সুবর্ণগ্রাম: এক ছাদের নিচে প্রকৃতি, বিনোদন ও স্বস্তির ঠিকানা (১)
- আপডেট সময় : ০২:০৮:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৩৭ বার পড়া হয়েছে
সুবর্ণগ্রাম শুধু একটি বিনোদন কেন্দ্র নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অনুভূতির নাম
আমিনুল হক ভূইয়া
“তোমরা কোনোদিন শঙ্কামুক্ত হতে পারবে না-কারণ তোমরাই!”
এই বলে থামলেন সুবর্ণগ্রাম মহাজন। কথার ভেতর যেন ছিল দর্শন, ছিল জীবনের প্রতি এক ধরনের নির্ভার আহ্বান। ঠিক যেমন নির্ভার, মুক্ত আর প্রশান্ত সুবর্ণগ্রাম নিজেই।
আঁকাবাঁকা বিশাল লেকের তীর ঘেঁষে ছুটে চলা রেললাইন, একটু দূরে নান্দনিক বসার ঘর। সেখানে একাধিক পরিবার আলাদা আলাদা বসে হাসের মাংস আর চালের রুটি খেতে খেতে উপভোগ করছেন লেকের জলে স্পিডবোটের জলকেলি। সন্ধ্যার নরম শীতল বাতাসে হাত ধরে হিরহির করে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো সেই স্বপ্নিল জায়গায়। পথে হঠাৎই এসে গেল একটি ছোট ট্রেন। তাতে চেপে নির্ধারিত টিফিন লাউঞ্জে নামিয়ে দিল আমাদের।

আগেই অর্ডার দেওয়া-চালের রুটি আর হাসের মাংস। ট্রেন থেকে নেমে অল্প সময় বসে নিজেই খাবার আনতে গেলেন তিনি। দু’হাতে দুই ট্রে। গরম গরম জাল হাসের মাংস আর চালের রুটি খেতে খেতে জানালেন, মাত্র ৩০০ টাকায় এই খাবার। যে কেউ পরিবার নিয়ে এসে কাউন্টারে জনপ্রতি ৩০০ টাকা দিয়ে অ্যান্ট্রি কুপন সংগ্রহ করে সারাদিন ঘুরে বেড়াতে পারবেন, বসে আরাম করে খেতে পারবেন, কোনো বাড়তি খরচ ছাড়াই।
এই অভিজ্ঞতাই বলে দেয়, সুবর্ণগ্রাম শুধু একটি বিনোদন কেন্দ্র নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অনুভূতির নাম।
শুরুর লইনটি নিয়ে পড়ে আলোচনা করা যাবে। চলুন এখন এগিয়ে যাই।

একবার ঢুকলে বেরোতে মন চায় না
সুবর্ণগ্রাম এমন একটি রিসোর্ট ও অ্যামিউজমেন্ট পার্ক, যেখানে একবার প্রবেশ করলে দিনভর ঘুরেও তার সৌন্দর্য উপভোগের শেষ পাওয়া যায় না। এখানে কী নেই, এমন প্রশ্ন বরং অপ্রাসঙ্গিক। আছে মিলি চিড়িয়াখানা, সাফারি পার্ক, শিশু থেকে বৃদ্ধ-সবার জন্য উপযোগী নানান রাইড, টয় ট্রেন, বিশাল লেকজুড়ে স্পিডবোট রাইড, লেকের পাশ দিয়ে চলা ট্রেন, রেস্টুরেন্ট, কফি শপ, জুস বার, সাজানো গোছানো পিকনিক স্পট, সবুজ ছায়াঘেরা পরিবেশ আর চোখ জুড়ানো নান্দনিক স্থাপনা।
এই সুবিশাল আয়োজনের নাম সুবর্ণগ্রাম অ্যামিউজমেন্ট পার্ক অ্যান্ড রিসোর্ট (Suvarnagrama Amusement Park and Resort) ঢাকার অদূরে, অথচ শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরে এক শান্তির জনপদ।

পরিকল্পিত স্বপ্নের বাস্তব রূপ
এই নান্দনিক বিনোদন নগরী গড়ে তুলেছেন আফজাল মনির, একজন রুচিশীল সামাজিক ব্যক্তিত্ব। ঢাকার পাশে এমন একটি সুপরিকল্পিত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব স্থাপনা তৈরি করতে পারা নিঃসন্দেহে একটি সাহসী ও দূরদর্শী উদ্যোগ। প্রায় ১০০ একর জায়গাজুড়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতায় গড়ে ওঠা সুবর্ণগ্রাম প্রকৃতি ও আধুনিকতার এক অনবদ্ধ সংমিশ্রণ।
খোলা আকাশ, সবুজ মাঠ, পরিপাটি ল্যান্ডস্কেপিং, প্রশস্ত রাস্তা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ-সব মিলিয়ে সুবর্ণগ্রাম যেন ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলার এক আদর্শ আশ্রয়।
বিনোদনের বৈচিত্র্যে ভরপুর
সুবর্ণগ্রামের অন্যতম আকর্ষণ এর বৈচিত্র্যময় রাইড ও বিনোদন ব্যবস্থা। শিশুদের জন্য নিরাপদ ও আনন্দময় রাইড, তরুণদের জন্য রোমাঞ্চকর স্পিডবোট ও ওয়াটার রাইড, আর বয়স্কদের জন্য শান্ত পরিবেশে হাঁটার পথ, বসার জায়গা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ-সবকিছুই এখানে পরিকল্পিতভাবে সাজানো।
ওয়াটার পার্ক অংশে রয়েছে আধুনিক সুইমিং পুল, যেখানে পরিবারসহ নিরাপদে সময় কাটানো যায়। স্পিডবোটে চড়ে লেকের চারপাশ ঘুরে দেখার সুযোগ সুবর্ণগ্রামকে অন্য যেকোনো বিনোদন কেন্দ্র থেকে আলাদা করেছে। লেকের পাড় ঘেঁষে চলা ট্রেন রাইড যেন শিশুদের কাছে রূপকথার গল্প।

খাবার ও আতিথেয়তায় আলাদা পরিচিতি
সুবর্ণগ্রামের আরেকটি বড় শক্তি এর খাবারের মান ও বৈচিত্র্য। দেশীয় ঐতিহ্যবাহী খাবার থেকে শুরু করে আধুনিক ফাস্টফুড-সবই এখানে পাওয়া যায়। বিশেষ করে চালের রুটি ও হাসের মাংস ইতোমধ্যেই দর্শনার্থীদের কাছে সুবর্ণগ্রামের সিগনেচার ডিশে পরিণত হয়েছে।
রেস্টুরেন্ট, কফি শপ ও জুস বারগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, আরামদায়ক ও পরিবারবান্ধব। খাবারের দামও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী, যা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য সুবর্ণগ্রামকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
পিকনিক, অনুষ্ঠান ও কর্পোরেট আয়োজনের আদর্শ স্থান
সুবর্ণগ্রাম শুধু ব্যক্তিগত ভ্রমণ বা পরিবার নিয়ে ঘোরার জায়গা নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইভেন্ট ডেস্টিনেশন। এখানে এক একটি স্পটে একসঙ্গে ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষের পিকনিক আয়োজনের সুযোগ রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, সব ধরনের দলের জন্য আলাদা আলাদা পিকনিক স্পট ও আয়োজনের ব্যবস্থা রয়েছে।
কর্পোরেট সভা-সেমিনার, প্রশিক্ষণ কর্মশালা, সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ের আয়োজন বা গেট-টুগেদার-সবকিছুর জন্য সুবর্ণগ্রামে রয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ভেন্যু ও অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপনা।

নিরাপত্তা ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা
নিরাপত্তার দিক থেকেও সুবর্ণগ্রাম অত্যন্ত সচেতন। সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা কর্মী, সিসিটিভি নজরদারি, পর্যাপ্ত আলো ও সুপরিকল্পিত চলাচল ব্যবস্থা দর্শনার্থীদের নিশ্চিন্ত রাখে। শিশু, নারী ও বয়স্কদের জন্য আলাদা সেবার ব্যবস্থাও রয়েছে।
পরিবেশবান্ধব সবুজায়ন, পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সুবর্ণগ্রাম একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্লাস্টিক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ, খোলা সবুজ জায়গা সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক জলাধারকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা-সব মিলিয়ে এটি একটি টেকসই বিনোদন মডেল।
প্রবেশ মূল্য ও খরচ (সংক্ষেপে)
- পার্কে প্রবেশ মূল্য: ৩০০ টাকা (সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৭টা)
- ১০ বছরের নিচে: ২০০ টাকা
- সুইমিং পুল: ৩০০ টাকা
- স্পিডবোট: ১০০ টাকা
- হর্সকার রাইড: ১০০ টাকা
- লেকের পাশ দিয়ে ট্রেন রাইড: ৫০ টাকা
- রিসোর্ট রুম ভাড়া: ৬,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকা
যাতায়াত ও যোগাযোগ
ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে কুড়িল বিশ্বরোড হয়ে ৩০০ ফিট রাস্তা অথবা বনশ্রী–ডেমরা–স্টাফ কোয়ার্টার পথ ধরে সহজেই পৌঁছানো যায় সুবর্ণগ্রামে।
ঠিকানা: ভুলতা, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ
মোবাইল: 01958533112, 01958533125, 01958533119, 01958533117
ইমেইল: parksuvarnagrama@gmail.com

শেষ কথা
এক ছাদের তলায় বিনোদন, প্রকৃতি, নিরাপত্তা, আরাম, খাবার ও আয়োজন-সবকিছুর সমন্বয়ে সুবর্ণগ্রাম আজ দেশের অন্যতম সেরা পিকনিক স্পট ও বিনোদন কেন্দ্র। পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের নিয়ে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও পরিপূর্ণ আনন্দের ঠিকানা খুঁজলে সুবর্ণগ্রাম নিঃসন্দেহে একটি আদর্শ নাম।
ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলতে, একদিনের জন্য হলেও শঙ্কামুক্ত হতে-সুবর্ণগ্রামই যথেষ্ট।
অনুষ্ঠান শেষ করে যেন একরকম স্বার্থপরের মতোই চলে এসেছি, সুবর্ণ গ্রামের মহাজনকে কিছু না জানিয়েই। দুই দিন এক রাতের টানা ব্যস্ততা, দায়িত্ব আর সময়ের চাপের ভেতর দিয়ে সফল একটি আয়োজন সম্পন্ন করতে গিয়ে কত যে চিৎকার, কত যে নির্দেশনা দিতে হয়েছে, তার হিসাব নেই। সেই অতিরিক্ত চাপে কণ্ঠস্বর ভেঙে গেছে, গলায় জমেছে যন্ত্রণা। শরীরেও বাসা বেঁধেছে হালকা জ্বর। যাকে আমরা সাধারণ ভাষায় বলি, ‘গলা ভেঙে যাওয়া’-ঠিক সেটাই হয়েছে।
তবুও থামা যায়নি। সামান্য বিশ্রাম নিয়ে আবার ফিরতে হয়েছে কাজে। ক্লান্তি তখনো পুরোপুরি কাটেনি, শরীর-মনের ভেতর রয়ে গেছে অবসাদ। এর মধ্যেই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আরেকটি পর্ব, আর সেটি শুরু করতে হয়েছে কোনো বাধ্যবাধকতা নয়, নিজের তৃপ্তির জন্যই। কারণ কাজের মাঝেই আমি খুঁজে পাই জীবনের অর্থ, ব্যস্ততার ভেতরেই অনুভব করি নিজের অস্তিত্ব।
এই যাত্রাপথ আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় একটি গভীর বিশ্বাস-‘হাত বাড়ালেই বন্ধু, পা বাড়ালেই পথ’। মানুষ আর সম্পর্কের এই অদ্ভুত কিন্তু সুন্দর সমীকরণেই এগিয়ে চলে জীবন। ক্লান্তি আসে, কণ্ঠ ভাঙে, শরীর দুর্বল হয়, তবুও স্বপ্ন আর দায়বদ্ধতা মানুষকে আবার দাঁড় করিয়ে দেয়। হয়তো এটাই পথচলার নাম, হয়তো এটাই নিজের সঙ্গে নিজের অদৃশ্য এক চুক্তি।
চলবে












