ঢাকা ০৪:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাসহ বেনাপোলে এক বাংলাদেশি পাসপোর্ট যাত্রী আটক বস্তিবাসীদের উন্নত শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার আশ্বাস তারেক রহমানের চাপ তৈরি করে ভারতে খেলাতে বাধ্য করা যাবে না চানখাঁরপুল মামলার রায় ২৬ জানুয়ারি: মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার অপেক্ষায় দেশ ইরানে হামলা নিয়ে আবারও কঠোর হুঁশিয়ারি নেতানিয়াহুর আমিরাতের প্রেসিডেন্টকে ঐতিহ্যবাহী শুভেচ্ছায় স্বাগত জানালেন মোদি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় শহীদ জিয়াউর রহমানের জন্মদিন উদ্যাপন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ আগুন, পুড়ে ছাই ৪০০ ঘর, শত শত পরিবার আশ্রয়হীন আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি পবিত্র শবে বরাত শার্শায় র‌্যাবের অভিযানে ২৯৭০ পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারি আটক

digestion ‘হজমি’

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:১৫:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জুন ২০২৩ ৪২৭ বার পড়া হয়েছে
ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

অনুরাধা দে

ছোটোবেলা থেকেই হজমি খেতে খুব খুব ভালবাসি। টক মিষ্টি হজমি দেখলেই চোখ চকচক করে উঠতো। আর সবুজ ,কালো কারেন্ট নুন জিভের তলায় কে কতক্ষণ রেখে দিতে পারে তার তো প্রতিযোগিতা হতো স্কুলের বন্ধুদের মধ্যে। জিভের তলা জ্বালা করতো,সাদা হয়ে যেতো তবু হার মানিনি কখনো। হজমিওলা তখন ছিল আমাদের খুব প্রিয় মানুষ। একদিন না বসলে দিনটা পানসে হয়ে যেতো। মনখারাপেরা ভিড় করে অঙ্ক ভুল করে দিতো।মায়ের কাছে শুনেছি আমার সদ্যোজাত ভাইকে দেখে আমি বলেছিলাম “ওমা!! এ তো হজমিগুলি!!” তা হজমি প্রীতি যখন স্কুলে পড়তাম তখন ও যায়নি। স্কুলের দরজার সামনে একজন হজমিওলা বসতেন। প্রায় রোজ টিফিনের পর মাসীকে দিয়ে তার কাছ থেকে হজমি এনে অফ পিরিয়ডে তারিয়ে তারিয়ে খেতাম সবাই মিলে। পড়ানোর একঘেয়েমি আর ক্লান্তি একনিমেষে হতো উধাও। সেই হজমি ওরা আর নেই আমাদের মধ্যে।

গত বুধবার ২৩.৬.২০২৩ এ রবীন্দ্রসদন থেকে মেট্রোয় উঠব বলে যাচ্ছি হঠাৎ চোখ পড়ল স্টেশনের ঠিক আগে বাঁদিকে একটা পান বিড়ি সিগারেটের দোকানের দিকে। বয়ামে চকোলেট ,লজেন্স রয়েছে দেখলাম। ওমা! তারপর দেখি হজমির বয়াম!! ব্যস্ দাঁড়িয়ে পড়লাম। বললাম “একটা হজমি দেখি।” দোকানদার হজমি হাতে দিতে সঙ্গে সঙ্গে মুখে চালান করে দিলাম। নাহ্, ছোটোবেলার সেই লাফিয়ে ওঠার মতো টক নয় কেমন চিনি চিনি মিষ্টি।


বললাম “না,নেবো না।” আমার স্বামী সঙ্গে সঙ্গে ১টাকা( হজমির দাম) দোকানদারকে দিতে গেলে তিনি বললেন “লাগবে না।” আমি ততক্ষণে ভেতরের টক স্বাদ পেয়ে গেছি। তবু ভাবছিলাম এই বয়সে চিনি দেওয়া হজমি খাব? পাপ হবে না তো!!! কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল … না না, চাখবো বলে নিয়েছি আর নেবো না সেটা এই বয়সে ঠিক হবে না। ইশারায় স্বামী কে বললাম ১০টাকার হজমি নিতে। সেইমতো তাকে ১০টাকা দিয়ে বলা হল ৯ টা হজমি দিতে।

এইবার অবাক হবার পালা। কিছুতেই তিনি রাজি হলেন না ৯ টা দিতে। আমার স্বামী বললেন “১টা তো নিয়ে খেয়েছে আর ৯ টা দিলেই তো ১০টাকা দাম হয়।” দোকানদার মৃদু হেসে বললেন “না,ওটা আমি দিয়েছি।” আমার স্বামী বললেন “না, তাকি হয় নাকি!!”

দোকানদার একটুও গলা না তুলে মৃদু হেসে অথচ দৃঢ় স্বরে এক ই কথা বললেন”ওটা আমি দিয়েছি।” বলে ১০টা হজমি ঠোঙায় ভরে দিলেন।  এতক্ষণ আমি এ ব্যাপারে নীরব ছিলাম দুটো কারণে, এক হলো আমি চোখটা আধখানা বন্ধ করে অমৃত আস্বাদন করছিলাম আর দুই হলো নিজের কানকে , বুদ্ধিকে , মনকে জিজ্ঞেস করছিলাম “তুমি যাহা শুনিতেছো তাহা কি সত্যি!!!! ” ঘোর কাটতেই বলে উঠলাম”না,ওপরটা চিনি চিনি কিন্তু ভেতরটা তেঁতুলের টক। বেশ ভালো লাগলো খেতে। প্রথমে বুঝতে পারিনি।”

সেই একই রকম হেসে দোকানদার বললেন “আমি ও তাই ভাবছিলাম ।”

ভেবলে যাওয়া কাকে বলে সেদিন সেইসময় বুঝলাম আমরা দুজন। জাত ধর্ম কিছুই মেলে না আমাদের সঙ্গে। সম্ভবত বিহারী। হয়তো সামান্য লেখাপড়া শিখেছেন। কিন্তু কীসের জোরে ১টাকা নিচ্ছেন না? উনি তো সমাজসেবা করতে বসেননি!!! উত্তর পাইনি। তবে সেই মুহুর্তেই তাকে বলে এসেছি “যখন ই এদিকে আসবো তোমার থেকে হজমি নিয়ে যাবো।” বন্ধুকে কেউ আপনি বলে নাকি!!! সে মৃদু হেসে ঘাড় নেড়ে বলেছে “আচ্ছা।” আবার ২৪ তারিখ অনেক হজমি কেনা হয়েছে ওর কাছ থেকে। যতদিন বেঁচে থাকব কিনবো।

এই মূল্যবোধের অবক্ষয়ের দিনে মানবিকতা যে এখনো এভাবে বেঁচে আছে ভাবতে খুব ভালো লাগছে। যেখানে এক ইঞ্চি নয় একটা নখের ডগায় যতটুকু জায়গা হয় ততটুকুও কেউ ছেড়ে দেয় না । পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবার দৌড়ে যেখানে মনুষ্যত্ব হয়েছে মূল্যহীন সেখানে অযাচিত এই প্রীতি প্রমাণ করে দিল “বৃথা আশা মরিতে মরিতেও মরে না।” এমন মানুষ এখনো আছে জাতধর্মবর্ণ নির্বিশেষে যারা মানুষকে ভালবাসে অন্তর থেকে। তাইতো পৃথিবীটা এখনো বাসযোগ্য ।

অনুরাধা দে’র ফেসবুক থেকে

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

digestion ‘হজমি’

আপডেট সময় : ০৮:১৫:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জুন ২০২৩

অনুরাধা দে

ছোটোবেলা থেকেই হজমি খেতে খুব খুব ভালবাসি। টক মিষ্টি হজমি দেখলেই চোখ চকচক করে উঠতো। আর সবুজ ,কালো কারেন্ট নুন জিভের তলায় কে কতক্ষণ রেখে দিতে পারে তার তো প্রতিযোগিতা হতো স্কুলের বন্ধুদের মধ্যে। জিভের তলা জ্বালা করতো,সাদা হয়ে যেতো তবু হার মানিনি কখনো। হজমিওলা তখন ছিল আমাদের খুব প্রিয় মানুষ। একদিন না বসলে দিনটা পানসে হয়ে যেতো। মনখারাপেরা ভিড় করে অঙ্ক ভুল করে দিতো।মায়ের কাছে শুনেছি আমার সদ্যোজাত ভাইকে দেখে আমি বলেছিলাম “ওমা!! এ তো হজমিগুলি!!” তা হজমি প্রীতি যখন স্কুলে পড়তাম তখন ও যায়নি। স্কুলের দরজার সামনে একজন হজমিওলা বসতেন। প্রায় রোজ টিফিনের পর মাসীকে দিয়ে তার কাছ থেকে হজমি এনে অফ পিরিয়ডে তারিয়ে তারিয়ে খেতাম সবাই মিলে। পড়ানোর একঘেয়েমি আর ক্লান্তি একনিমেষে হতো উধাও। সেই হজমি ওরা আর নেই আমাদের মধ্যে।

গত বুধবার ২৩.৬.২০২৩ এ রবীন্দ্রসদন থেকে মেট্রোয় উঠব বলে যাচ্ছি হঠাৎ চোখ পড়ল স্টেশনের ঠিক আগে বাঁদিকে একটা পান বিড়ি সিগারেটের দোকানের দিকে। বয়ামে চকোলেট ,লজেন্স রয়েছে দেখলাম। ওমা! তারপর দেখি হজমির বয়াম!! ব্যস্ দাঁড়িয়ে পড়লাম। বললাম “একটা হজমি দেখি।” দোকানদার হজমি হাতে দিতে সঙ্গে সঙ্গে মুখে চালান করে দিলাম। নাহ্, ছোটোবেলার সেই লাফিয়ে ওঠার মতো টক নয় কেমন চিনি চিনি মিষ্টি।


বললাম “না,নেবো না।” আমার স্বামী সঙ্গে সঙ্গে ১টাকা( হজমির দাম) দোকানদারকে দিতে গেলে তিনি বললেন “লাগবে না।” আমি ততক্ষণে ভেতরের টক স্বাদ পেয়ে গেছি। তবু ভাবছিলাম এই বয়সে চিনি দেওয়া হজমি খাব? পাপ হবে না তো!!! কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল … না না, চাখবো বলে নিয়েছি আর নেবো না সেটা এই বয়সে ঠিক হবে না। ইশারায় স্বামী কে বললাম ১০টাকার হজমি নিতে। সেইমতো তাকে ১০টাকা দিয়ে বলা হল ৯ টা হজমি দিতে।

এইবার অবাক হবার পালা। কিছুতেই তিনি রাজি হলেন না ৯ টা দিতে। আমার স্বামী বললেন “১টা তো নিয়ে খেয়েছে আর ৯ টা দিলেই তো ১০টাকা দাম হয়।” দোকানদার মৃদু হেসে বললেন “না,ওটা আমি দিয়েছি।” আমার স্বামী বললেন “না, তাকি হয় নাকি!!”

দোকানদার একটুও গলা না তুলে মৃদু হেসে অথচ দৃঢ় স্বরে এক ই কথা বললেন”ওটা আমি দিয়েছি।” বলে ১০টা হজমি ঠোঙায় ভরে দিলেন।  এতক্ষণ আমি এ ব্যাপারে নীরব ছিলাম দুটো কারণে, এক হলো আমি চোখটা আধখানা বন্ধ করে অমৃত আস্বাদন করছিলাম আর দুই হলো নিজের কানকে , বুদ্ধিকে , মনকে জিজ্ঞেস করছিলাম “তুমি যাহা শুনিতেছো তাহা কি সত্যি!!!! ” ঘোর কাটতেই বলে উঠলাম”না,ওপরটা চিনি চিনি কিন্তু ভেতরটা তেঁতুলের টক। বেশ ভালো লাগলো খেতে। প্রথমে বুঝতে পারিনি।”

সেই একই রকম হেসে দোকানদার বললেন “আমি ও তাই ভাবছিলাম ।”

ভেবলে যাওয়া কাকে বলে সেদিন সেইসময় বুঝলাম আমরা দুজন। জাত ধর্ম কিছুই মেলে না আমাদের সঙ্গে। সম্ভবত বিহারী। হয়তো সামান্য লেখাপড়া শিখেছেন। কিন্তু কীসের জোরে ১টাকা নিচ্ছেন না? উনি তো সমাজসেবা করতে বসেননি!!! উত্তর পাইনি। তবে সেই মুহুর্তেই তাকে বলে এসেছি “যখন ই এদিকে আসবো তোমার থেকে হজমি নিয়ে যাবো।” বন্ধুকে কেউ আপনি বলে নাকি!!! সে মৃদু হেসে ঘাড় নেড়ে বলেছে “আচ্ছা।” আবার ২৪ তারিখ অনেক হজমি কেনা হয়েছে ওর কাছ থেকে। যতদিন বেঁচে থাকব কিনবো।

এই মূল্যবোধের অবক্ষয়ের দিনে মানবিকতা যে এখনো এভাবে বেঁচে আছে ভাবতে খুব ভালো লাগছে। যেখানে এক ইঞ্চি নয় একটা নখের ডগায় যতটুকু জায়গা হয় ততটুকুও কেউ ছেড়ে দেয় না । পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবার দৌড়ে যেখানে মনুষ্যত্ব হয়েছে মূল্যহীন সেখানে অযাচিত এই প্রীতি প্রমাণ করে দিল “বৃথা আশা মরিতে মরিতেও মরে না।” এমন মানুষ এখনো আছে জাতধর্মবর্ণ নির্বিশেষে যারা মানুষকে ভালবাসে অন্তর থেকে। তাইতো পৃথিবীটা এখনো বাসযোগ্য ।

অনুরাধা দে’র ফেসবুক থেকে