ঢাকা ১২:০২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাসহ বেনাপোলে এক বাংলাদেশি পাসপোর্ট যাত্রী আটক বস্তিবাসীদের উন্নত শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার আশ্বাস তারেক রহমানের চাপ তৈরি করে ভারতে খেলাতে বাধ্য করা যাবে না চানখাঁরপুল মামলার রায় ২৬ জানুয়ারি: মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার অপেক্ষায় দেশ ইরানে হামলা নিয়ে আবারও কঠোর হুঁশিয়ারি নেতানিয়াহুর আমিরাতের প্রেসিডেন্টকে ঐতিহ্যবাহী শুভেচ্ছায় স্বাগত জানালেন মোদি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় শহীদ জিয়াউর রহমানের জন্মদিন উদ্যাপন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ আগুন, পুড়ে ছাই ৪০০ ঘর, শত শত পরিবার আশ্রয়হীন আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি পবিত্র শবে বরাত শার্শায় র‌্যাবের অভিযানে ২৯৭০ পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারি আটক

national bird : বিপন্ন জাতীয় পাখি

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:০৩:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ অগাস্ট ২০২২ ৯২৪ বার পড়া হয়েছে
ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ড.বিরাজলক্ষী ঘোষ

 

“ময়ূর কহিল কাঁদি গেীরীর চরণে,
কৈলাস-ভবনে;—
“অবধান কর দেবি,
আমি ভৃত্য নিত্য সেবি
প্রিয়োত্তম সুতে তব এ পৃষ্ঠ-আসনে।
রথী যথা দ্রুত রথে,
চলেন পবন-পথে
দাসের এ পিঠে চড়ি সেনানী সুমতি;
তবু, মা গো, আমি দুখী অতি!”

 

কবিতাটির শিরোনাম “ময়ূর ও গৌরী”লিখেছিলেন কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত।এত সুন্দর রূপেও ময়ূরের বড়ই ব্যথা ।কবি যেন সেটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে উপলব্ধি করেছিলেন।

ময়ূর (Peafowl) Phasianidae (ফ্যাজিয়ানিডি) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত অত্যন্ত সুন্দর পাখি। এশিয়ায় Pavo (পাভো) গণে মোট দুই প্রজাতির এবং আফ্রিকায় Afropavo (আফ্রোপাভো) গণে একটি ময়ূরের প্রজাতি দেখা যায়। এশিয়ার প্রজাতি দু’টি হল নীল ময়ূর আর সবুজ ময়ূর। আফ্রিকার প্রজাতিটির নাম কঙ্গো ময়ূর (Afropavo congensis)। নীল ময়ূর ভারতের জাতীয় পাখি। সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে এদের দেখা যায়। পূর্বে বাংলাদেশে এরা বিস্তৃত থাকলেও এখন সম্ভবত বিলুপ্তির পথে। সবুজ ময়ূর মায়ানমার থেকে জাভা পর্যন্ত বিস্তৃত। আশঙ্কাজনক হারে বিশ্বব্যাপী কমে যাচ্ছে বলে এরা বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত। ঐতিহাসিকভাবে প্রজাতিটি মায়ানমারের জাতীয় প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে।চিন এবং জাপানেও এই পাখিটির গুরুত্ব অপরিসীম।

ময়ূরের সব প্রজাতি সাধারণত বনে বাস করে এবং মাটিতে বাসা বাঁধে। তবে মাঝে মাঝে লোকালয়েও দেখা যায়। বিশেষ করে সংরক্ষিত এলাকায় এরা মানুষের খুব কাছে চলে আসে। এরা সর্বভূক। চারা গাছের অংশ, কীটপতঙ্গ, বীজের খোসা, ফুলের পাপড়ি এবং ছোট ছোট সন্ধিপদ প্রাণী খায়। এরা ডিম পাড়ে ও ডিম ফুটে বাচ্চা হয়। ছোট বাচ্চাগুলো মুরগির বাচ্চার মতই মায়ের সাথে ঘুরে ঘুরে খাবার খায়। বিপদ দেখলেই মায়ের ডানার নিচে এসে লুকায়। ছোট বাচ্চারা মুরগির বাচ্চার মতই মায়ের পালকের আড়ালে, আবার কখনোবা পিঠের উপর লাফিয়ে ওঠে।
স্ত্রী ময়ূরকে আকৃষ্ট করার জন্য পুরুষ ময়ূর পেখম তোলে। এ কারণেই এরা অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

1963 সালে ভারত ময়ূরকে তার জাতীয় জাতীয় পাখি হিসাবে ঘোষণা করে। তবে ভারতীয় সংস্কৃতিতে ময়ূরের অবস্থান ঠিক কী?প্রাচীন কাল থেকে এটি হিন্দু ধর্মকে মহিমান্বিত করেছে, শিল্পীদের আকর্ষণ এবং স্থানীয়দের এবং দর্শকদের মনমুগ্ধকর রঙের আকর্ষণীয় ধারণার দ্বারা ধারণ করেছে।

ময়ূর, অনেকের কাছে অনুগ্রহ, আভিজাত্য এবং সৌন্দর্যের প্রতীক, প্রিয়,
কিংবদন্তি এবং ধর্মীয় বর্ণনার সাথে এর সমৃদ্ধ জড়িত রয়েছে। এই সাংস্কৃতিক ইতিহাসই ময়ূরকে ভারতের জাতীয় পাখি হিসাবে গড়ে তুলেছে।এই পাখিটিকে ঘিরে প্রচুর মিথ রয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে।

কিন্তু রাষ্ট্রীয় পাখি নিয়ে কোনোরকম ব্যবসা আমাদের দেশের দেশের আইনে নিষিদ্ধ হলেও বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে হাজার হাজার ময়ূরের পালক!এবং মানুষ সেগুলি খুশি হয়ে কিনছেন।

বিস্ময়করভাবে, সরকারের কাছে দেশে ময়ূরের সংখ্যা সংক্রান্ত কোনো তথ্যই নেই। কিন্তু বিশ্ববিখ্যাত ময়ূরপুচ্ছের পালকের বাড়তে থাকা কদর এবং দামের ফলে বেড়ে গিয়েছে চোরা চালানের হারও, কারণ বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক নিয়মে বছরের একটি সময় ময়ূর তার পুচ্ছ ত্যাগ করে।কিন্তু চাহিদা অত্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় পুচ্ছ থেকে খসে পড়া পালকে আর কুলোচ্ছে না। কাজেই দেশে চোরা শিকারি ও অসাধু ব্যবসায়ী দের ক্রিয়াকলাপের জন্য ময়ূরের সংখ্যা যে দ্রুত কমছে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

ভারতে ময়ূরের সংখ্যা নিয়ে আজ পর্যন্ত একটিই সমীক্ষা চালানো হয়েছে, তাও সেই ১৯৯১ সালে, ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচারের উদ্যোগে। জানা যায়, যে স্বাধীনতার সময় যত সংখ্যক ময়ূর দেশে ছিল, ১৯৯১ সালে সেই সংখ্যা এসে দাঁড়ায় তার অর্ধেকে। সরকারি আধিকারিক এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্মীদের মতে, বিচরণক্ষেত্র কমে যাওয়ায় এবং চোরা শিকারিদের কল্যাণে সেই সংখ্যা আরও হ্রাস পেয়েছে।

ময়ূরের পালকের দ্রুত বাড়তে থাকা চাহিদায় শঙ্কিত হয়ে ভারত সরকারের পরিবেশ মন্ত্রক ২০১৩ সালে ঘোষণা করে যে ময়ূরের পালকের কেনাবেচা ও পাচার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।কিন্তু এই বিষয়টিকে কার্যত বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে শত শত ময়ূরের পালক।কেউ কি ভেবেছেন কোথা থেকে আসে এই পালক গুলি?

জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি খবর অনুযায়ী উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জঙ্গল থেকে ময়ূরের ডিম কুড়িয়ে এনে ডিম প্রতি ৫০০ টাকা হিসেবে বিক্রি করে একটি চক্র। তাদের থেকে এই যৎসামান্য দরে ডিম কিনে মুরগিকে দিয়ে তা দেওয়ানোর পর ময়ূরের ছানা ফুটিয়ে বিভিন্ন এলাকায় চড়া দামে (সাত থেকে দশ হাজার টাকা) বিক্রি হচ্ছে, এমন খবর আসে টাস্ক ফোর্সের প্রধান সঞ্জয় দত্তর কাছে। গোপন সূত্রে এই খবর আসার পর নড়েচড়ে বসে টাস্ক ফোর্স। এবং গতকাল সংশ্লিষ্ট এলাকায় চালায় অভিযান।সঞ্জয়বাবু জানান, “ শিলিগুড়ি কর্পোরেশনের ৩৬ নং ওয়ার্ডের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে দুটি ময়ূর উদ্ধার করি। বাড়ির লোক আমাদের জানান, তাঁরা বাজার থেকে ডিম কিনে মুরগী দিয়ে ফুটিয়েছেন।

তিনি বাড়িতে না থাকায় আমরা তাঁকে সাত দিনের নোটিশ দিয়েছি। সাত দিনের মধ্যে দেখা না করলে আমরা আইনানুগ ব্যাবস্থা নেব।”অভিযান চালাচ্ছে এসটিএফ।তিনি আরও জানান, সীমিত বনকর্মী নিয়ে জঙ্গলের বিস্তীর্ণ এলাকায় সবসময় নজরদারি চালানো যেতে পারে না। এর সুযোগ নেয় এক ধরনের অসাধু ব্যবসায়ী। এরা অত্যন্ত কম দামে এই ডিমগুলি কেনে, এর পরে মুরগী দিয়ে তা দিইয়ে বাচ্চা ফুটিয়ে চড়া দামে বিক্রি করে। এটা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের অধীনে অপরাধ।”

কিন্তু তাহলে সরকার এত জেনেও কেন চুপ? কেন নিষিদ্ধ করা হচ্ছেনা বিলুপ্তির পথে যেতে থাকা জাতীয় পাখি ময়ূর এর পালক নিয়ে এই কদর্য ব্যবসা?প্রাকৃতিক ভাবে বিপন্ন এই প্রাণীটি যদি সত্যি ভারতীয় সভ্যতার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মিথ হয় তবে সকল দেশবাসীর উচিৎ এই পাখিটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এর পালক বিক্রিকে সমর্থন না করা।আসুন সকলে মিলে আমাদের জাতীয় পাখি ময়ূর নিয়ে এই জঘন্য ব্যবসার বিরুদ্ধে রুখে দাড়াই।

লেখক : ড. বিরাজলক্ষী ঘোষ,  শিক্ষাবিদ, রবীন্দ্র গবেষক, লেখক, পরিবেশবিদ, সংগঠক এবং সম্পাদক

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

national bird : বিপন্ন জাতীয় পাখি

আপডেট সময় : ০৯:০৩:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ অগাস্ট ২০২২

ড.বিরাজলক্ষী ঘোষ

 

“ময়ূর কহিল কাঁদি গেীরীর চরণে,
কৈলাস-ভবনে;—
“অবধান কর দেবি,
আমি ভৃত্য নিত্য সেবি
প্রিয়োত্তম সুতে তব এ পৃষ্ঠ-আসনে।
রথী যথা দ্রুত রথে,
চলেন পবন-পথে
দাসের এ পিঠে চড়ি সেনানী সুমতি;
তবু, মা গো, আমি দুখী অতি!”

 

কবিতাটির শিরোনাম “ময়ূর ও গৌরী”লিখেছিলেন কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত।এত সুন্দর রূপেও ময়ূরের বড়ই ব্যথা ।কবি যেন সেটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে উপলব্ধি করেছিলেন।

ময়ূর (Peafowl) Phasianidae (ফ্যাজিয়ানিডি) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত অত্যন্ত সুন্দর পাখি। এশিয়ায় Pavo (পাভো) গণে মোট দুই প্রজাতির এবং আফ্রিকায় Afropavo (আফ্রোপাভো) গণে একটি ময়ূরের প্রজাতি দেখা যায়। এশিয়ার প্রজাতি দু’টি হল নীল ময়ূর আর সবুজ ময়ূর। আফ্রিকার প্রজাতিটির নাম কঙ্গো ময়ূর (Afropavo congensis)। নীল ময়ূর ভারতের জাতীয় পাখি। সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে এদের দেখা যায়। পূর্বে বাংলাদেশে এরা বিস্তৃত থাকলেও এখন সম্ভবত বিলুপ্তির পথে। সবুজ ময়ূর মায়ানমার থেকে জাভা পর্যন্ত বিস্তৃত। আশঙ্কাজনক হারে বিশ্বব্যাপী কমে যাচ্ছে বলে এরা বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত। ঐতিহাসিকভাবে প্রজাতিটি মায়ানমারের জাতীয় প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে।চিন এবং জাপানেও এই পাখিটির গুরুত্ব অপরিসীম।

ময়ূরের সব প্রজাতি সাধারণত বনে বাস করে এবং মাটিতে বাসা বাঁধে। তবে মাঝে মাঝে লোকালয়েও দেখা যায়। বিশেষ করে সংরক্ষিত এলাকায় এরা মানুষের খুব কাছে চলে আসে। এরা সর্বভূক। চারা গাছের অংশ, কীটপতঙ্গ, বীজের খোসা, ফুলের পাপড়ি এবং ছোট ছোট সন্ধিপদ প্রাণী খায়। এরা ডিম পাড়ে ও ডিম ফুটে বাচ্চা হয়। ছোট বাচ্চাগুলো মুরগির বাচ্চার মতই মায়ের সাথে ঘুরে ঘুরে খাবার খায়। বিপদ দেখলেই মায়ের ডানার নিচে এসে লুকায়। ছোট বাচ্চারা মুরগির বাচ্চার মতই মায়ের পালকের আড়ালে, আবার কখনোবা পিঠের উপর লাফিয়ে ওঠে।
স্ত্রী ময়ূরকে আকৃষ্ট করার জন্য পুরুষ ময়ূর পেখম তোলে। এ কারণেই এরা অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

1963 সালে ভারত ময়ূরকে তার জাতীয় জাতীয় পাখি হিসাবে ঘোষণা করে। তবে ভারতীয় সংস্কৃতিতে ময়ূরের অবস্থান ঠিক কী?প্রাচীন কাল থেকে এটি হিন্দু ধর্মকে মহিমান্বিত করেছে, শিল্পীদের আকর্ষণ এবং স্থানীয়দের এবং দর্শকদের মনমুগ্ধকর রঙের আকর্ষণীয় ধারণার দ্বারা ধারণ করেছে।

ময়ূর, অনেকের কাছে অনুগ্রহ, আভিজাত্য এবং সৌন্দর্যের প্রতীক, প্রিয়,
কিংবদন্তি এবং ধর্মীয় বর্ণনার সাথে এর সমৃদ্ধ জড়িত রয়েছে। এই সাংস্কৃতিক ইতিহাসই ময়ূরকে ভারতের জাতীয় পাখি হিসাবে গড়ে তুলেছে।এই পাখিটিকে ঘিরে প্রচুর মিথ রয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে।

কিন্তু রাষ্ট্রীয় পাখি নিয়ে কোনোরকম ব্যবসা আমাদের দেশের দেশের আইনে নিষিদ্ধ হলেও বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে হাজার হাজার ময়ূরের পালক!এবং মানুষ সেগুলি খুশি হয়ে কিনছেন।

বিস্ময়করভাবে, সরকারের কাছে দেশে ময়ূরের সংখ্যা সংক্রান্ত কোনো তথ্যই নেই। কিন্তু বিশ্ববিখ্যাত ময়ূরপুচ্ছের পালকের বাড়তে থাকা কদর এবং দামের ফলে বেড়ে গিয়েছে চোরা চালানের হারও, কারণ বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক নিয়মে বছরের একটি সময় ময়ূর তার পুচ্ছ ত্যাগ করে।কিন্তু চাহিদা অত্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় পুচ্ছ থেকে খসে পড়া পালকে আর কুলোচ্ছে না। কাজেই দেশে চোরা শিকারি ও অসাধু ব্যবসায়ী দের ক্রিয়াকলাপের জন্য ময়ূরের সংখ্যা যে দ্রুত কমছে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

ভারতে ময়ূরের সংখ্যা নিয়ে আজ পর্যন্ত একটিই সমীক্ষা চালানো হয়েছে, তাও সেই ১৯৯১ সালে, ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচারের উদ্যোগে। জানা যায়, যে স্বাধীনতার সময় যত সংখ্যক ময়ূর দেশে ছিল, ১৯৯১ সালে সেই সংখ্যা এসে দাঁড়ায় তার অর্ধেকে। সরকারি আধিকারিক এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্মীদের মতে, বিচরণক্ষেত্র কমে যাওয়ায় এবং চোরা শিকারিদের কল্যাণে সেই সংখ্যা আরও হ্রাস পেয়েছে।

ময়ূরের পালকের দ্রুত বাড়তে থাকা চাহিদায় শঙ্কিত হয়ে ভারত সরকারের পরিবেশ মন্ত্রক ২০১৩ সালে ঘোষণা করে যে ময়ূরের পালকের কেনাবেচা ও পাচার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।কিন্তু এই বিষয়টিকে কার্যত বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে শত শত ময়ূরের পালক।কেউ কি ভেবেছেন কোথা থেকে আসে এই পালক গুলি?

জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি খবর অনুযায়ী উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জঙ্গল থেকে ময়ূরের ডিম কুড়িয়ে এনে ডিম প্রতি ৫০০ টাকা হিসেবে বিক্রি করে একটি চক্র। তাদের থেকে এই যৎসামান্য দরে ডিম কিনে মুরগিকে দিয়ে তা দেওয়ানোর পর ময়ূরের ছানা ফুটিয়ে বিভিন্ন এলাকায় চড়া দামে (সাত থেকে দশ হাজার টাকা) বিক্রি হচ্ছে, এমন খবর আসে টাস্ক ফোর্সের প্রধান সঞ্জয় দত্তর কাছে। গোপন সূত্রে এই খবর আসার পর নড়েচড়ে বসে টাস্ক ফোর্স। এবং গতকাল সংশ্লিষ্ট এলাকায় চালায় অভিযান।সঞ্জয়বাবু জানান, “ শিলিগুড়ি কর্পোরেশনের ৩৬ নং ওয়ার্ডের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে দুটি ময়ূর উদ্ধার করি। বাড়ির লোক আমাদের জানান, তাঁরা বাজার থেকে ডিম কিনে মুরগী দিয়ে ফুটিয়েছেন।

তিনি বাড়িতে না থাকায় আমরা তাঁকে সাত দিনের নোটিশ দিয়েছি। সাত দিনের মধ্যে দেখা না করলে আমরা আইনানুগ ব্যাবস্থা নেব।”অভিযান চালাচ্ছে এসটিএফ।তিনি আরও জানান, সীমিত বনকর্মী নিয়ে জঙ্গলের বিস্তীর্ণ এলাকায় সবসময় নজরদারি চালানো যেতে পারে না। এর সুযোগ নেয় এক ধরনের অসাধু ব্যবসায়ী। এরা অত্যন্ত কম দামে এই ডিমগুলি কেনে, এর পরে মুরগী দিয়ে তা দিইয়ে বাচ্চা ফুটিয়ে চড়া দামে বিক্রি করে। এটা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের অধীনে অপরাধ।”

কিন্তু তাহলে সরকার এত জেনেও কেন চুপ? কেন নিষিদ্ধ করা হচ্ছেনা বিলুপ্তির পথে যেতে থাকা জাতীয় পাখি ময়ূর এর পালক নিয়ে এই কদর্য ব্যবসা?প্রাকৃতিক ভাবে বিপন্ন এই প্রাণীটি যদি সত্যি ভারতীয় সভ্যতার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মিথ হয় তবে সকল দেশবাসীর উচিৎ এই পাখিটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এর পালক বিক্রিকে সমর্থন না করা।আসুন সকলে মিলে আমাদের জাতীয় পাখি ময়ূর নিয়ে এই জঘন্য ব্যবসার বিরুদ্ধে রুখে দাড়াই।

লেখক : ড. বিরাজলক্ষী ঘোষ,  শিক্ষাবিদ, রবীন্দ্র গবেষক, লেখক, পরিবেশবিদ, সংগঠক এবং সম্পাদক