দাকোপের বাঁকে বাঁকে উন্নয়নের শঙ্কচিল (১)
- আপডেট সময় : ০৪:০৯:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ জুলাই ২০২৩ ৪৯৩ বার পড়া হয়েছে
শেখ হাসিনার স্লোগান ‘গ্রাম হবে শহর’ তারই নজির গড়লো দাকোপ
অনিরুদ্ধ
পথে পথে শুভাকাঙ্খিদের ভীড় ঠেলে নয়টার অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেন বেলা ১১টায়। গায়ের মেঠো পথ এখন আর নেই। পিলঢালা পথের চারিদিকে সবুজের বেষ্টনী, নান্দিনিক। দীর্ঘ দিন পর সোঁদা মাটির গন্ধে মনটা ভরে গেল। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমার দেশের কৃষক বাঁচলেই দেশ বাচবে। তোমারা ঘাম ঝরিয়ে ফসল উৎপাদন করো। সেই ফসল খেয়ে বাংলার মানুষ বেচে থাকে।
তারপরই প্রমান পেলাম গায়ের পথে। রাস্তায় রাস্তায় নারী-পুরুষের ভীড়। নারীরা প্রকৃতির মতো উদার হেসে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করেন, কেমন আছেন দিদি? মাথার ওপরে মেঘে ঢাকা উদার আকাশ। কিছু ক্ষণ পর পর ঝুম বৃষ্টি। তারপর কিছুটা বিরতি। গাড়ি এগিয়ে চলে। কিন্তু পথের মোড়ে মোড়ে গাড়ি থামাতেই হয়। মানুষগুলোর হাসিমুখ উপেক্ষা করে গাড়ি হাকিয়ে চলে যেতে পারেন না তিনি, নামতেই হয়।

মুক্তমনা মানুষগুলোর হৃদয়ের বাসিন্দা তিনি। তাদের শুনিয়ে যান শেখ হাসিনার উন্নয়নের গল্প। দোয়া চান তার জন্য। মানুষগুলো চারিদিকে থেকে ঘিরে ধরেন তাকে। কোথাও গাড়ি থামিয়ে গ্রামীণ শিশুদের চকলেট দেন। মাঝে মাঝে বৃষ্টি কিছুক্ষণের জন্য মানুষদের থামিয়ে দেয়। বৃষ্টি ধরে আসলে ফের মানুষের জটলা। বাড়ি থেকে বেড়িয়ে সারা পথে মানুষের সঙ্গে কথা বলেই অনুষ্ঠানের পথে এগোয় গাড়ি।
বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলা খুলনা। শতভাগ রপ্তানির হোয়াইট গোল্ড তথা চিংড়ির অন্যতম উৎপাদন স্থান। যতদুর চোখ যায়, কেবল চিংড়ি ঘের। ডানে-বামে চিংড়ি ঘেরের মাঝখান দিয়ে প্রসস্ত রাস্তা। এই খুলনা জেলার শেষ প্রান্তে পূর্ব-দক্ষিণের উপজেলাটির নাম দাকোপ উপজেলা। দাকোপ-পাইকগাছা নিয়ে একটি নির্বাচনী আসন।

নিভৃত গ্রামের ছোঁয়া এখন আর নেই। পাকা রাস্তা, বৈদ্যুতিক বাতি, পানীয়জলেন কল, বাঁশের সাঁকোর স্থলে পাকা সেতু। দাকোপ উপজেলার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা এবং ইউনিয়নে কাঁচা রাস্তা চোখে পড়েনি। ২০১৮ সালেও তেমনটি ছিল না। কাঁচা পথে হাটু সমান জলকাদা মারিয়ে মানুষদের পথ চলতে হয়েছে। বৃষ্টিতে কৃষিপণ্য নিয়ে এলাকাবাসী চরম ভোগান্তি ছিল নিত্য সঙ্গি। বহু জায়গা ছিল বিদ্যুৎহীন। খাবার জলের চরম সংকট, এলাকাবাসী মনে করতেন এটাই তাদের ভাগ্য।
২০১৮ সালে সংরক্ষিত নারী আসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচিত করলেন দাকোপের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্লোরিয়া ঝর্ণা সরকারকে। সৃষ্টি কর্তার আর্শিবাদ নেমে এলো দাকোপ এবং পাশ্ববর্তী এলাকায়। নির্বাচিত হয়েই স্বাস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আয়েশী জীবন কাটাননি। দেশের উন্নয়নের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের ঝাণ্ডা হাতে ছুটে বেড়াতে শুরু করেন গ্রাম থেকে গ্রামে।

যে বাজুয়ার মানুষ কোন কল্পনাও করতে পারেনি তাদের পারাপারে পরিকল্পিত খেয়াঘাট, বসার স্থান হবে। আজ সেই দৃষ্টি নন্দন খেয়াঘাট দিয়ে দৈনিক দেড় হাজারের অধিক মানুষ পারাপার করেন। খেয়াঘা, ফেরিঘাটই শুধু নয়, শেখ হাসিনার সহযোগিতায় এবং এমপি গ্লোরিায়া ঝর্ণা সরকারের নেতৃত্বে রাস্তা-ঘাট, জলের কল, বিদ্যুৎ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির, গির্জা সংস্কার-নির্মাণ শুরু করেন। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। সেই দাকোপে ৫০ শয্যার হাসপাতাল ১০০ শয্যায় উন্নত করলেন। ঘোষণা দিলেন সুস্বাস্থ্যই এগিয়ে নিয়ে নেবে বাংলাদেশের উন্নয়ন। স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে দেশের উন্নয়নে নিজেকে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে না। তাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে জোর দিলেন। পরিবেশ রক্ষায় ডাক দিলেন বৃক্ষরোপণের।

প্রধানমন্ত্রী অনুদানে একের পর এক রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা, গির্জা, মন্দির নির্মাণ ও সংস্কার করে চলেন। অসুস্থ মানুষ পেলো প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা। পশুর নদের শাখা নদীর তীর দিয়ে গাড়ি কিছুটা এগিয়ে যেতেই ক্র্যাসে ভর দিয়ে এগিয়ে আসে এক যুবক, বয়স বড়জোর ৩০’র কোটায়। হাত উচিয়ে গাড়ি থামানোর বিনয় অনুরোধ। চোখে মুখে অসহায়ত্ব স্পষ্ট। গাড়ি থেমে গেল। এগিয়ে আসলো যুবক। সড়ক দূর্ঘটনায় ডান পায়ের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। অপারেশনের জন্য আগেও একবার অর্থ সহায়তা পেয়েছেন। ভেঙ্গে যাওয়া স্থানে বসানো প্লেট খোলার সময় এসে গেছে। কিন্তু অর্থের অভাবে তা পারছেন না।

সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত যুবককে আগেও চিকিৎসার জন্য অর্থ সহায়তা পেয়েছেন, তা দিয়ে চিকিৎসা করিয়ে িএখন অনেকটা সুস্থ, এখন তিনি চিকিৎসার জন্য আরও অর্থ চান, চোখের কোণো চিকচিক করে ওঠে যুবকের। আগে কারো এমনি কথা বলার কেউ ছিল না।
এরই মধ্যে দিদির গাড়ির চারদিকে এলাকাবাসীর হাসিমুখ। দাকোপের মানুষের কাছে বড়ই আপন তিনি। কেউ দিদি কেউ আপা বলে ঘিরে ধরেন তাকে। বিরক্তহীন মুখে হাসি ছড়িয়ে গাড়ি থেকে নেমে তাদের সঙ্গে মিশে যান। মানুষের এমনি ভালোবাসা অর্জন করাটা সৌভাগ্যের। গ্লোরিয়া ঝর্ণ সরকার তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। মানুষের ভালোবাসায় আজ তিনি সফলতার সিঁড়ি ছুয়েছেন। বলেন, আমার অনুপ্রেরণা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পথে পথে শেখ হাসিনার জন্য এলাকাবাসীর দোয়া চেয়ে বলেন, আজ প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা না পেলে আপনাদের এলাকার উন্নয়ন করা সম্ভব হতো না। সহজ-সরল মানুষগুলোর নির্মল হাসিমুখের আবদার, দিদি আপনাকেই আমরা চাই। আপনার কাছে আমাদের সুখ-দুঃখের কথা অবলিলায় বলতে পারি। আপনি যে আমাদের ভরসার স্থল। সাধ্যানুযায়ী অর্থ সাহায্য দিতে দিতে এগুতে হয় তাকে।

একদিন নিভৃত গ্রামের এই মানুষগুলো চিন্তাও করতে পারেনি, তাদের গ্রামে পিচঢালা পথ হবে, বিদ্যুতের আলোতে ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করবে। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যাবে। আজ তারা গর্বিত। তাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাস্তা, বিদ্যুৎ, স্কুল, মসজিদ, মন্দির, গির্জা করে দিয়েছেন।
সকালে বাইরে বেরুনোর তাড়া। বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দুরে একটি স্কুলের ম্যানিজিং কমিটির সভাপতি তিনি। সেখানের বেশ কয়েকজন পিছিয়ে পড়া পরিবারের স্কুল পড়ুয়া মেয়েদের জন্য নতুন পোষাক নিয়ে এসেছেন। মিটিংয়ের পাশাপাশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। একাধিক জায়গায় যেতে হবে তাকে।

কিন্তু সাজসকালেই বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষ বাড়িতে এসে অপেক্ষা করছেন। দিদির সাক্ষাত চান তরা। এরমধ্যে একজন ক্যান্সার রোগীও রয়েছেন। উপস্থিত সবাইকে পেপে, চা দেওয়া হলো। ঘর থেকে বেড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলেন। অনেককে প্রয়োজন মাফিক অর্থ সহায়তা দেন। সময় নেই, বিভিন্ন স্থান থেকে একের পর এক কল আসছে। উপস্থিত মানুষদের এটা চাই, ওটা লাগবে, কারো স্বজন হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে, কেউ হাত বাড়িয়ে চাকরীর ব্যবস্থা করে দেবার আকুতি জানান। এ অবস্থায় গাড়িতে এক পা দিয়েও বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলতে হয়।

আকাশের ঘন মেঘের বেলা। মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বেশ কিছুদিন ধরেই ভারী বর্ষণ হচ্ছে। কখন যে ঝুপঝাপ বৃষ্টি ঝরবে তার নিশ্চয়তা নেই। অবশেষে ঘন্টাখানেক এমন দরবার করে গাড়িতে ওঠে বসেন। পাকা পথ ধরে এগিয়ে যায় গাড়ি, কিন্তু মোড়ে মোড়ে থামতেই হয়। মানুষগুলো অনেক আশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ স্রেফ কুশল বিনিময় করছেন, কেউবা অসুস্থ ব্যক্তির জন্য সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে।

কোন জনপ্রতিনিধির বেলায় এমনটি দেখার ভাগ্য হয়নি। পথে ঘন্টা দুয়েক ব্যয়ের পর অবশেষে বুড়িরডাবুর এইচএসডিপি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পৌঁছানো গেল। এই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি গ্লোরিয়া ঝর্ণা সরকার এমপি। মিটিং শেষে মেয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন জামা এবং স্কুলে বেশ কয়েটি স্কুল ব্যাগ বিতরণ করেন। এসময় শিক্ষার্থীদের বৃক্ষরোপন, মাছ চাষ এবং স্কুল জুতা বানানোর প্রশিক্ষণ নেবার পরামর্শ দেন। এজন্য নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থের যোগানের আশ্বাস দেন। তার এই আশ্বাসে মেয়ে পড়ুয়াদের চোখে-মুখে প্রত্যাশা ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।




















