জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ ও ধারাবাহিক পররাষ্ট্রনীতি নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট কূটনীতিক, রাজনীতিক ও গবেষকেরা। তারা মনে করেন, বৈদেশিক নীতি কোনো দলীয় স্বার্থের বিষয় নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মর্যাদার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। রাজনৈতিক ঐক্য ও জনগণের সমর্থন ছাড়া শক্তিশালী ও কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়, যা বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বৈদেশিক নীতি, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক সম্পর্ক’ শীর্ষক নীতি সংলাপে বক্তারা এসব মতামত তুলে ধরেন। সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সিজিএস সভাপতি জিল্লুর রহমান।
সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত মাল্টি-পোলার কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সব প্রধান শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য। তিনি বলেন, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যা দেশের সামরিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে। জনগণের শক্ত সমর্থন থাকলে সরকার পররাষ্ট্রনীতিতে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আমেনা মহসিন পররাষ্ট্রনীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও ভিসা-সংক্রান্ত সংকট উদ্বেগজনক এবং এসব বিষয়ে পরবর্তী সরকারকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। ভবিষ্যতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে রাজনীতিকীকরণ থেকে মুক্ত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে কূটনীতির গুরুত্ব বেড়েছে এবং বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান একে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করেছে। ভারতঘেঁষা সীমান্ত, অভিন্ন নদী ও পরিবেশগত নির্ভরতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে জটিল ও সংবেদনশীল করে তুলেছে। তিনি কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স জানান, বামপন্থী দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জনগণকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উন্নয়নশীল ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে সংহতি জোরদারের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত কামরুল আহসান বলেন, শক্তিশালী জনভিত্তি ছাড়া কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি কার্যকর হতে পারে না। অন্যদিকে গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
সভাপতির বক্তব্যে জিল্লুর রহমান বলেন, বৈদেশিক নীতি নিয়ে আলাদা সংস্কার উদ্যোগের অভাব রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদারে আরও সুসংহত ও ঐক্যবদ্ধ কৌশল গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।