ঢাকা ০৬:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ২৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগে অভ্যন্তরীণ তদন্ত দেড় কোটি মানুষ ছাড়ছে ঢাকা, ঈদে জনস্রোত সামাল দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ কমার একদিন পরই বাড়ল সোনার দাম, ভরিতে বেড়েছে ৩,২৬৬ টাকা বিশ্ব ঐতিহ্যের জামদানি বুনেও কষ্টের জীবন রূপগঞ্জের তাঁতিদের ফ্যামিলি কার্ড নারীর ক্ষমতায়নে সহায়ক হবে: সিপিডি ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনার লক্ষ্য সরকারের: প্রধানমন্ত্রী শিরীণ বেবীর কবিতা ‘নারী তুমি মানুষ হতে শেখো’ পর্যালোচনা ছাড়াই মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ অনুমোদনের দাবি তিস্তা  প্রকল্পে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন মজুদ পর্যাপ্ত, তবু বাজারে তেলের সংকট  মুনাফাখোরদের কারসাজি

বিশ্ব ঐতিহ্যের জামদানি বুনেও কষ্টের জীবন রূপগঞ্জের তাঁতিদের

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:৫৭:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬ ২১ বার পড়া হয়েছে

জামদানি শিল্পীদের কর্ব্যস্ততা: ছবি সংগ্রহ

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

খুব যত্ন আর মমতায় সূতোর জমিনে হাত বুলিয়ে চলেছে সুমাইয়া। চোখে তার একাগ্র মনোযোগ, ডানেবামে তাকানোর অবকাশ নেই। যেন সূক্ষ্ম সুতোর ভাঁজে ভাঁজে তিনি খুঁজে নিচ্ছেন শিল্পের ভাষা। তাঁতের সামনে বসে থাকা এই তরুণী যেন ধ্যানমগ্ন এক জামদানি শিল্পী, প্রতিটি নকশা, প্রতিটি বুননে তার নিবিড় মনোসংযোগ।

ঐতিহ্যবাহী নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরঘেঁষা তারাবো অঞ্চলটি এখন সুপরিচিত জামদানি পল্লি। এখানে ঘরে ঘরে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁতের মৃদু টুংটাং শব্দে বোনা হয় অনন্য সৌন্দর্যের জামদানি শাড়ি। তরুণতরুণীদের দক্ষ হাতে সাদা সূতোর ক্যানভাসে ফুটে ওঠে মনোমুগ্ধকর নকশা, কখনও ফুল, কখনও লতা, কখনও বা জ্যামিতিক কারুকাজ।

সূতোর সঙ্গে জামদানি শিল্পীদের সম্পর্ক যেন নিছক পেশার নয়, এক গভীর মমতার বন্ধন। প্রতিটি সুতা, প্রতিটি বুনন তাদের কাছে শিল্পের ভাষা, যেখানে ধৈর্য, নিষ্ঠা আর ঐতিহ্যের গল্প একসূত্রে গাঁথা হয়ে জন্ম দেয় অনন্য এক নন্দনশৈলী।

ঈদকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার জামদানি পল্লিতে এখন কর্মব্যস্ত সময়। উপজেলার বিসিক জামদানি শিল্পনগরীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় তাঁতঘরগুলোতে দিনরাত চলছে শাড়ি তৈরির কাজ। কোথাও কাপড়ে সুতা তোলা হচ্ছে, কোথাও রঙ করা হচ্ছে সুতা, আবার কোথাও দক্ষ হাতে বোনা হচ্ছে নান্দনিক জামদানি শাড়ি। ঈদ মৌসুমকে ঘিরে যেন দম ফেলারও ফুরসত নেই তাঁতিদের।

বিশ্বজুড়ে খ্যাত এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সৌন্দর্যে মুগ্ধ লাখো মানুষ। কিন্তু যে শিল্পের গৌরবে দেশ পরিচিত, সেই শিল্পের কারিগরদের জীবন এখনো নানা সংকটে জর্জরিত। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে অনেক তাঁতি ধীরে ধীরে এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম করেও লাভের পরিমাণ সীমিত হওয়ায় হতাশা বাড়ছে তাদের মধ্যে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও রূপগঞ্জে প্রায় পাঁচ হাজার তাঁতি জামদানি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজারে। ন্যায্য পারিশ্রমিক না পাওয়ায় অনেকেই ঐতিহ্যবাহী এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

বিশ্ব ঐতিহ্যের জামদানি বুনেও কষ্টের জীবন রূপগঞ্জের তাঁতিদের
জামদানি শাড়ি বুননে ব্যস্ত তাঁতীরা: ছবি সংগ্রহ

রূপগঞ্জের কয়েকজন তাঁতি জানান, একটি জামদানি শাড়ি তৈরি করতে অনেক সময় মাসের পর মাস লেগে যায়। কিন্তু বাজারে সেই শাড়ির প্রকৃত মূল্য তাঁতিদের হাতে পৌঁছায় না। ফলে বাধ্য হয়ে পাইকারি বাজারে তুলনামূলক কম দামে শাড়ি বিক্রি করতে হয়।

সকালের সোনালি আলো যখন তাঁতঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে মেঝেতে পড়ে, তখন কাঠের তাঁতের মৃদু শব্দে ধীরে ধীরে বোনা হতে থাকে এক টুকরো ইতিহাস। সূক্ষ্ম সুতোয় শিল্পীর নিপুণ হাতে ফুটে ওঠে ফুল, লতা জ্যামিতিক নকশা। প্রতিটি নকশা যেন একেকটি গল্প, একেকটি স্বপ্ন। জামদানি কেবল একটি শাড়ি নয়, এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গর্বিত প্রতীক।

ব্যবসায়ীরা জানান, সারা বছরের মোট বিক্রির প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ হয় ঈদ মৌসুমে। চলতি ঈদকে সামনে রেখে অনেক ব্যবসায়ী ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বিক্রি বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।

বছর ক্রেতাদের মধ্যে হালকা সফট রঙের জামদানির চাহিদা বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে অফহোয়াইট, প্যাস্টেল শেড, আকাশি, পিঙ্ক মিন্ট গ্রিন রঙের শাড়ি বেশি বিক্রি হচ্ছে।

জামদানিকে অনেকেই বাংলার হারিয়ে যাওয়া মসলিনের উত্তরাধিকার হিসেবে মনে করেন। অতীতের মসলিনের মতোই আজকের জামদানির সূক্ষ্ম বুনন শিল্পসৌন্দর্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও জামদানির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে নিয়মিত রফতানি হচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী শাড়ি।

ইতিহাস বলছে, মোগল আমল থেকেই জামদানি বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে আসছে। তখনকার ঢাকার জামদানি ছিল রাজদরবারের অন্যতম বিলাসবহুল পোশাক। সম্রাটদের রানী, রাজকন্যা অভিজাত নারীরা জামদানি পরতেন রাজকীয় মর্যাদার প্রতীক হিসেবে।

জামদানিশব্দটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়।জামঅর্থ ফুল এবংদানিঅর্থ ধারকঅর্থাৎ ফুল ধারণকারী কাপড়। এই শাড়ির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর ভাসমান নকশা। সূক্ষ্ম সুতো দিয়ে কাপড়ের ওপর এমনভাবে নকশা তৈরি করা হয়, যেন তা কাপড়ের গায়ে ভেসে আছে।

এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ১৯৯১ সালে রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) প্রায় ২০ একর জমির ওপর প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলে জামদানি শিল্পনগরী গবেষণা কেন্দ্র। এর উদ্দেশ্য ছিল ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা তাঁতিদের অবকাঠামোগত সুবিধার আওতায় এনে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টেকসই করা।

বিশ্ব ঐতিহ্যের জামদানি বুনেও কষ্টের জীবন রূপগঞ্জের তাঁতিদের
শিল্পীর চোখে জামদানি বুনন: ছবি তথ্যপ্রযুক্তি

বর্তমানে এই শিল্পনগরীতে মোট ৪১৬টি প্লট রয়েছে, যার মধ্যে ৪০৭টি জামদানি উৎপাদনের জন্য বরাদ্দ। এসব প্লটে শত শত কারিগরের দক্ষ হাতে তৈরি হচ্ছে নান্দনিক জামদানি শাড়ি।

রূপগঞ্জের তারাবো, গোলাকান্দাইল, ভুলতা, গাউছিয়া কাঞ্চনসহ আশপাশের এলাকায় অসংখ্য তাঁতঘরে প্রতিদিন বোনা হচ্ছে নতুন নতুন জামদানি। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী সোনারগাঁ উপজেলার বিভিন্ন এলাকাতেও বিস্তৃত রয়েছে এই শিল্পের কার্যক্রম।

ঐতিহ্যগতভাবে জামদানি সম্পূর্ণ হাতে বোনা হয়। একটি শাড়ি তৈরি করতে সাধারণত থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। তবে জটিল নকশার ক্ষেত্রে সময় লাগে কয়েক মাস। অনেক সময় উন্নত মানের একটি শাড়ি তৈরি করতে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। নকশা কারুকাজের জটিলতার ওপর নির্ভর করে সময়ের এই তারতম্য।

বর্তমানে বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তাঁতিরা জামদানির পাশাপাশি নতুন নতুন পণ্যও তৈরি করছেন। এখন শুধু শাড়ি নয়, জামদানি দিয়ে তৈরি হচ্ছে থ্রিপিস, ওড়না, পাঞ্জাবির কাপড়, স্কার্ফসহ বিভিন্ন ফ্যাশন পণ্য। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প আধুনিক ফ্যাশনের সঙ্গেও তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

তবে বাস্তবতা হলো, এই শিল্পের লাভের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। অনেক তাঁতি মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে কাজ করেন এবং তাদের দেওয়া নকশা অনুযায়ী শাড়ি তৈরি করেন। দীর্ঘ শ্রমের পর তারা পান সীমিত মজুরি।

জামদানি কারিগর আব্দুল মজিদ বলেন, বিশ্বজুড়ে জামদানির সুনাম থাকলেও কারিগররা ভালো নেই। আমাদের পরিশ্রমের প্রকৃত সুফল ভোগ করেন মধ্যস্বত্বভোগী, মহাজন ফড়িয়ারা।

বিশ্ব ঐতিহ্যের জামদানি বুনেও কষ্টের জীবন রূপগঞ্জের তাঁতিদের
জামদানি শাড়ির বোনার দৃশ্য: ছবি সংগ্রহ

তাঁত মালিক আজগর আলী জানান, বর্তমানে দক্ষ কারিগরের অভাব দেখা দিয়েছে। ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা দাদন দিয়েও অনেক সময় তাঁতি পাওয়া যাচ্ছে না।

কারিগর রোমান মিয়া, আবু সালেহ জাকির হোসেন বলেন, একটি শাড়ি তৈরিতে এক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগে। কিন্তু কাঁচামালের খরচ বাদ দিলে লাভের বড় অংশই চলে যায় মহাজনের হাতে। যদি তাঁতিদের নিজস্ব পুঁজি থাকত, তাহলে তারা নিজেরাই উৎপাদন বিক্রির ব্যবস্থা করতে পারতেন।

তবে প্রযুক্তির ব্যবহারে এই শিল্পে নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসা কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনেক উদ্যোক্তা এখন সরাসরি তাঁতিদের কাছ থেকে জামদানি সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কিছুটা কমছে এবং তাঁতিরাও তুলনামূলক ভালো দাম পাচ্ছেন।

নারী উদ্যোক্তা সুমাইয়া আক্তার জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে চার হাজার টাকা থেকে শুরু করে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত দামের জামদানি শাড়ি পাওয়া যায়। ঈদকে সামনে রেখে বিক্রি ভালো হচ্ছে এবং অনলাইন অর্ডারের সংখ্যাও আগের তুলনায় বেড়েছে।

বিসিক জামদানি শিল্পনগরী গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, সারা বছরই এখানে জামদানি পণ্যের কেনাবেচা হয়। তবে ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তাঁতিদের জন্য অবকাঠামোগত সুবিধা, প্রশিক্ষণ নকশা উন্নয়নসহ নানা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

তবে সবকিছুর পরও প্রশ্ন থেকেই যায়, যে শিল্প বাঙালির ঐতিহ্য বিশ্বস্বীকৃত সাংস্কৃতিক সম্পদ, সেই শিল্পের প্রকৃত কারিগরদের জীবন কবে স্বচ্ছল হবে। ঐতিহ্যের জামদানি টিকিয়ে রাখতে হলে তাঁতিদের ন্যায্য মূল্য টেকসই সহায়তা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

বিশ্ব ঐতিহ্যের জামদানি বুনেও কষ্টের জীবন রূপগঞ্জের তাঁতিদের

আপডেট সময় : ০৩:৫৭:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬

খুব যত্ন আর মমতায় সূতোর জমিনে হাত বুলিয়ে চলেছে সুমাইয়া। চোখে তার একাগ্র মনোযোগ, ডানেবামে তাকানোর অবকাশ নেই। যেন সূক্ষ্ম সুতোর ভাঁজে ভাঁজে তিনি খুঁজে নিচ্ছেন শিল্পের ভাষা। তাঁতের সামনে বসে থাকা এই তরুণী যেন ধ্যানমগ্ন এক জামদানি শিল্পী, প্রতিটি নকশা, প্রতিটি বুননে তার নিবিড় মনোসংযোগ।

ঐতিহ্যবাহী নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরঘেঁষা তারাবো অঞ্চলটি এখন সুপরিচিত জামদানি পল্লি। এখানে ঘরে ঘরে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁতের মৃদু টুংটাং শব্দে বোনা হয় অনন্য সৌন্দর্যের জামদানি শাড়ি। তরুণতরুণীদের দক্ষ হাতে সাদা সূতোর ক্যানভাসে ফুটে ওঠে মনোমুগ্ধকর নকশা, কখনও ফুল, কখনও লতা, কখনও বা জ্যামিতিক কারুকাজ।

সূতোর সঙ্গে জামদানি শিল্পীদের সম্পর্ক যেন নিছক পেশার নয়, এক গভীর মমতার বন্ধন। প্রতিটি সুতা, প্রতিটি বুনন তাদের কাছে শিল্পের ভাষা, যেখানে ধৈর্য, নিষ্ঠা আর ঐতিহ্যের গল্প একসূত্রে গাঁথা হয়ে জন্ম দেয় অনন্য এক নন্দনশৈলী।

ঈদকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার জামদানি পল্লিতে এখন কর্মব্যস্ত সময়। উপজেলার বিসিক জামদানি শিল্পনগরীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় তাঁতঘরগুলোতে দিনরাত চলছে শাড়ি তৈরির কাজ। কোথাও কাপড়ে সুতা তোলা হচ্ছে, কোথাও রঙ করা হচ্ছে সুতা, আবার কোথাও দক্ষ হাতে বোনা হচ্ছে নান্দনিক জামদানি শাড়ি। ঈদ মৌসুমকে ঘিরে যেন দম ফেলারও ফুরসত নেই তাঁতিদের।

বিশ্বজুড়ে খ্যাত এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সৌন্দর্যে মুগ্ধ লাখো মানুষ। কিন্তু যে শিল্পের গৌরবে দেশ পরিচিত, সেই শিল্পের কারিগরদের জীবন এখনো নানা সংকটে জর্জরিত। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে অনেক তাঁতি ধীরে ধীরে এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম করেও লাভের পরিমাণ সীমিত হওয়ায় হতাশা বাড়ছে তাদের মধ্যে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও রূপগঞ্জে প্রায় পাঁচ হাজার তাঁতি জামদানি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজারে। ন্যায্য পারিশ্রমিক না পাওয়ায় অনেকেই ঐতিহ্যবাহী এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

বিশ্ব ঐতিহ্যের জামদানি বুনেও কষ্টের জীবন রূপগঞ্জের তাঁতিদের
জামদানি শাড়ি বুননে ব্যস্ত তাঁতীরা: ছবি সংগ্রহ

রূপগঞ্জের কয়েকজন তাঁতি জানান, একটি জামদানি শাড়ি তৈরি করতে অনেক সময় মাসের পর মাস লেগে যায়। কিন্তু বাজারে সেই শাড়ির প্রকৃত মূল্য তাঁতিদের হাতে পৌঁছায় না। ফলে বাধ্য হয়ে পাইকারি বাজারে তুলনামূলক কম দামে শাড়ি বিক্রি করতে হয়।

সকালের সোনালি আলো যখন তাঁতঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে মেঝেতে পড়ে, তখন কাঠের তাঁতের মৃদু শব্দে ধীরে ধীরে বোনা হতে থাকে এক টুকরো ইতিহাস। সূক্ষ্ম সুতোয় শিল্পীর নিপুণ হাতে ফুটে ওঠে ফুল, লতা জ্যামিতিক নকশা। প্রতিটি নকশা যেন একেকটি গল্প, একেকটি স্বপ্ন। জামদানি কেবল একটি শাড়ি নয়, এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গর্বিত প্রতীক।

ব্যবসায়ীরা জানান, সারা বছরের মোট বিক্রির প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ হয় ঈদ মৌসুমে। চলতি ঈদকে সামনে রেখে অনেক ব্যবসায়ী ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বিক্রি বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।

বছর ক্রেতাদের মধ্যে হালকা সফট রঙের জামদানির চাহিদা বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে অফহোয়াইট, প্যাস্টেল শেড, আকাশি, পিঙ্ক মিন্ট গ্রিন রঙের শাড়ি বেশি বিক্রি হচ্ছে।

জামদানিকে অনেকেই বাংলার হারিয়ে যাওয়া মসলিনের উত্তরাধিকার হিসেবে মনে করেন। অতীতের মসলিনের মতোই আজকের জামদানির সূক্ষ্ম বুনন শিল্পসৌন্দর্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও জামদানির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে নিয়মিত রফতানি হচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী শাড়ি।

ইতিহাস বলছে, মোগল আমল থেকেই জামদানি বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে আসছে। তখনকার ঢাকার জামদানি ছিল রাজদরবারের অন্যতম বিলাসবহুল পোশাক। সম্রাটদের রানী, রাজকন্যা অভিজাত নারীরা জামদানি পরতেন রাজকীয় মর্যাদার প্রতীক হিসেবে।

জামদানিশব্দটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়।জামঅর্থ ফুল এবংদানিঅর্থ ধারকঅর্থাৎ ফুল ধারণকারী কাপড়। এই শাড়ির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর ভাসমান নকশা। সূক্ষ্ম সুতো দিয়ে কাপড়ের ওপর এমনভাবে নকশা তৈরি করা হয়, যেন তা কাপড়ের গায়ে ভেসে আছে।

এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ১৯৯১ সালে রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) প্রায় ২০ একর জমির ওপর প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলে জামদানি শিল্পনগরী গবেষণা কেন্দ্র। এর উদ্দেশ্য ছিল ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা তাঁতিদের অবকাঠামোগত সুবিধার আওতায় এনে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টেকসই করা।

বিশ্ব ঐতিহ্যের জামদানি বুনেও কষ্টের জীবন রূপগঞ্জের তাঁতিদের
শিল্পীর চোখে জামদানি বুনন: ছবি তথ্যপ্রযুক্তি

বর্তমানে এই শিল্পনগরীতে মোট ৪১৬টি প্লট রয়েছে, যার মধ্যে ৪০৭টি জামদানি উৎপাদনের জন্য বরাদ্দ। এসব প্লটে শত শত কারিগরের দক্ষ হাতে তৈরি হচ্ছে নান্দনিক জামদানি শাড়ি।

রূপগঞ্জের তারাবো, গোলাকান্দাইল, ভুলতা, গাউছিয়া কাঞ্চনসহ আশপাশের এলাকায় অসংখ্য তাঁতঘরে প্রতিদিন বোনা হচ্ছে নতুন নতুন জামদানি। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী সোনারগাঁ উপজেলার বিভিন্ন এলাকাতেও বিস্তৃত রয়েছে এই শিল্পের কার্যক্রম।

ঐতিহ্যগতভাবে জামদানি সম্পূর্ণ হাতে বোনা হয়। একটি শাড়ি তৈরি করতে সাধারণত থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। তবে জটিল নকশার ক্ষেত্রে সময় লাগে কয়েক মাস। অনেক সময় উন্নত মানের একটি শাড়ি তৈরি করতে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। নকশা কারুকাজের জটিলতার ওপর নির্ভর করে সময়ের এই তারতম্য।

বর্তমানে বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তাঁতিরা জামদানির পাশাপাশি নতুন নতুন পণ্যও তৈরি করছেন। এখন শুধু শাড়ি নয়, জামদানি দিয়ে তৈরি হচ্ছে থ্রিপিস, ওড়না, পাঞ্জাবির কাপড়, স্কার্ফসহ বিভিন্ন ফ্যাশন পণ্য। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প আধুনিক ফ্যাশনের সঙ্গেও তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

তবে বাস্তবতা হলো, এই শিল্পের লাভের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। অনেক তাঁতি মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে কাজ করেন এবং তাদের দেওয়া নকশা অনুযায়ী শাড়ি তৈরি করেন। দীর্ঘ শ্রমের পর তারা পান সীমিত মজুরি।

জামদানি কারিগর আব্দুল মজিদ বলেন, বিশ্বজুড়ে জামদানির সুনাম থাকলেও কারিগররা ভালো নেই। আমাদের পরিশ্রমের প্রকৃত সুফল ভোগ করেন মধ্যস্বত্বভোগী, মহাজন ফড়িয়ারা।

বিশ্ব ঐতিহ্যের জামদানি বুনেও কষ্টের জীবন রূপগঞ্জের তাঁতিদের
জামদানি শাড়ির বোনার দৃশ্য: ছবি সংগ্রহ

তাঁত মালিক আজগর আলী জানান, বর্তমানে দক্ষ কারিগরের অভাব দেখা দিয়েছে। ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা দাদন দিয়েও অনেক সময় তাঁতি পাওয়া যাচ্ছে না।

কারিগর রোমান মিয়া, আবু সালেহ জাকির হোসেন বলেন, একটি শাড়ি তৈরিতে এক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগে। কিন্তু কাঁচামালের খরচ বাদ দিলে লাভের বড় অংশই চলে যায় মহাজনের হাতে। যদি তাঁতিদের নিজস্ব পুঁজি থাকত, তাহলে তারা নিজেরাই উৎপাদন বিক্রির ব্যবস্থা করতে পারতেন।

তবে প্রযুক্তির ব্যবহারে এই শিল্পে নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসা কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনেক উদ্যোক্তা এখন সরাসরি তাঁতিদের কাছ থেকে জামদানি সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কিছুটা কমছে এবং তাঁতিরাও তুলনামূলক ভালো দাম পাচ্ছেন।

নারী উদ্যোক্তা সুমাইয়া আক্তার জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে চার হাজার টাকা থেকে শুরু করে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত দামের জামদানি শাড়ি পাওয়া যায়। ঈদকে সামনে রেখে বিক্রি ভালো হচ্ছে এবং অনলাইন অর্ডারের সংখ্যাও আগের তুলনায় বেড়েছে।

বিসিক জামদানি শিল্পনগরী গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, সারা বছরই এখানে জামদানি পণ্যের কেনাবেচা হয়। তবে ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তাঁতিদের জন্য অবকাঠামোগত সুবিধা, প্রশিক্ষণ নকশা উন্নয়নসহ নানা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

তবে সবকিছুর পরও প্রশ্ন থেকেই যায়, যে শিল্প বাঙালির ঐতিহ্য বিশ্বস্বীকৃত সাংস্কৃতিক সম্পদ, সেই শিল্পের প্রকৃত কারিগরদের জীবন কবে স্বচ্ছল হবে। ঐতিহ্যের জামদানি টিকিয়ে রাখতে হলে তাঁতিদের ন্যায্য মূল্য টেকসই সহায়তা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।