শীত এলেই সক্রিয় মানবপাচারচক্র, টেকনাফ-উখিয়ায় ফের আতঙ্ক
- আপডেট সময় : ০৭:২৯:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬ ৬৫ বার পড়া হয়েছে
প্রতিবছর শীত মৌসুম ঘিরে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপকূলে নৌপথে মানবপাচার ভয়াবহ রূপ নেয়। চলতি বছর শীত শুরুর আগেই মানবপাচারকারী চক্র আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা নারী-শিশুসহ মানুষকে অপহরণ ও প্রলোভনের মাধ্যমে পাহাড়ি গোপন আস্তানায় জড়ো করে ট্রলারে তুলে দেওয়া হচ্ছে মালয়েশিয়াগামী নৌপথে।
গত পাঁচ বছরে নৌপথে মানবপাচারে বহু প্রাণহানি ঘটেছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেন্ট মার্টিনের পশ্চিমে ট্রলারডুবিতে ১৯ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়। ২০২২ সালের অক্টোবরে বাহারছড়া সাগরে আরেকটি ট্রলারডুবিতে প্রাণ যায় চারজনের। এসব ঘটনায় নারী ও শিশুরাও নিহত হয়েছে। পাচারকারীদের নির্যাতন, অনাহার ও পানিশূন্যতায় সাগরপথে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
সম্প্রতি টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় বিজিবি, র্যাব ও কোস্ট গার্ডের চারটি অভিযানে ১৮৭ জনকে উদ্ধার এবং ১৬ জন পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, পাচারকারীরা সংঘবদ্ধভাবে কাজ করছে এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত।

সমুদ্রপথে বিদেশ গমনকালে আটক ২৭৩
অবৈধভাবে সমুদ্রপথে বিদেশ গমনকালে ২৭৩ জন ব্যক্তিকে আটক করেছে নৌবাহিনী। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শনিবার দিবাগত রাতে সেন্টমার্টিন দ্বীপ সংলগ্ন সমুদ্র এলাকা থেকে তাদের আটক করে বঙ্গোপসাগরে টহলরত বাংলাদেশ নৌবাহিনী জাহাজ ‘বানৌজা স্বাধীনতা’। এসময় একটি কাঠের বোট জব্দ করা হয়।
রোববার বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, আটক সকল ব্যক্তি অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় গমনের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন। নৌবাহিনীর সময়োচিত ও কার্যকর পদক্ষেপের ফলে সম্ভাব্য একটি বড় ধরনের মানবপাচার কার্যক্রম প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।
এতে জানানো হয়েছে, সেন্টমার্টিন থেকে ৩০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থানরত একটি কাঠের বোটের সন্দেহজনক গতিবিধি দেখতে পায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী জাহাজ ‘বানৌজা স্বাধীনতা’।
নৌবাহিনী জাহাজ বোটটিকে থামার জন্য সংকেত দিলে বোটটি না থেমে তার গতি বাড়িয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। নৌবাহিনী জাহাজ তৎক্ষণাৎ বোটটিকে ধাওয়া করে আটক করে। এ সময় বোটে থাকা দালালচক্রের ১০ সদস্যসহ ২৭৩ জনকে আটক করা হয়।

আটকদের তথ্যমতে জানা যায়, তারা দালাল চক্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া গমনের উদ্দেশে বোটযোগে যাত্রা করেন। আটক বোট ও ব্যক্তিদের পরবর্তী আইনানুগ কার্যক্রম গ্রহণের জন্য টেকনাফ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বোটে ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম, পর্যাপ্ত খাদ্য, পানি ও সুরক্ষাব্যবস্থা ব্যতীত যাত্রা শুরু করে, যা গভীর সমুদ্রে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারতো। নৌবাহিনীর তাৎক্ষণিক ও কার্যকর পদক্ষেপে এ বিপর্যয় প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশ নৌবাহিনী দেশের জলসীমার নিরাপত্তা, সমুদ্রপথে চোরা-চালান রোধ, অবৈধ অনুপ্রবেশসহ যেকোনো অপরাধমূলক কার্যক্রম প্রতিরোধে অঙ্গীকারবদ্ধ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দারিদ্র্য, কাজের অভাব ও বিদেশে উন্নত জীবনের মিথ্যা আশাই মানবপাচারের মূল পুঁজি। উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অন্তত অর্ধশত দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা ক্যাম্পের ভেতর থেকেই লোক সংগ্রহ করছে।
টেকনাফের ২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. আশিকুর রহমান জানান, নৌপথে মানবপাচারের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বলছেন, কঠোর নজরদারি, সামাজিক সচেতনতা এবং দালালদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভাঙতে না পারলে শীত মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। মানবপাচার প্রতিরোধে এখনই সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ জরুরি।



















