ঢাকা ০৩:৪৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বাংলাদেশে ‘বিধর্মী সংসদ সদস্য থাকতে পারে না’ জামায়াতের জনসভা ঘিরে বিতর্ক তায়কোয়ানডো প্রতিযোগিতা সিনিয়রে আনসার, জুনিয়রে বিকেএসপি চ্যাম্পিয়ন কোকোর ১১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বনানীতে কবর জিয়ারত করলেন তারেক রহমান অনিশ্চয়তায় অমর একুশে বইমেলা, পহেলা ফেব্রুয়ারিতে একদিনের প্রতীকী আয়োজন দেশপ্রেমের নামে গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠক করছে তারা: চরমোনাই পীর ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার দৌরাত্ম্য: সড়কে  বিশৃঙ্খলা, দুর্ঘটনা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়েছে ফরিদপুরে অবৈধ অস্ত্র কারখানায় সেনা অভিযান, একাধিক সরঞ্জাম উদ্ধার পশ্চিমবঙ্গের মুড়িগঙ্গা নদীতে ডুবে গেল বাংলাদেশি জাহাজ, উদ্ধার ১২ জন অস্ট্রেলিয়ায় হাঙরের কামড়ে আহত কিশোরের মৃত্যু বাংলাদেশ ক্রিকেট ইস্যুতে মন্তব্যের পর ভারতে মুসলিম অভিনেতা কেআরকের গ্রেফতার, বিতর্ক তুঙ্গে

Restoration : পুনঃসংস্থাপন

ড. বিরাজলক্ষী ঘোষ
  • আপডেট সময় : ১০:১০:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩ অক্টোবর ২০২১ ৭৪১ বার পড়া হয়েছে
ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

‘কলকাতা পৌরনিগম নজির গড়ে ২৫ বছরের পুরোনো উপড়ে পড়া ৩০০টি গাছের মধ্যে শহরে প্রায় ২৮৫টি গাছকে পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে নতুন জীবন ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে’

পুরোনো মহীরুহগুলো যখন ভেঙে পড়ে, তখন পুনঃসংস্থাপন করার জন্য গাছগুলির ডালপালা কেটে ছোটো করা হয়। এরপর ক্রেনের সাহায্যে মাটি থেকে তুলে নিয়ে অন্য জায়গায় স্থাপন করা

হয় এই গাছগুলো। যেসব অংশে ডালপালা কেটে দেওয়া হয়েছে, গাছের সেই জায়গায়গুলোতে ক্ষত তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে । ডালপালা ছাঁটা জায়গাগুলিতে ছত্রাক তৈরিরও আশঙ্কা থেকে

যায়। এ কারণে ১৫ দিন পর পর এই বৃক্ষগুলিকে চিকিৎসকরা পরীক্ষা করেন দেখেন। পুষ্টির অভাব দূর করতে প্রয়োজনীয় জৈবসার, জল, খাদ্যসামগ্রী ওষুধ দেওয়া হয়। এভাবেই গাছ

গুলোকে পুনর্জীবন দানের চেষ্টা করা হয়। এটি (Restoration) বৃক্ষের পুনসংস্থাপন নামে পরিচিত।

কোচ বিহারের রাজাদের আমলে এখানের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্য বীথিকা নির্মিত হয়েছিল মহারাজদের উদ্যোগে। সে প্রায় দেড়শো দু’শো বছর আগেকার কথা। এখনও সেই ‘বনবিথী’ বিরাজমান। এখানের একটি প্রাচীন তল্লি বা ক্ষীরিশ গাছ গেল জুলাই উপড়ে পড়ে।

বৃহৎ ড্রেন নির্মান ও মাটির তলা দিয়ে বৈদ্যুতিক সংযোগের কাজ করার কারণে এর শিকড় কাটা পড়ে। এটি কোচবিহার স্টেশন রোডের কিছু দূরে ঐতিহ্যবাহী রাস্তা নরণারায়ন রোডের উপর

অবস্থিত। ক’দিন টানা বৃষ্টির ফলে মাটি আলগা হতেই গাছ ভার সামলাতে না পেরে হেলে পড়েছে প্রাচীন এই গাছটি। স্থানীয় পরিবেশ প্রেমী মানুষ জনের আবেদনে সাড়া দিয়ে বনবিভাগ, SDO

এবং পৌরসভার উদ্যোগে গাছটি প্রতিস্থাপন /পুনঃসংস্থাপন করার চেষ্টা চালিয়েছেন। এর জন্য শিলিগুড়ি থেকে আনার চেষ্টা করা হয়েছে আশি টনের একটি JCB। গাছটি সত্যি প্রতিস্থাপন করা গেলে পৃথিবীর ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম বৃক্ষ পুনঃসংস্থাপন হতো।

প্রথমটি হয়ছিল আমেরিকায়। একটি বৃহত্তম ও প্রাচীনতম ওক গাছের প্রতিস্থাপন। প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে কোনো কারণে এখানকার প্রাচীন চারটি গাছ কাটার কথা হলে স্থানীয় পরিবেশ প্রেমী মানুষদের চেষ্টায় তা বিফল হয়।

তাছাড়া ইটিভি বাংলার রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে পাওয়া যায় কলকাতা শহরে এই বৃক্ষ পুনঃসংস্থাপনের দৃষ্টান্ত। দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরে নর্দান পার্কে ১০০ বছরের পুরোনো

বটগাছটি বহু ঘটনার সাক্ষী। বটগাছটিকে ঘিরে রয়েছে স্থানীয় মানুষের আবেগ। এলাকার বহু প্রজন্মের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে বটগাছটিকে ঘিরে। ছোটোরা এই গাছ তলায় খেলা করতে করতে

বড় হয়েছে। প্রবীণ নাগরিকরা বিকেলে এই গাছের তলায় বসে দু’দন্ড প্রশান্তি নিয়ে সময় কাটিয়েছেন। গেল ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আমফানের দাপটে তছনছ হয়ে যায় কলকাতা শহর। ঝড়ের

দাপটে সেই রাতে উপরে পড়ে শত বছরের এই গাছটিও। ইতিহাসের পতনে এলাকার মানুষ শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। প্রাণ বাঁচাতে পুনঃসংস্থাপন করা হয় গাছটিকে। বহু চেষ্টার পর ক্রমশ

নতুনরূপে প্রাণ ফিরে পেয়েছে কালের স্বাক্ষী বটগাছটি। এরকম প্রায় ১৬০০ গাছ আমফানের দাপটে ভেঙে পড়েছিল শহরে। যার মধ্যে অনেক পুরোনো গাছ রয়েছে, যেগুলোর বয়সও ২৫

পেরিয়ে গিয়েছে। বট, অশ্বত্থ, কৃষ্ণচূড়া, বকুল বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ভেঙে পড়েছিল সেই ভয়ংকর ঝড়ের দাপটে। কলকাতার ভূগর্ভস্থে বিভিন্ন নিকাশি নালা, জলের পাইপ, বৈদ্যুতিক ইউটিলিটির কারণে গাছের শিকড় মাটির গভীরে যাওয়া সম্ভব হয় না বলে গোড়া দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে কলকাতা পৌরনিগম নজির গড়ে ২৫ বছরের পুরোনো উপড়ে পড়া ৩০০টি গাছের মধ্যে শহরে প্রায় ২৮৫টি গাছকে পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে নতুন জীবন ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

ভবানীপুর (৭০ নম্বর ওয়ার্ড) এলাকায় সবথেকে বেশি সংখ্যক গাছ পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। এখানের কো-অর্ডিনেটর অসীম বসু কুড়িটি বৃক্ষকে পুনঃস্থাপন করেন। সেই কুড়িটি গাছই ফিরে

পায় নতুন জীবন। নর্দান পার্ক, রয় স্ট্রিট, জাস্টিস চন্দ্র মাধবপুর রোড, চক্রবেরিয়া রোড, রবীন্দ্র সরোবর, সুভাষ সরোবর এলাকায় উপড়ে পড়া গাছ গুলিকে পুনঃস্থাপন করা হয়। সুভাষ সরোবরে

৩৭টি গাছ পুনঃস্থাপন করা হলেও ৩৩টি গাছ নতুন জীবন নিয়ে মাথা উচু করে দাঁড়িয়েছে। রবীন্দ্র সরোবরে ১৪৪টি গাছকে পুনঃস্থাপন করা হয়, যার মধ্যে ১১১টি পুনর্জীবন পেয়েছে। যাদবপুর

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ৬৫টি বৃক্ষকে পুনঃস্থাপন করেছে। তার মধ্যে সব ক’টিই পুনর্জীবন পেয়েছে।

কলকাতা পৌরনিগমের মুখ্য প্রশাসক ফিরহাদ হাকিম জানিয়েছেন, সঠিক সময়ে গাছগুলিকে পুনঃস্থাপন করা এবং সঠিক পরিচর্যায় গাছগুলি নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে। প্রকৃতিও সাহায্য

করেছে গাছগুলিকে জীবন ফিরিয়ে দিতে। এবছর ভালো বৃষ্টি হওয়ার কারণে গাছের গোড়া মজবুত হয়েছে। নিয়মিত যত্ন নেওয়া হয়েছে এই গাছগুলোর। এটা খুবই আনন্দের কথা

শহরবাসীর কাছে যে, পুরানো গাছগুলো জীবন ফিরে পেয়েছে । আগামী দিনে আরও গাছকে পুনঃসংস্থাপন পরিকল্পনা রয়েছে। পুনঃসংস্থাপন গাছগুলি যাতে সঠিকভাবে বেড়ে ওঠে তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে কলকাতা পৌরনিগম। পুনর্জীবন পেয়েছে ২৮৫টি গাছ।

কলকাতা পৌরনিগমের প্রশাসক মণ্ডলীর সদস্য ও উত্তর বিভাগের প্রধান দেবাশিস কুমারের মতে ‘একটি ২০-২৫ বছরের পুরোনো গাছ যে পরিমাণে অক্সিজেন তৈরি করে ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে, একটা নতুন চারা গাছ সেই পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন তৈরি করতে পারে না’

বৃক্ষরোপণ করলেই অক্সিজেনের মাত্রা বেড়ে যাবে ও কার্বন ডাই অক্সাইড মাত্রা কমবে এমন কিন্তু নয়। বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক রাখার জন্য পুরোনো গাছকে বাঁচিয়ে রেখে আরও বেশি করে নতুন বৃক্ষরোপণ করতে হবে। তবেই দূষণের মাত্রা কমবে।

ঘূর্ণিঝড় আমফানের দাপটে গাছ নষ্ট হওয়ায় বাতাসে অক্সিজেনের ঘাটতি হয়েছে। ফলে শহরে দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে আদিম ও পুরোনো গাছগুলিকে যেমন সংরক্ষণ

করতে হবে, সেই সঙ্গে বাড়াতে হবে নতুন গাছের সংখ্যা। তাই শহরজুড়ে ব্যাপক ভাবে বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে। এমন একটি সংস্থাতে নিয়োগ করা হয়েছে, যারা আগামী দু-বছর এই বৃক্ষগুলিকে পরিচর্যা করবে। ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের (কাউন্সিলর) ওয়ার্ড কো-অডিনেটর অসীম বসুর কথা

অনুযায়ীএলাকার মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১০০ বছরের পুরোনো বটবৃক্ষটি। এই গাছটিকে বাঁচাতে পেরে সত্যিই ভালো লাগছে। নিয়মিতভাবে গাছগুলিকে দেখভাল করা হচ্ছে।

প্রয়োজনীয় সার, মাটি, জল, ওষুধ দেওয়া হচ্ছে এই গাছগুলো রক্ষায়। ঝড়ের চার মাস পর গাছগুলি ছোটো ছোটো সবুজ পাতায় ভরে উঠেছে ।

সরকার পক্ষ ও সকল পরিবেশ প্রেমী মানুষদের আগামী দিনে বৃক্ষ পুনঃসংস্থাপনের পক্ষে সওয়াল করার আহ্বান জানাই। তাহলে আমরা অনেক পুরানো গাছ বাঁচাতে সক্ষম হবো।
তথ্য ঋণ: হৃষিকল্প পাল (কোচবিহার আর্কাইভ) প্রহর, ইটিভি বাংলা

(ড. বিরাজলক্ষী ঘোষ : একাধারে শিক্ষক, পরিবেশ সংগঠক, সমাজচিন্তক এবং সংগঠক। বিশেষ করে শিক্ষা প্রসারের চিন্তার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তার অদম্য চেষ্টা রয়েছে। তার ভাবনা জুড়ে রয়েছে, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের শিক্ষা ও সাবলম্বি করে তোলার ভাবনা। সেই ভাবনা থেকেই নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন বন্ধুবাৎসল এই মানুষ। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ড. বিরাজলক্ষী ঘোষ আগামীর দিনগুলোতে একটি বিষমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার সাধ্যানুযায়ী নিবেদীত। তিনি মনে করেন, ‘হাত বাড়ালেই বন্ধু, পা বাড়ালেই পথ।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

Restoration : পুনঃসংস্থাপন

আপডেট সময় : ১০:১০:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩ অক্টোবর ২০২১

‘কলকাতা পৌরনিগম নজির গড়ে ২৫ বছরের পুরোনো উপড়ে পড়া ৩০০টি গাছের মধ্যে শহরে প্রায় ২৮৫টি গাছকে পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে নতুন জীবন ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে’

পুরোনো মহীরুহগুলো যখন ভেঙে পড়ে, তখন পুনঃসংস্থাপন করার জন্য গাছগুলির ডালপালা কেটে ছোটো করা হয়। এরপর ক্রেনের সাহায্যে মাটি থেকে তুলে নিয়ে অন্য জায়গায় স্থাপন করা

হয় এই গাছগুলো। যেসব অংশে ডালপালা কেটে দেওয়া হয়েছে, গাছের সেই জায়গায়গুলোতে ক্ষত তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে । ডালপালা ছাঁটা জায়গাগুলিতে ছত্রাক তৈরিরও আশঙ্কা থেকে

যায়। এ কারণে ১৫ দিন পর পর এই বৃক্ষগুলিকে চিকিৎসকরা পরীক্ষা করেন দেখেন। পুষ্টির অভাব দূর করতে প্রয়োজনীয় জৈবসার, জল, খাদ্যসামগ্রী ওষুধ দেওয়া হয়। এভাবেই গাছ

গুলোকে পুনর্জীবন দানের চেষ্টা করা হয়। এটি (Restoration) বৃক্ষের পুনসংস্থাপন নামে পরিচিত।

কোচ বিহারের রাজাদের আমলে এখানের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্য বীথিকা নির্মিত হয়েছিল মহারাজদের উদ্যোগে। সে প্রায় দেড়শো দু’শো বছর আগেকার কথা। এখনও সেই ‘বনবিথী’ বিরাজমান। এখানের একটি প্রাচীন তল্লি বা ক্ষীরিশ গাছ গেল জুলাই উপড়ে পড়ে।

বৃহৎ ড্রেন নির্মান ও মাটির তলা দিয়ে বৈদ্যুতিক সংযোগের কাজ করার কারণে এর শিকড় কাটা পড়ে। এটি কোচবিহার স্টেশন রোডের কিছু দূরে ঐতিহ্যবাহী রাস্তা নরণারায়ন রোডের উপর

অবস্থিত। ক’দিন টানা বৃষ্টির ফলে মাটি আলগা হতেই গাছ ভার সামলাতে না পেরে হেলে পড়েছে প্রাচীন এই গাছটি। স্থানীয় পরিবেশ প্রেমী মানুষ জনের আবেদনে সাড়া দিয়ে বনবিভাগ, SDO

এবং পৌরসভার উদ্যোগে গাছটি প্রতিস্থাপন /পুনঃসংস্থাপন করার চেষ্টা চালিয়েছেন। এর জন্য শিলিগুড়ি থেকে আনার চেষ্টা করা হয়েছে আশি টনের একটি JCB। গাছটি সত্যি প্রতিস্থাপন করা গেলে পৃথিবীর ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম বৃক্ষ পুনঃসংস্থাপন হতো।

প্রথমটি হয়ছিল আমেরিকায়। একটি বৃহত্তম ও প্রাচীনতম ওক গাছের প্রতিস্থাপন। প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে কোনো কারণে এখানকার প্রাচীন চারটি গাছ কাটার কথা হলে স্থানীয় পরিবেশ প্রেমী মানুষদের চেষ্টায় তা বিফল হয়।

তাছাড়া ইটিভি বাংলার রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে পাওয়া যায় কলকাতা শহরে এই বৃক্ষ পুনঃসংস্থাপনের দৃষ্টান্ত। দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরে নর্দান পার্কে ১০০ বছরের পুরোনো

বটগাছটি বহু ঘটনার সাক্ষী। বটগাছটিকে ঘিরে রয়েছে স্থানীয় মানুষের আবেগ। এলাকার বহু প্রজন্মের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে বটগাছটিকে ঘিরে। ছোটোরা এই গাছ তলায় খেলা করতে করতে

বড় হয়েছে। প্রবীণ নাগরিকরা বিকেলে এই গাছের তলায় বসে দু’দন্ড প্রশান্তি নিয়ে সময় কাটিয়েছেন। গেল ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আমফানের দাপটে তছনছ হয়ে যায় কলকাতা শহর। ঝড়ের

দাপটে সেই রাতে উপরে পড়ে শত বছরের এই গাছটিও। ইতিহাসের পতনে এলাকার মানুষ শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। প্রাণ বাঁচাতে পুনঃসংস্থাপন করা হয় গাছটিকে। বহু চেষ্টার পর ক্রমশ

নতুনরূপে প্রাণ ফিরে পেয়েছে কালের স্বাক্ষী বটগাছটি। এরকম প্রায় ১৬০০ গাছ আমফানের দাপটে ভেঙে পড়েছিল শহরে। যার মধ্যে অনেক পুরোনো গাছ রয়েছে, যেগুলোর বয়সও ২৫

পেরিয়ে গিয়েছে। বট, অশ্বত্থ, কৃষ্ণচূড়া, বকুল বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ভেঙে পড়েছিল সেই ভয়ংকর ঝড়ের দাপটে। কলকাতার ভূগর্ভস্থে বিভিন্ন নিকাশি নালা, জলের পাইপ, বৈদ্যুতিক ইউটিলিটির কারণে গাছের শিকড় মাটির গভীরে যাওয়া সম্ভব হয় না বলে গোড়া দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে কলকাতা পৌরনিগম নজির গড়ে ২৫ বছরের পুরোনো উপড়ে পড়া ৩০০টি গাছের মধ্যে শহরে প্রায় ২৮৫টি গাছকে পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে নতুন জীবন ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

ভবানীপুর (৭০ নম্বর ওয়ার্ড) এলাকায় সবথেকে বেশি সংখ্যক গাছ পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। এখানের কো-অর্ডিনেটর অসীম বসু কুড়িটি বৃক্ষকে পুনঃস্থাপন করেন। সেই কুড়িটি গাছই ফিরে

পায় নতুন জীবন। নর্দান পার্ক, রয় স্ট্রিট, জাস্টিস চন্দ্র মাধবপুর রোড, চক্রবেরিয়া রোড, রবীন্দ্র সরোবর, সুভাষ সরোবর এলাকায় উপড়ে পড়া গাছ গুলিকে পুনঃস্থাপন করা হয়। সুভাষ সরোবরে

৩৭টি গাছ পুনঃস্থাপন করা হলেও ৩৩টি গাছ নতুন জীবন নিয়ে মাথা উচু করে দাঁড়িয়েছে। রবীন্দ্র সরোবরে ১৪৪টি গাছকে পুনঃস্থাপন করা হয়, যার মধ্যে ১১১টি পুনর্জীবন পেয়েছে। যাদবপুর

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ৬৫টি বৃক্ষকে পুনঃস্থাপন করেছে। তার মধ্যে সব ক’টিই পুনর্জীবন পেয়েছে।

কলকাতা পৌরনিগমের মুখ্য প্রশাসক ফিরহাদ হাকিম জানিয়েছেন, সঠিক সময়ে গাছগুলিকে পুনঃস্থাপন করা এবং সঠিক পরিচর্যায় গাছগুলি নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে। প্রকৃতিও সাহায্য

করেছে গাছগুলিকে জীবন ফিরিয়ে দিতে। এবছর ভালো বৃষ্টি হওয়ার কারণে গাছের গোড়া মজবুত হয়েছে। নিয়মিত যত্ন নেওয়া হয়েছে এই গাছগুলোর। এটা খুবই আনন্দের কথা

শহরবাসীর কাছে যে, পুরানো গাছগুলো জীবন ফিরে পেয়েছে । আগামী দিনে আরও গাছকে পুনঃসংস্থাপন পরিকল্পনা রয়েছে। পুনঃসংস্থাপন গাছগুলি যাতে সঠিকভাবে বেড়ে ওঠে তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে কলকাতা পৌরনিগম। পুনর্জীবন পেয়েছে ২৮৫টি গাছ।

কলকাতা পৌরনিগমের প্রশাসক মণ্ডলীর সদস্য ও উত্তর বিভাগের প্রধান দেবাশিস কুমারের মতে ‘একটি ২০-২৫ বছরের পুরোনো গাছ যে পরিমাণে অক্সিজেন তৈরি করে ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে, একটা নতুন চারা গাছ সেই পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন তৈরি করতে পারে না’

বৃক্ষরোপণ করলেই অক্সিজেনের মাত্রা বেড়ে যাবে ও কার্বন ডাই অক্সাইড মাত্রা কমবে এমন কিন্তু নয়। বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক রাখার জন্য পুরোনো গাছকে বাঁচিয়ে রেখে আরও বেশি করে নতুন বৃক্ষরোপণ করতে হবে। তবেই দূষণের মাত্রা কমবে।

ঘূর্ণিঝড় আমফানের দাপটে গাছ নষ্ট হওয়ায় বাতাসে অক্সিজেনের ঘাটতি হয়েছে। ফলে শহরে দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে আদিম ও পুরোনো গাছগুলিকে যেমন সংরক্ষণ

করতে হবে, সেই সঙ্গে বাড়াতে হবে নতুন গাছের সংখ্যা। তাই শহরজুড়ে ব্যাপক ভাবে বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে। এমন একটি সংস্থাতে নিয়োগ করা হয়েছে, যারা আগামী দু-বছর এই বৃক্ষগুলিকে পরিচর্যা করবে। ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের (কাউন্সিলর) ওয়ার্ড কো-অডিনেটর অসীম বসুর কথা

অনুযায়ীএলাকার মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১০০ বছরের পুরোনো বটবৃক্ষটি। এই গাছটিকে বাঁচাতে পেরে সত্যিই ভালো লাগছে। নিয়মিতভাবে গাছগুলিকে দেখভাল করা হচ্ছে।

প্রয়োজনীয় সার, মাটি, জল, ওষুধ দেওয়া হচ্ছে এই গাছগুলো রক্ষায়। ঝড়ের চার মাস পর গাছগুলি ছোটো ছোটো সবুজ পাতায় ভরে উঠেছে ।

সরকার পক্ষ ও সকল পরিবেশ প্রেমী মানুষদের আগামী দিনে বৃক্ষ পুনঃসংস্থাপনের পক্ষে সওয়াল করার আহ্বান জানাই। তাহলে আমরা অনেক পুরানো গাছ বাঁচাতে সক্ষম হবো।
তথ্য ঋণ: হৃষিকল্প পাল (কোচবিহার আর্কাইভ) প্রহর, ইটিভি বাংলা

(ড. বিরাজলক্ষী ঘোষ : একাধারে শিক্ষক, পরিবেশ সংগঠক, সমাজচিন্তক এবং সংগঠক। বিশেষ করে শিক্ষা প্রসারের চিন্তার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তার অদম্য চেষ্টা রয়েছে। তার ভাবনা জুড়ে রয়েছে, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের শিক্ষা ও সাবলম্বি করে তোলার ভাবনা। সেই ভাবনা থেকেই নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন বন্ধুবাৎসল এই মানুষ। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ড. বিরাজলক্ষী ঘোষ আগামীর দিনগুলোতে একটি বিষমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার সাধ্যানুযায়ী নিবেদীত। তিনি মনে করেন, ‘হাত বাড়ালেই বন্ধু, পা বাড়ালেই পথ।’