ঢাকা ০৫:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
পাকা জুম ধানে সোনালি হাসি, ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত রাঙামাটির জুমিয়ারা সংসদীয় কূটনীতিতে বাংলাদেশ-ব্রিটেন সহযোগিতা বাড়ানোর প্রত্যয় চন্দ্রনাথ পাহাড়ে সবুজ প্রকৃতি, নজরুল ও বন্ধুত্বের অমলিন স্মৃতি শনিবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ এখনই নয় এলডিসি উত্তরণ আরও তিন বছর সময় পেল বাংলাদেশ জাপানে চার দিনের সফর শেষে দেশে  ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তাহসিফের মৃত্যু বন্ধু দ্বীপকে হেফাজতে নিল পিবিআই আড়াই লাখের বেশি যুব নারী-পুরুষের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ফারাক্কার প্রভাব মোকাবিলায় পদ্মা-তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণের ওপর গুরুত্বারোপ রিজভীর গুমের শিকার পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিতের দাবি সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠকে

চন্দ্রনাথ পাহাড়ে সবুজ প্রকৃতি, নজরুল ও বন্ধুত্বের অমলিন স্মৃতি

ভয়েস ডিজিটাল ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৪:১৫:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে

চন্দ্রনাথ পাহাড়ে সবুজ প্রকৃতি, নজরুল ও বন্ধুত্বের অমলিন স্মৃতি

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে সবুজের সমারোহ এবং কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভ্রমণ ও বন্ধুত্বের এক গভীর ও অমলিন ইতিহাস রয়েছে।

চন্দ্রনাথ পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি, ঝরনার কলতান আর বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশিতে মুগ্ধ হয়েছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বন্ধু মুহম্মদ হবীবুল্লাহ বাহারের হাত ধরে ১৯২৯ সালে সীতাকুণ্ড ভ্রমণে এসে প্রকৃতির যে অপরূপ রূপ দেখেছিলেন, তারই কাব্যিক প্রকাশ ঘটেছিল ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই’ গানে। প্রায় এক শতাব্দী পরও সেই গান, বন্ধুত্বের গল্প আর কবির স্মৃতিতে চন্দ্রনাথ পাহাড় হয়ে আছে ইতিহাস ও প্রকৃতিপ্রেমের এক অনন্য স্মারক।

‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই/ ওই পাহাড়ের ঝর্ণা আমি, ঘরে নাহি রই গো/ উধাও হ’য়ে বই।’

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই কালজয়ী গানের পঙ্‌ক্তি উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়। পাহাড়ের সবুজ ঢাল, ঝরনার কলতান, বনভূমির নিস্তব্ধতা আর অদূরে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি প্রকৃতির এমন অপরূপ সৌন্দর্য একসময় মুগ্ধ করেছিল বিদ্রোহী কবিকে। সেই মুগ্ধতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল বাংলা সংগীতের অন্যতম স্মরণীয় একটি গান।

১৯২৯ থেকে ২০২৬—সময়ের হিসাবে প্রায় এক শতাব্দী। সময়ের পরিবর্তনে পাহাড়ের চারপাশে অনেক কিছু বদলেছে। কিন্তু চন্দ্রনাথ পাহাড়ের সঙ্গে আজও অমলিন হয়ে আছে নজরুলের স্মৃতি, তাঁর গান এবং এক আন্তরিক বন্ধুত্বের গল্প। যে বন্ধুত্বের টানে কবি বারবার ছুটে গিয়েছিলেন চট্টগ্রামে। ঘুরে বেড়িয়েছিলেন পাহাড়, নদী, সমুদ্রসৈকত ও দ্বীপাঞ্চলে।

বন্ধুত্বের টানে চট্টগ্রামে নজরুল

কাজী নজরুল ইসলাম বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার চট্টগ্রাম সফর করেন। ১৯২৬ ও ১৯২৯ সালের সফরে তিনি আতিথ্য গ্রহণ করেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু মুহম্মদ হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী ও তাঁর বোন শামসুন্নাহার মাহমুদের। বাহার ছিলেন তৎকালীন সাহিত্য-সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা, ক্রীড়া ও রাজনীতির পরিচিত ব্যক্তিত্ব।

চন্দ্রনাথ পাহাড়ে সবুজ প্রকৃতি, নজরুল ও বন্ধুত্বের অমলিন স্মৃতি

১৯০৬ সালে জন্ম নেওয়া বাহার শৈশবে পিতৃহারা হওয়ার পর মায়ের সঙ্গে চট্টগ্রামে নানা খান বাহাদুর আবদুল আজীজের তামাকুমণ্ডি লেইনের বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। বাড়িটির নাম ছিল ‘আজীজ মঞ্জিল’। চট্টগ্রাম কলেজে বিএ শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি কলেজ ছাত্র সংসদের সম্পাদক ছিলেন। সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই নজরুলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে।

কবি নজরুলের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে মুহম্মদ হবীবুল্লাহ বাহার তাঁর ‘কাজী সাহেব’ স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘কাজী সাহেবের সঙ্গে প্রথম দেখা আমার হুগলীতে। কিন্তু তার বহু আগেই তাঁকে মেনে নিয়েছি জীবন পথের অগ্রদূত হিসেবে। হঠাৎ একদিন বন্ধুবর মঈনুদ্দীনের সঙ্গে হুগলীতে রেললাইনের ধারে তাঁর বাড়ীতে গিয়ে হাজির হলাম। শুনলাম, তিনি উত্তর-পাড়ায় এক সভায় গেছেন। রাত্রি ন’টার সময় তিনি ফুলের মালা গলায় পরে বাড়ী ফিরে এলেন। বিশেষ পরিচয় করে দিতে হলো না। দেখেই তিনি হেসে উঠলেন, যেন যুগ যুগের চেনা।’

বাহারের বোন শামসুন্নাহার মাহমুদও ছিলেন একজন লেখক ও সাংবাদিক। ভাই-বোনের সম্পাদনায় প্রকাশিত সাহিত্যপত্রিকা ‘বুলবুল’-এর সঙ্গেও নজরুলের সম্পর্ক ছিল। পরবর্তী সময়ে বাহার পূর্ববাংলার শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হন।

নজরুলের সঙ্গে বাহারের সম্পর্ক নিছক ভক্তি কিংবা আনুষ্ঠানিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল আন্তরিক বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি অভিন্ন অনুরাগের সম্পর্ক।

প্রথম সফর ১৯২৬, দ্বিতীয়বার ১৯২৯ সালে

কাজী নজরুল ইসলাম প্রথমবার চট্টগ্রামে আসেন ১৯২৬ সালের জুলাই মাসে। সে সময় তিনি জেলা প্রশাসকের ডাকবাংলোয় অবস্থান করেন। পরে বন্ধুবর হবীবুল্লাহ বাহারদের তামাকুমণ্ডি লেনের আজীজ মঞ্জিলে ওঠেন। ২৪ জুলাই চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্র সংসদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও যোগ দেন কবি।

এর প্রায় আড়াই বছর পর, ১৯২৯ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দ্বিতীয়বার চট্টগ্রামে আসেন নজরুল। এবারও বন্ধু বাহার ও তাঁর পরিবারের আতিথ্যে চট্টগ্রামের দিনগুলো হয়ে ওঠে আড্ডা, গান, কবিতা আর ভ্রমণে প্রাণবন্ত। এই সফরেই বাহার কবিকে নিয়ে যান সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি অঞ্চলে।

চন্দ্রনাথ পাহাড়ে কবির মুগ্ধতা ও গানের জন্ম

বন্ধুদের সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের দিকে এগিয়ে যান নজরুল। পাহাড়, বনভূমি, হ্রদ ও ঝরনার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করেন তাঁরা। প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে কবি যেন খুঁজে পেয়েছিলেন এক অন্য রকম মুক্তির স্বাদ।

চন্দ্রনাথ পাহাড়ে সবুজ প্রকৃতি, নজরুল ও বন্ধুত্বের অমলিন স্মৃতি

পাহাড়ের গায়ে নেমে আসা ঝরনার পাশে বসে থাকা নজরুলের কয়েকটি ছবি তোলেন মুহম্মদ হবীবুল্লাহ বাহার নিজেই। সেই ছবিগুলো আজও কবির সীতাকুণ্ড ভ্রমণের ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে বিবেচিত।

চন্দ্রনাথ পাহাড়ের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েই কবি লিখেছিলেন, ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই’। গানের কথায় পাহাড়ের ঝরনা যেন কবির নিজের কণ্ঠে কথা বলে উঠেছে। ঝরনার অবিরাম ছুটে চলা, বন্য প্রকৃতির আহ্বান আর মুক্ত জীবনের দুরন্ত আকাঙ্ক্ষা মূর্ত হয়ে উঠেছে গানের প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে।

জাতীয় কবির চন্দ্রনাথ ভ্রমণ নিয়ে বাহারের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে একটি মজার ঘটনাও। পাহাড়ে ওঠার পর জোঁকের ভয়ে নজরুল আর নিচে নামতে চাইছিলেন না। শেষ পর্যন্ত বাহার ও তাঁর বন্ধুরা মিলে কবিকে কাঁধে করে নিচে নামান। যদিও চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ঠিক কতটা উঁচুতে উঠেছিলেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই। কেউ কেউ দাবি করেন, কবি পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছিলেন।

উল্লেখ্য, নজরুলের এই গান ১৯৩৯ সালের ২৭ মে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্র ‘সাপুড়ে’-তে ব্যবহৃত হয়। ছবিতে চন্দন চরিত্রে গানটিতে কণ্ঠ দেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কানন দেবী। একই বছরের জুলাই মাসে মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানি থেকে তাঁর কণ্ঠে গানটির রেকর্ডও প্রকাশিত হয়।

চট্টগ্রামের প্রকৃতি ও নজরুলের সাহিত্যসৃষ্টি

চট্টগ্রামে এসে নজরুল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেননি, সেই প্রকৃতির সঙ্গে নিজের সৃষ্টিশীল সত্তারও গভীর সংযোগ ঘটিয়েছিলেন। পাহাড়, নদী, সমুদ্র ও প্রকৃতির বৈচিত্র্য তাঁর কবিতা ও গানে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। চট্টগ্রাম সফরের অভিজ্ঞতা ও প্রকৃতির প্রভাব তাঁর বিভিন্ন সাহিত্যকর্মে প্রতিফলিত হয়েছে।

তাঁর রচিত বেশ কিছু কবিতা ও গান পরবর্তী সময়ে ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ ও ‘চক্রবাক’-এর মতো কাব্যগ্রন্থে স্থান পায়। ১৯২৮ সালে প্রকাশিত ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ তিনি উৎসর্গ করেছিলেন বন্ধু মুহম্মদ হবীবুল্লাহ বাহার ও শামসুন্নাহার মাহমুদকে। কবির বিভিন্ন চিঠিতেও চট্টগ্রামের পাহাড়, ঝরনা এবং বন্ধুদের আতিথ্যের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতার প্রকাশ পাওয়া যায়।

চন্দ্রনাথ পাহাড়ে সবুজ প্রকৃতি, নজরুল ও বন্ধুত্বের অমলিন স্মৃতি

ইকোপার্কে নজরুল স্কয়ার, স্মৃতি ধরে রাখার উদ্যোগ

বর্তমানে সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কে গেলে নজরুলের সেই ঐতিহাসিক ভ্রমণের স্মৃতিচিহ্ন চোখে পড়ে। পার্কের মূল ফটক পেরিয়ে কিছুটা সামনে গেলেই দেখা মেলে ‘নজরুল স্কয়ার’-এর। সেখানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি ম্যুরাল বা ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে।

বন্ধু হবীবুল্লাহ বাহারের তোলা নজরুলের ঐতিহাসিক আলোকচিত্রের আদলেই ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পার্কের একটি ফলকে কবির সীতাকুণ্ড ভ্রমণের অনুপ্রেরণায় রচিত গানের বিখ্যাত চরণ দুটি খোদাই করা আছে। ইকোপার্কে প্রবেশের মুখে রয়েছে নজরুল স্কয়ারের দিকনির্দেশনাসংবলিত একটি নীল রঙের সাইনবোর্ড।

সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কটি মূলত ২০০০-২০০১ সালের দিকে সাধারণ মানুষের জন্য চালু হয়। পরবর্তী সময়ে জাতীয় কবির ১৯২৯ সালের ঐতিহাসিক সীতাকুণ্ড ভ্রমণকে স্মরণীয় করে রাখতে পার্কের ভেতরে ‘নজরুল স্কয়ার’ এবং তথ্যসমৃদ্ধ সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়। বন বিভাগের উদ্যোগে পার্কের আধুনিকায়নের পাশাপাশি পর্যটকদের কাছে এই বনাঞ্চলের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরার লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছিল এ উদ্যোগ।

তবে দীর্ঘদিনের অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সাইনবোর্ডটি বিভিন্ন সময়ে নষ্ট হয়ে যায়। সম্প্রতি সেটি আবার নতুনভাবে স্থাপন করা হয়েছে।

সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘পার্কে নজরুল স্কয়ারের দিকনির্দেশনা ফলকটি সবসময় যত্নে রাখা হয়। এটির রং নষ্ট হলে দ্রুত তা ঠিক করা হয়। এটি কয়েক বছর আগে নতুনভাবে লাগানো হয়েছে।’

নজরুলের স্মৃতি সংরক্ষণে আরও উদ্যোগের দাবি

বিশিষ্ট নজরুল গবেষক, ‘চট্টগ্রামে নজরুল’ গ্রন্থের প্রণেতা এবং জাতীয় কবি নজরুল স্মৃতি রক্ষা পরিষদের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন বাসসকে বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম পাহাড় ও ঝরনাঘেরা সীতাকুণ্ডের সুনিবিড় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে গভীরভাবে বিমোহিত হয়েছিলেন। তাঁর এই সফর বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য স্মৃতির জন্ম দেয়।

তিনি বলেন, সীতাকুণ্ড রেলওয়ে স্টেশনে নেমে পূর্বদিকে অবস্থিত সুবিশাল চন্দ্রনাথ পাহাড় দেখে কবি ভীষণ মুগ্ধ হন। প্রকৃতির এই রূপ দেখে তিনি তাঁর বিখ্যাত গানটি রচনা করেন। ভ্রমণসঙ্গীদের নিয়ে কবি চন্দ্রনাথ পাহাড়ে আরোহণ করেন। এ সময় পাহাড়ের একটি পাথরে বসে থাকা অবস্থায় তাঁর ঐতিহাসিক ছবিটি তোলা হয়, যা এখনও বহু নজরুলপ্রেমীর কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।

বর্তমান সরকারের ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন বলেন, শুধু ঘোষণা কিংবা কিছু ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্যে এ উদ্যোগ সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

চন্দ্রনাথ পাহাড়ে সবুজ প্রকৃতি, নজরুল ও বন্ধুত্বের অমলিন স্মৃতি

তিনি আরও বলেন, ২০০৩ সাল থেকে তাঁদের দাবি ও আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে পাহাড়ে ওঠার পথে ‘নজরুল স্কয়ার’ স্থাপন করা হয়। তাঁদের আরেকটি দাবি ছিল সীতাকুণ্ড ইকোপার্কের নাম পরিবর্তন করে ‘নজরুল ইকোপার্ক’ ঘোষণা করা। তবে সেই দাবি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান সরকার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ২৫টি স্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে কবি নজরুল ইনস্টিটিউট। এ প্রকল্পের আওতায় সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড় ও এর আশপাশের স্মৃতিবিজড়িত স্থানও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

পাহাড়ের নীরবতায় আজও বাজে নজরুলের গান

চন্দ্রনাথ পাহাড়ের প্রকৃতি আজও পর্যটকদের মুগ্ধ করে। পাহাড়ের সবুজ বনভূমি, ঝরনার শব্দ, দূরে সমুদ্রের নীল জলরাশি আর প্রকৃতির নিবিড় নিস্তব্ধতার মধ্যে যেন মিশে আছে নজরুলের স্মৃতি। পাহাড়ের গায়ে কবির বসে থাকার সেই ছবি, বন্ধুর স্মৃতিকথা আর তাঁর গানের পঙ্‌ক্তি একসঙ্গে তৈরি করেছে ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়।

প্রায় এক শতাব্দী আগে যে পাহাড়ের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কবি লিখেছিলেন ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই’, সেই পাহাড় আজও দাঁড়িয়ে আছে তাঁর সৃষ্টির নীরব সাক্ষী হয়ে। কিন্তু শুধু স্মৃতিচিহ্ন কিংবা একটি ভাস্কর্য স্থাপন করলেই এই ঐতিহ্য রক্ষা হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, ঐতিহাসিক তথ্যের যথাযথ সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস তুলে ধরার উদ্যোগ।

চন্দ্রনাথ পাহাড় তাই কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি নজরুলের প্রকৃতিপ্রেম, সৃষ্টিশীলতা এবং বন্ধুত্বের এক জীবন্ত ইতিহাস। পাহাড়ের বুক থেকে ঝরে পড়া ঝরনার মতোই সময়ের প্রবাহে বয়ে চলেছে সেই স্মৃতি। আর পাহাড়ের দিকে তাকালে আজও মনে হয়, কোথাও যেন ভেসে আসছে কবির সেই চিরচেনা সুর ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই’।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :