ঢাকা ০১:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডে পাঁচ বছরে ৩৪ প্রাণহানি 

আমিনুল হক ভূইয়া
  • আপডেট সময় : ১২:৪৭:১৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে

সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডে পাঁচ বছরে ৩৪ প্রাণহানি 

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের উপকূলজুড়ে গড়ে ওঠা জাহাজভাঙা শিল্প দেশের ইস্পাত ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি এ শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও নিরাপত্তাঝুঁকি এখনো বড় উদ্বেগের কারণ।

বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড, বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসরোধ, ভারী লোহার পাত পড়ে যাওয়া, উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়া এবং ট্যাংকে আটকে পড়ার মতো ঘটনায় প্রায়ই শ্রমিক হতাহত হচ্ছেন।

সর্বশেষ শুক্রবার (১৪ আগস্ট ) সকালে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর ফেরদৌস শিপইয়ার্ডে বিস্ফোরণে অন্তত তিন শ্রমিক নিহত এবং আরও কয়েকজন দগ্ধ ও আহত হয়েছেন। ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, আহতদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। ঘটনাটি তদন্ত করে কারণ উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।

তবে সাম্প্রতিক এই দুর্ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে অন্তত ৩৪ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) ও অন্যান্য সংগঠনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২১ সালে ৯ জন, ২০২২ সালে ৭ জন, ২০২৩ সালে ৭ জন, ২০২৪ সালে ৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৪ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

বছরভিত্তিক প্রাণহানি

২০২১ সালে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে ৯ শ্রমিক নিহত হন। পরের দুই বছর ২০২২ ও ২০২৩ সালে প্রতিবছর ৭ জন করে প্রাণ হারান। ২০২৪ সালে বছরের শুরুতে দুর্ঘটনা তুলনামূলক কম থাকলেও সেপ্টেম্বরের এসএন কর্পোরেশনের ভয়াবহ বিস্ফোরণ পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় আনে। ওই ঘটনায় শেষ পর্যন্ত ছয় শ্রমিকের মৃত্যু হয় এবং আরও ছয়জন আহত হন।

২০২৫ সালে মৃত্যুর সংখ্যা কমে চারজনে দাঁড়ায়। কিন্তু প্রাণহানি কমলেও দুর্ঘটনার সংখ্যা কমেনি। বিলসের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বছর সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে ৪৯টি দুর্ঘটনা ঘটে এবং ৬২ শ্রমিক আহত হন। এর মধ্যে ৩১টি দুর্ঘটনাকে গুরুতর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গুরুতর দুর্ঘটনার মধ্যে অঙ্গহানি, হাড় ভাঙা, মাথা-চোখ-বুকে আঘাত, অগ্নিদগ্ধ হওয়া এবং স্থায়ী পঙ্গুত্বের মতো ঘটনা ছিল।

২০২৫ সালের মে মাসে জাহাজভাঙা শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তেলবাহী ট্যাংক পরিষ্কার করতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে এক শ্রমিকের মৃত্যু এবং আরও তিনজন অসুস্থ হওয়ার ঘটনাও ঘটে। এতে বোঝা যায়, ঝুঁকি শুধু জাহাজ কাটার স্থানে সীমাবদ্ধ নয়, জাহাজ থেকে পাওয়া তেল, বর্জ্য ও অন্যান্য বিপজ্জনক পদার্থ ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের নিরাপত্তা ঘাটতি রয়েছে।

২০২৪ সালের ভয়াবহ বিস্ফোরণ

গত পাঁচ বছরের দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বরের এসএন কর্পোরেশনের ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পুরোনো জাহাজ কাটার সময় বিস্ফোরণে প্রথমে ১২ শ্রমিক দগ্ধ হন। তাদের অনেকের শরীরের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পুড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ছয়ে দাঁড়ায়।

তদন্তের পর শিল্প মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠানটিকে তিন মাস বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় এবং জরিমানা করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে জরিমানার অঙ্ক ২৬ লাখ থেকে ৩৫ লাখ টাকা হিসেবে এসেছে; পরবর্তী নির্দেশনায় নিহত ছয় শ্রমিকের পরিবারকে প্রত্যেককে ৭ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়। আহতদের চিকিৎসা ব্যয় বহন এবং ১২ মাসের বেতন দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।

সম্পদের ক্ষতির হিসাব কোথায়?

সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ড দুর্ঘটনায় গত পাঁচ বছরে মোট কত টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে, এমন কোনো সমন্বিত, নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যঘাটতি। বিভিন্ন দুর্ঘটনার পর শ্রমিক নিহত ও আহতের সংখ্যা, তদন্ত কমিটি, জরিমানা ও ক্ষতিপূরণের তথ্য পাওয়া গেলেও ইয়ার্ডের যন্ত্রপাতি, জাহাজের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ, অবকাঠামো, উৎপাদন বন্ধ থাকার ক্ষতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ আর্থিক মূল্যায়ন সাধারণত প্রকাশ করা হয়নি।

তাই নিহত ৩৪ জনের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট অঙ্কের ‘সম্পদ ক্ষতি’ যোগ করে মোট আর্থিক ক্ষতির হিসাব দেওয়া হলে তা বিভ্রান্তিকর হবে। ২০২৪ সালের এসএন কর্পোরেশনের ঘটনায় ৬টি পরিবারের জন্য ৪২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের সরকারি নির্দেশ এবং জরিমানার অর্থকে সম্পদের ক্ষতি হিসেবে ধরা যাবে না; এগুলো প্রশাসনিক শাস্তি ও শ্রমিক পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা।

এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ২০২২ সালের সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডকে এই হিসাবের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি। সেটি একটি কনটেইনার ডিপো, জাহাজভাঙা ইয়ার্ড নয়। ওই ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হয়েছিল, কিন্তু সেটিকে সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ড দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা তথ্যগতভাবে সঠিক হবে না।

নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতির কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র পুরোপুরি আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৫ সালে মৃত্যুর সংখ্যা চারজনে নেমে এলেও ৪৯টি দুর্ঘটনা এবং ৬২ জন আহত হওয়ার ঘটনা দেখায় যে ঝুঁকি এখনো ব্যাপক। বিলসের তথ্য অনুযায়ী, গুরুতর দুর্ঘটনার বড় অংশই ভারী লোহা বা ধাতব বস্তু পড়ে যাওয়া, আগুন-বিস্ফোরণ এবং উচ্চতা বা ট্যাংকে পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় ঘটেছে।

বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক অধিকার সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি, প্রতিটি ইয়ার্ডে প্রশিক্ষিত শ্রমিক, বাধ্যতামূলক ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, গ্যাস পরীক্ষা, নিরাপদ কাটিং পদ্ধতি, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ সনদ থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; নিয়মিত তদারকি ও বাস্তব প্রয়োগও জরুরি।

সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পের পাঁচ বছরের চিত্র তাই দ্বিমুখী। একদিকে প্রাণহানি কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে দুর্ঘটনার সংখ্যা ও গুরুতর আহতের ঘটনা এখনো উদ্বেগজনক। ২০২১-২০২৫ সময়ে অন্তত ৩৪ শ্রমিকের মৃত্যু সেই ঝুঁকিরই প্রমাণ।

আর সর্বশেষ ফেরদৌস শিপইয়ার্ডের তিন প্রাণহানির ঘটনা দেখিয়ে দিল নিরাপত্তার প্রশ্নে সামান্য শিথিলতারও মূল্য হতে পারে একটি পরিবারের সারাজীবনের উপার্জনক্ষম মানুষকে হারানো।

এখন প্রয়োজন শুধু দুর্ঘটনার পর তদন্ত বা ক্ষতিপূরণ নয়; দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে প্রতিটি ইয়ার্ডে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে প্রতিটি দুর্ঘটনায় শ্রমিক হতাহতের পাশাপাশি সম্পদের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণও সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা জরুরি। এতে একদিকে জবাবদিহি বাড়বে, অন্যদিকে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্রও স্পষ্ট হবে।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডে পাঁচ বছরে ৩৪ প্রাণহানি 

আপডেট সময় : ১২:৪৭:১৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের উপকূলজুড়ে গড়ে ওঠা জাহাজভাঙা শিল্প দেশের ইস্পাত ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি এ শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও নিরাপত্তাঝুঁকি এখনো বড় উদ্বেগের কারণ।

বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড, বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসরোধ, ভারী লোহার পাত পড়ে যাওয়া, উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়া এবং ট্যাংকে আটকে পড়ার মতো ঘটনায় প্রায়ই শ্রমিক হতাহত হচ্ছেন।

সর্বশেষ শুক্রবার (১৪ আগস্ট ) সকালে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর ফেরদৌস শিপইয়ার্ডে বিস্ফোরণে অন্তত তিন শ্রমিক নিহত এবং আরও কয়েকজন দগ্ধ ও আহত হয়েছেন। ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, আহতদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। ঘটনাটি তদন্ত করে কারণ উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।

তবে সাম্প্রতিক এই দুর্ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে অন্তত ৩৪ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) ও অন্যান্য সংগঠনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২১ সালে ৯ জন, ২০২২ সালে ৭ জন, ২০২৩ সালে ৭ জন, ২০২৪ সালে ৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৪ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

বছরভিত্তিক প্রাণহানি

২০২১ সালে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে ৯ শ্রমিক নিহত হন। পরের দুই বছর ২০২২ ও ২০২৩ সালে প্রতিবছর ৭ জন করে প্রাণ হারান। ২০২৪ সালে বছরের শুরুতে দুর্ঘটনা তুলনামূলক কম থাকলেও সেপ্টেম্বরের এসএন কর্পোরেশনের ভয়াবহ বিস্ফোরণ পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় আনে। ওই ঘটনায় শেষ পর্যন্ত ছয় শ্রমিকের মৃত্যু হয় এবং আরও ছয়জন আহত হন।

২০২৫ সালে মৃত্যুর সংখ্যা কমে চারজনে দাঁড়ায়। কিন্তু প্রাণহানি কমলেও দুর্ঘটনার সংখ্যা কমেনি। বিলসের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বছর সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে ৪৯টি দুর্ঘটনা ঘটে এবং ৬২ শ্রমিক আহত হন। এর মধ্যে ৩১টি দুর্ঘটনাকে গুরুতর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গুরুতর দুর্ঘটনার মধ্যে অঙ্গহানি, হাড় ভাঙা, মাথা-চোখ-বুকে আঘাত, অগ্নিদগ্ধ হওয়া এবং স্থায়ী পঙ্গুত্বের মতো ঘটনা ছিল।

২০২৫ সালের মে মাসে জাহাজভাঙা শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তেলবাহী ট্যাংক পরিষ্কার করতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে এক শ্রমিকের মৃত্যু এবং আরও তিনজন অসুস্থ হওয়ার ঘটনাও ঘটে। এতে বোঝা যায়, ঝুঁকি শুধু জাহাজ কাটার স্থানে সীমাবদ্ধ নয়, জাহাজ থেকে পাওয়া তেল, বর্জ্য ও অন্যান্য বিপজ্জনক পদার্থ ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের নিরাপত্তা ঘাটতি রয়েছে।

২০২৪ সালের ভয়াবহ বিস্ফোরণ

গত পাঁচ বছরের দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বরের এসএন কর্পোরেশনের ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পুরোনো জাহাজ কাটার সময় বিস্ফোরণে প্রথমে ১২ শ্রমিক দগ্ধ হন। তাদের অনেকের শরীরের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পুড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ছয়ে দাঁড়ায়।

তদন্তের পর শিল্প মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠানটিকে তিন মাস বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় এবং জরিমানা করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে জরিমানার অঙ্ক ২৬ লাখ থেকে ৩৫ লাখ টাকা হিসেবে এসেছে; পরবর্তী নির্দেশনায় নিহত ছয় শ্রমিকের পরিবারকে প্রত্যেককে ৭ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়। আহতদের চিকিৎসা ব্যয় বহন এবং ১২ মাসের বেতন দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।

সম্পদের ক্ষতির হিসাব কোথায়?

সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ড দুর্ঘটনায় গত পাঁচ বছরে মোট কত টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে, এমন কোনো সমন্বিত, নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যঘাটতি। বিভিন্ন দুর্ঘটনার পর শ্রমিক নিহত ও আহতের সংখ্যা, তদন্ত কমিটি, জরিমানা ও ক্ষতিপূরণের তথ্য পাওয়া গেলেও ইয়ার্ডের যন্ত্রপাতি, জাহাজের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ, অবকাঠামো, উৎপাদন বন্ধ থাকার ক্ষতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ আর্থিক মূল্যায়ন সাধারণত প্রকাশ করা হয়নি।

তাই নিহত ৩৪ জনের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট অঙ্কের ‘সম্পদ ক্ষতি’ যোগ করে মোট আর্থিক ক্ষতির হিসাব দেওয়া হলে তা বিভ্রান্তিকর হবে। ২০২৪ সালের এসএন কর্পোরেশনের ঘটনায় ৬টি পরিবারের জন্য ৪২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের সরকারি নির্দেশ এবং জরিমানার অর্থকে সম্পদের ক্ষতি হিসেবে ধরা যাবে না; এগুলো প্রশাসনিক শাস্তি ও শ্রমিক পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা।

এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ২০২২ সালের সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডকে এই হিসাবের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি। সেটি একটি কনটেইনার ডিপো, জাহাজভাঙা ইয়ার্ড নয়। ওই ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হয়েছিল, কিন্তু সেটিকে সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ড দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা তথ্যগতভাবে সঠিক হবে না।

নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতির কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র পুরোপুরি আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৫ সালে মৃত্যুর সংখ্যা চারজনে নেমে এলেও ৪৯টি দুর্ঘটনা এবং ৬২ জন আহত হওয়ার ঘটনা দেখায় যে ঝুঁকি এখনো ব্যাপক। বিলসের তথ্য অনুযায়ী, গুরুতর দুর্ঘটনার বড় অংশই ভারী লোহা বা ধাতব বস্তু পড়ে যাওয়া, আগুন-বিস্ফোরণ এবং উচ্চতা বা ট্যাংকে পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় ঘটেছে।

বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক অধিকার সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি, প্রতিটি ইয়ার্ডে প্রশিক্ষিত শ্রমিক, বাধ্যতামূলক ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, গ্যাস পরীক্ষা, নিরাপদ কাটিং পদ্ধতি, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ সনদ থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; নিয়মিত তদারকি ও বাস্তব প্রয়োগও জরুরি।

সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পের পাঁচ বছরের চিত্র তাই দ্বিমুখী। একদিকে প্রাণহানি কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে দুর্ঘটনার সংখ্যা ও গুরুতর আহতের ঘটনা এখনো উদ্বেগজনক। ২০২১-২০২৫ সময়ে অন্তত ৩৪ শ্রমিকের মৃত্যু সেই ঝুঁকিরই প্রমাণ।

আর সর্বশেষ ফেরদৌস শিপইয়ার্ডের তিন প্রাণহানির ঘটনা দেখিয়ে দিল নিরাপত্তার প্রশ্নে সামান্য শিথিলতারও মূল্য হতে পারে একটি পরিবারের সারাজীবনের উপার্জনক্ষম মানুষকে হারানো।

এখন প্রয়োজন শুধু দুর্ঘটনার পর তদন্ত বা ক্ষতিপূরণ নয়; দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে প্রতিটি ইয়ার্ডে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে প্রতিটি দুর্ঘটনায় শ্রমিক হতাহতের পাশাপাশি সম্পদের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণও সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা জরুরি। এতে একদিকে জবাবদিহি বাড়বে, অন্যদিকে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্রও স্পষ্ট হবে।