধরনের অসহায় বন্দিত্বে আটকা পড়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হলেও সেগুলো টেকসই হচ্ছে না। গত আট বছরে ৮৭৩ কোটিরও বেশি টাকা খরচ হয়েছে, কিন্তু অপরিকল্পিত কাজ ও অনিয়মের কারণে অনেক বাঁধই দুর্বল হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও ইতোমধ্যে ভেঙেও গেছে। ফলে উজানের ঢল এলেই হাওরে পানি ঢুকে পড়ে, ডুবিয়ে দেয় কৃষকের সারা বছরের পরিশ্রম।
হাওরপাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ। নদী খনন বা পানি ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধান না করে প্রতি বছর অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না, বরং প্রতি বছর নতুন করে ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে কৃষকদের।
এদিকে ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সুনামগঞ্জের নদীগুলোর পানি বেড়ে গেছে। জেলার ছোট-বড় প্রায় ৯৭টি নদী এখন টইটম্বুর। সুরমা নদীর পানি ক্রমাগত বাড়ছে, ফলে হাওরের পানি নদীতে নামার সুযোগও কমে গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতির উন্নতি হতে আরও অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে, যদি বৃষ্টি কমে।
এই দীর্ঘ অপেক্ষা কৃষকদের জন্য আরও দুঃসহ হয়ে উঠছে। কারণ প্রতিটি দিন মানে আরও ক্ষতি, আরও অনিশ্চয়তা। যে কৃষকরা ঋণ করে জমিতে বীজ বুনেছিলেন, তারা এখন দিশেহারা। পরিবার চালানো, ঋণ শোধ করা, সবকিছুই এখন প্রশ্নের মুখে।
হাওরের বুকজুড়ে এখন আর সোনালি ধানের হাসি নেই, আছে ডুবে থাকা স্বপ্নের দীর্ঘশ্বাস। কৃষকের চোখে ভাসছে ভবিষ্যতের ভয়। দ্রুত সরকারি সহায়তা না এলে এই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এই সংকট শুধু একটি মৌসুমের নয়, এটি একটি অঞ্চলের জীবিকা, অর্থনীতি ও মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গভীর মানবিক বিপর্যয়।









