৫৫ প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৫০ হাজার কোটি টাকা
- আপডেট সময় : ০৯:৩২:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৩ ২৭৮ বার পড়া হয়েছে
চট্টগ্রামের শীর্ষ ঋণখেলাপি, ব্যাংকপাড়ায় উদ্বেগ
এক দশকে চট্টগ্রামের ২২ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ৩৩ কর্ণধার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে দেশ ত্যাগ করেছেন। এসব ব্যবসায়ীর মধ্যে ১১ জন বসবাস করছেন কানাডায়। ছয়জন লন্ডনে, চারজন যুক্তরাষ্ট্রে, তিনজন মালয়েশিয়ায়, তিনজন সংযুক্ত আরব আমিরাতে, দুজন তুরস্কে এবং একজন করে অস্ট্রেলিয়া, মন্টেনিগ্রো ও সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছে
অনলাইন ডেস্ক
চট্টগ্রামের ৫৫ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। ঋণের ২০ হাজার কোটি টাকা হাফিস করে দেশ ছেড়েছেন অন্তত ৩৩ ব্যবসায়ী। এতে উদ্বেগ বেড়েছে ব্যাংকপাড়ায়।
ব্যাংক সূত্রের খবর, ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে পরিচালক-উদ্যোক্তাদের সম্পর্ক থাকায় নিয়মনীতি অনুসরণের তোয়াক্কা না করে ব্যাংকগুলোকে ঋণ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এভাবে ঋণ নিয়ে অনেকেই আত্মসাৎ করে ব্যাংকগুলোকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। অর্থ আদায়ে ঋণদাতা ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অসহায় ব্যাংকাররা।
ব্যাংক সূত্রের খবর, চট্টগ্রামের ১৫ ব্যবসায়ী গ্রুপের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। যার মধ্যে সীতাকুণ্ডের শাহ আমানত আয়রন মার্টের গিয়াস উদ্দিন কুসুমের খেলাপি ঋণ ৬০০ কোটি টাকা। লিজেন্ড হোল্ডিংয়ের এস এম আবদুল হাইয়ের খেলাপি ঋণ ৫২৫ কোটি টাকা। বাদশা গ্রুপের মোহাম্মদ ইসা বাদশার কাছে আট ব্যাংকের পাওনা ৫০০ কোটি টাকা।
ন্যাম করপোরেশনের কর্ণধার আবদুল আলিম চৌধুরীর কাছে সাত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা ৫০০ কোটি টাকা। নাজমুল আবেদীনের কাছে চার ব্যাংকের পাওনা ৪০০ কোটি টাকা। আলম অ্যান্ড কোংয়ের শাহ আলমের কাছে আট ব্যাংকের পাওনা ৩০০ কোটি টাকা। সিঅ্যান্ডএ গ্রুপের মোহাম্মদ মোর্শেদের কাছে ব্যাংকের পাওনা ২৮০ কোটি টাকা।
এমএএফ ইন্টারন্যাশনালের মালিক মাকসুদুল আলমের কাছে চার ব্যাংকের পাওনা ২০০ কোটি টাকা। জাহিদ এন্টারপ্রাইজের পরিচালক জাহিদ হোসেন মিয়ার কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা ১৮৬ কোটি টাকা। বাগদাদ গ্রুপের মালিক ফেরদৌস খান আলমগীরের কাছে পাঁচ ব্যাংকের পাওনা ১৫০ কোটি টাকা।
চট্টগ্রামের ইফফাত ইন্টারন্যাশনালের মালিক দিদারুল আলমের কাছে দুই ব্যাংকের পাওনা প্রায় ১৫০ কোটি। সার্ক ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী আনোয়ারুল হক চৌধুরীর কাছে দুটি ব্যাংকের ঋণ ৭১ কোটি টাকা। এনএম ট্রেডিং করপোরেশনের মালিক এবং আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এস এম শামীম ইকবাল তিন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন ৭০ কোটি টাকা। খাতুনগঞ্জের এসএল এন্টারপ্রাইজের মালিক লিয়াকত আলী চৌধুরী বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া ২০ কোটি টাকা পরিশোধ করছেন না।
খাতুনগঞ্জের ইয়াসির এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ মোজাহের হোসেন বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন। কিন্তু পরিশোধ করছেন না। ম্যাক ইন্টারন্যাশনালের মালিকদের কাছে ১২টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা ৮০০ কোটি টাকার বেশি। ৩০ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে হাবিব গ্রুপের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার কোটি টাকা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স (এনসিসি) ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট আলী তারেক পারভেজ সংবাদমাধ্যমকে জানান, ব্যাংক পরিচালকরা বেনামে ঋণ নিয়ে যাচ্ছেন। এতে কোনো কোনো ব্যবসায়ী লোকসানে পড়েছেন, আবার কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংক ঋণ শোধ না করে দেশ ত্যাগ করেছেন। এতজন ব্যবসায়ী দেশ ত্যাগ করায় এসব ঋণ উদ্ধারে ব্যাংক কর্মকর্তাদের এখন প্রতিদিন আদালতে দৌড়াতে হচ্ছে। ব্যাংকের টাকা জনগণের আমানত। তাই এ টাকা উদ্ধারে খেলাপিদের দেশে ফেরত আনতে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ নিতে হবে মন্তব্য জ্যেষ্ঠ এই ব্যাংকারে।

অপর এক বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা মতে, ব্যাংকগুলো এসব ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়মনীতি অনুসরণ করেনি। এতে কিছু ব্যবসায়ী লোকসানের মধ্যে পড়লেও অন্যরা ইচ্ছা করে অর্থ আত্মসাৎ করে ব্যাংককে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন অনেকে।
গত এক দশকে চট্টগ্রামের ২২ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ৩৩ কর্ণধার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে দেশ ত্যাগ করেছেন। এসব ব্যবসায়ীর মধ্যে ১১ জন বসবাস করছেন কানাডায়। ছয়জন লন্ডনে, চারজন যুক্তরাষ্ট্রে, তিনজন মালয়েশিয়ায়, তিনজন সংযুক্ত আরব আমিরাতে, দুজন তুরস্কে এবং একজন করে অস্ট্রেলিয়া, মন্টেনিগ্রো ও সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন।
বড় সংখ্যক ঋণখেলাপির দেশ ত্যাগ করে বিদেশে বসবাসের ঘটনায় সংকটের মধ্যে পড়েছে চট্টগ্রামের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এদের সবার বিরুদ্ধে আর্থিক ও চেক প্রত্যাখ্যান আইনে একাধিক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানাও রয়েছে। দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা জারির আগেই ১৩ এবং নিষেধাজ্ঞার পর আরও ১৩ জন দেশ ত্যাগ করেছেন। ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করেই সম্প্রতি দেশত্যাগ করেছেন মাহিন এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার আশিকুর রহমান লস্কর। ১০ ব্যাংক থেকে তিনি ঋণ নিয়েছেন ২ হাজার কোটি টাকা।




















