কফির উৎপাদন বাড়লেও চাষ ও বাজারজাতকরণে সংকট
- আপডেট সময় : ১২:৫১:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশে কফির চাষ ও উৎপাদন ধীরে ধীরে বাড়ছে। পাহাড়ি এলাকার পাশাপাশি সমতলেও বিস্তৃত হচ্ছে কফি চাষ। এক যুগে দেশে কফির আমদানি বেড়েছে ছয় গুণ। উৎপাদনও গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে মান যাচাই ছাড়া চারা আমদানি, সেচের সংকট, রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব এবং দুর্বল বাজারব্যবস্থার কারণে সম্ভাবনা অনুযায়ী সুফল পাচ্ছেন না চাষিরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে দেশে ২৬৪ টন কফি আমদানি হয়েছিল। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৪৫ টনে। বর্তমানে প্রায় ৪০টি দেশ থেকে কফি আমদানি হলেও বড় অংশ আসে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রাজিল ও ভিয়েতনাম থেকে।
দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে ২০২১-২০২৫ মেয়াদে ‘কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্প নেয় সরকার। ২০২১ সালে ১২০ হেক্টর জমিতে ৩৫ টন প্রক্রিয়াজাত কফি উৎপাদন হলেও ২০২৫ সালে আবাদি জমি বেড়ে প্রায় ২ হাজার হেক্টর এবং উৎপাদন ৯৫ টনে দাঁড়িয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে কফি উৎপাদন ১ হাজার ৫০০ টনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
বান্দরবান বর্তমানে দেশের অন্যতম প্রধান কফি উৎপাদন এলাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলাটিতে ৫৪৪ হেক্টর জমিতে কফি চাষ হয়েছে এবং কাঁচা চেরির উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ১২২ দশমিক ৬ টনে। খাগড়াছড়িতেও ১৭৯ হেক্টর জমিতে কফি চাষ হচ্ছে। পার্বত্য এলাকার বাইরে টাঙ্গাইলের মধুপুর, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায়ও বাণিজ্যিকভাবে কফি চাষ বাড়ছে। রংপুর, নীলফামারী ও শেরপুরকেও সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে কৃষি অধিদপ্তর।

তবে মাঠে চাষিদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বান্দরবানের চাষি সি অং খুমি জানান, গ্রীষ্মকালে পানির অভাবে চারা মারা যায়। অতিরিক্ত তাপ, মিলিবাগ, ডাইব্যাক ও শিকড় পচা রোগেও ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে অ্যারাবিকা জাতের গাছে পোকার আক্রমণ বেশি।
খাগড়াছড়ির চাষি রুমেল মারমারও অভিযোগ, গ্রীষ্মকালে সেচের সংকটে কফি চাষ ব্যাহত হয়। কৃষকদের মতে, গভীর নলকূপের সঙ্গে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করা গেলে এ সমস্যা অনেকটাই কমতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মূল্যায়নেও পাহাড়ি এলাকায় সৌর পাম্প ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
চাষিদের আরেকটি বড় সমস্যা বাজারজাতকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ। কাঁচা চেরি তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হলেও প্রক্রিয়াজাত কফির মূল্য অনেক বেশি। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে পাল্পিং, শুকানো, পার্চমেন্ট তৈরি, রোস্টিং ও গ্রাইন্ডিংয়ের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেক চাষিকে কাঁচা বা প্রাথমিকভাবে প্রক্রিয়াজাত পণ্য কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
বারির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, আমদানি করা বীজ ও চারা পর্যাপ্ত গবেষণাগার পরীক্ষা ছাড়াই মাঠে সরবরাহ করায় রোগ-পোকা ও কাঙ্ক্ষিত ফলন না পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে বর্তমানে দেশের পরিবেশ উপযোগী ‘বারি কফি-১’ (রোবাস্টা) ও ‘বারি কফি-২’ (অ্যারাবিকা) জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আবহাওয়া, উচ্চতা, মাটি ও বৃষ্টিপাত কফি চাষের জন্য উপযোগী। আন্তঃফসল হিসেবেও কফি চাষের সুযোগ রয়েছে। তবে উৎপাদনের পাশাপাশি সেচ, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের কফি খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।

পাহাড়ের উপযোগী দুই জাতের কফি
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) পাহাড়ি অঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটির উপযোগিতা বিবেচনায় গবেষণার মাধ্যমে ‘বারি কফি-১’ (রোবাস্টা) ও ‘বারি কফি-২’ (অ্যারাবিকা) নামে দুটি উন্নত জাতের কফি উদ্ভাবন ও অবমুক্ত করেছে। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির পাহাড়ি কৃষি গবেষণাকেন্দ্রে দীর্ঘ গবেষণার পর জাত দুটি উদ্ভাবন করা হয়।
চারা রোপণের প্রায় তিন বছর পর থেকে গাছে ফল ধরতে শুরু করে। প্রাথমিক পর্যায়ে একটি গাছ থেকে ৪ থেকে ৫ কেজি পর্যন্ত কফি ফলন পাওয়া সম্ভব বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাত দুটি ছায়াঘেরা স্থানেও চাষ করা যায়। ফলে আম, কলা ও আনারসের মতো অন্যান্য ফসলের সঙ্গে আন্তঃফসল (ইন্টারক্রপ) হিসেবেও কফি চাষ করা সম্ভব। পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যমান বিভিন্ন ফলের বাগানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কফি চাষের সুযোগ থাকায় কৃষকদের জন্য এটি সম্ভাবনাময় একটি ফসল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।









