বিমান বহরে যুক্ত হচ্ছে ১০ এয়ারবাস, ৩১ আগস্টের মধ্যে চুক্তি
- আপডেট সময় : ০১:১০:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ ৩৯ বার পড়া হয়েছে
‘২০৩১ থেকে সরবরাহ, প্রথমবার একসঙ্গে থাকবে বোয়িং ও এয়ারবাসের বহর, অর্থায়ন ও পরিচালন সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে’
জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর সম্প্রসারণে বড় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস থেকে ১০টি আধুনিক উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। চুক্তি অনুযায়ী ২০৩১ সাল থেকে ধাপে ধাপে এসব উড়োজাহাজ সরবরাহ করা হবে। নতুন এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে বিশ্বের দুই শীর্ষ উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং ও এয়ারবাসের উড়োজাহাজ একসঙ্গে পরিচালিত হবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং এয়ারবাসের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি এয়ারবাস বিমানের টেকনো-ফিন্যান্স কমিটির কাছে সংশোধিত প্রস্তাব জমা দিয়েছে। এতে চারটি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইড-বডি এবং ছয়টি এ৩২১নিও (A321neo) ন্যারো-বডি উড়োজাহাজ সরবরাহের প্রস্তাব রয়েছে। উভয় ধরনের উড়োজাহাজই জ্বালানি সাশ্রয়ী, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এবং পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক কম হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন এয়ারলাইনসের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। চুক্তির আওতায় ১০টি উড়োজাহাজ কেনা হবে এবং ২০৩১ সাল থেকে সেগুলোর সরবরাহ শুরু হবে। তিনি জানান, উড়োজাহাজের মূল্য, অর্থায়নের ধরন ও অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্ত চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকাশ করা হবে।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্যিক প্রয়োজন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন সক্ষমতা বিবেচনায় সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের লক্ষ্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে একটি আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক এবং মিশ্র-ফ্লিট পরিচালনাকারী আন্তর্জাতিক মানের এয়ারলাইনসে পরিণত করা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখাও এ সিদ্ধান্তের অন্যতম বিবেচ্য বিষয়।
এর আগে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বড় চুক্তি সম্পন্ন হয়। ওই চুক্তির আওতায় আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজ সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় এয়ারবাসও তাদের প্রস্তাব হালনাগাদ করে, যা বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনায় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বোয়িং ও এয়ারবাস দুই নির্মাতার উড়োজাহাজ একই বহরে থাকলে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রুট পরিকল্পনায় নমনীয়তা বাড়বে। দীর্ঘপাল্লার রুটে এ৩৫০-৯০০ এবং স্বল্প ও মধ্যম দূরত্বের রুটে এ৩২১নিও ব্যবহারের সুযোগ থাকায় যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী বহর ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের জ্বালানি-সাশ্রয়ী উড়োজাহাজ ব্যবহারের ফলে পরিচালন ব্যয়ও কমতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বহর সম্প্রসারণের পাশাপাশি অর্থায়ন, দক্ষ জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো এবং পরিচালন সক্ষমতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিগত সময়ে কেনা ১০টি বোয়িং উড়োজাহাজের অর্থ এখনো পুরোপুরি পরিশোধ করা হয়নি। এর মধ্যে নতুন করে আরও ২৪টি উড়োজাহাজ সংগ্রহের উদ্যোগ ভবিষ্যতে আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন পরিকল্পনা ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিমানের সাবেক এক পাইলট বলেন, নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহ সময়ের দাবি হলেও পরিচালন ব্যয়, সম্ভাব্য যাত্রী সংখ্যা, রুট সম্প্রসারণ এবং প্রয়োজনীয় পাইলট ও কারিগরি জনবল নিশ্চিত না করে বহর বাড়ানো হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
এভিয়েশন বিশ্লেষক এ টি এম নজরুল ইসলাম বলেন, নতুন ধরনের উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য দক্ষ পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী এবং রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলা বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি প্রি-ডেলিভারি পেমেন্ট, ঋণ পরিশোধ এবং ভবিষ্যৎ পরিচালন ব্যয়ও সুচিন্তিতভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
তাঁর মতে, নতুন উড়োজাহাজ থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব অর্জন করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে এ বিনিয়োগ লাভজনক হতে পারে। বর্তমানে বিমানের আয়ের বড় একটি অংশ আসে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা থেকে। ভবিষ্যতে এ খাতে প্রতিযোগিতা বাড়লে বিকল্প আয়ের উৎস শক্তিশালী করাও জরুরি হবে।
এয়ারবাসের প্রস্তাব অনুযায়ী, চারটি এ৩৫০-৯০০ দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে এবং ছয়টি এ৩২১নিও স্বল্প ও মধ্যম দূরত্বের রুটে পরিচালিত হবে। সম্প্রতি এয়ারবাসের ভাইস প্রেসিডেন্ট এডওয়ার্ড ডেলাহায়ে ঢাকা সফর করে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম, প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের পরই দুই পক্ষের আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এ সিদ্ধান্তের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্বও রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। ফলে বোয়িং ও এয়ারবাস উভয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় ইতিবাচক বার্তা যাবে।
সরকার ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর ৪৭টি উড়োজাহাজে উন্নীত করার পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছে। বর্তমানে বিমানের বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ, যার মধ্যে ১৪টিই বোয়িংয়ের তৈরি। পরিকল্পনা অনুযায়ী বোয়িংয়ের ১৪টি এবং এয়ারবাসের ১০টি নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে আগামী এক দশকে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির বহরে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটবে।
এর মাধ্যমে বহরের আকার বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ, যাত্রীসেবা উন্নয়ন এবং বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ যাত্রী ও কার্গো পরিবহন কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্য বাস্তবায়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।



















