অনলাইন চাকরির প্রলোভনে ব্যবসায়ীর ২৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ, তরুণী গ্রেপ্তার
- আপডেট সময় : ০৬:৪১:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬ ৩৬ বার পড়া হয়েছে
বিদেশি পর্যটনকেন্দ্রের ওয়েবসাইটে রেটিং ও মন্তব্য দেওয়ার বিনিময়ে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা আয়ের প্রলোভন দেখানো হয়েছিল এক ব্যবসায়ীকে। শুরুতে তাঁকে কিছু টাকা পারিশ্রমিকও দেওয়া হয়।
এতে আস্থা অর্জনের পর বিনিয়োগের বিপরীতে আকর্ষণীয় মুনাফার প্রস্তাব দিয়ে তাঁর কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় ২৪ লাখ ১৯ হাজার ১৯৯ টাকা।
অনলাইনভিত্তিক চাকরি ও বিনিয়োগের নামে সংঘটিত এ প্রতারণার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এক তরুণীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
গ্রেপ্তার তরুণীর নাম প্রীয়ন্তী সরকার চিত্রা (২২)। সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, তিনি একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সদস্য। গত ৮ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১১টার দিকে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টর এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শনিবার (১০ অক্টোবর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে সিআইডি।
সিআইডি সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের আগস্টে একটি টেলিগ্রাম আইডি থেকে ওই ব্যবসায়ীর মুঠোফোনে অনলাইন পার্টটাইম চাকরির প্রস্তাব আসে। প্রস্তাবে বলা হয়, বিদেশি পর্যটনকেন্দ্রগুলো সম্পর্কে রেটিং দিতে হবে এবং সেগুলো নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য বা ফিডব্যাক লিখতে হবে। এ কাজের বিনিময়ে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব।
ওই ব্যবসায়ী প্রস্তাবে রাজি হলে তাঁকে নেদারল্যান্ডসের একটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি নকল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে একটি ট্রাভেল প্ল্যাটফর্মে কাজ করতে বলা হয়। সেখানে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে রেটিং দেওয়া ও মন্তব্য করার কাজের বিনিময়ে তাঁকে প্রথম দিকে কিছু টাকা পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া হয়। এতে তাঁর আস্থা তৈরি হয় এবং তিনি ধীরে ধীরে চক্রটির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন।
প্রাথমিকভাবে পারিশ্রমিক দেওয়ার পর ওই ব্যবসায়ীকে একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত করা হয়। সেখানে প্রতিষ্ঠানের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের বিনিময়ে আকর্ষণীয় মুনাফার প্রস্তাব দেওয়া হয়। চক্রের অন্য সদস্যরা বিনিয়োগ করে লাভবান হয়েছেন, এমন ধারণা দিতে তাঁদের ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার স্লিপের ছবিও দেখানো হয়। এসব দেখে ওই ব্যবসায়ীও বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২২ আগস্ট ওই ব্যবসায়ী তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব থেকে চক্রটির দেওয়া একটি ব্যাংক হিসাবে প্রথমে ১ লাখ টাকা পাঠান। এরপর ওয়েবসাইটে নির্দিষ্টসংখ্যক ভিজিট সম্পন্ন করা, বিভিন্ন রাউন্ডে অংশ নেওয়া এবং অন্যান্য শর্ত পূরণের কথা বলে তাঁকে পর্যায়ক্রমে আরও টাকা পাঠাতে বলা হয়।
এভাবে একই দিনে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে তাঁর কাছ থেকে মোট ২৪ লাখ ১৯ হাজার ১৯৯ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থের একটি অংশ চক্রটির সদস্যরা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করেন। তবে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ওই ব্যবসায়ীকে বিনিয়োগের মুনাফা তো দেওয়া হয়নি, এমনকি তাঁর মূল টাকাও ফেরত দেওয়া হয়নি।
পরবর্তী সময়ে চক্রটির পক্ষ থেকে তাঁর কাছে আরও অর্থ দাবি করা হলে সন্দেহ হয় ব্যবসায়ীর। তিনি আগের টাকা ফেরত চাইলে নতুন করে অর্থ পাঠানোর শর্ত দেওয়া হয়। একপর্যায়ে চক্রটির সদস্যরা তাঁর সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। এতে প্রতারণার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আদালতের মাধ্যমে ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর রাজধানীর পল্টন থানায় মামলা করেন।
সিআইডির তদন্তে ‘লিজা’ নাম ব্যবহারকারী এক সন্দেহভাজনের নির্দেশনার সঙ্গে টাকা পাঠানোর সময়ের সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এ ছাড়া গ্রেপ্তার প্রীয়ন্তী সরকার চিত্রার নামে নিবন্ধিত একটি মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব থেকে ওই ব্যবসায়ীকে প্রাথমিক পর্যায়ে পারিশ্রমিক পাঠানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অর্থ পাঠানোর নির্দেশদাতা সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি প্রীয়ন্তী। তবে প্রতারণার ঘটনায় তাঁর প্রকৃত সংশ্লিষ্টতা, অর্থের উৎস এবং তা কোথায় স্থানান্তর করা হয়েছে, সেসব বিষয় শনাক্ত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
সিআইডি আরও জানিয়েছে, একই মামলায় প্রীয়ন্তী ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে চারজন ইতিমধ্যে আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
অনলাইনভিত্তিক চাকরি কিংবা অপরিচিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি। সংস্থাটি বলেছে, অল্প সময়ে বেশি আয় বা বিনিয়োগের বিপরীতে অস্বাভাবিক মুনাফার প্রস্তাব প্রতারণার কৌশল হতে পারে।
তাই কোনো অনলাইন কাজ বা বিনিয়োগের প্রস্তাব গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং কার্যক্রমের সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
এ ধরনের প্রতারণার শিকার হলে লেনদেনের রসিদ, ব্যাংক হিসাবের তথ্য, মুঠোফোনে পাওয়া বার্তা, টেলিগ্রাম বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কথোপকথন এবং ওয়েবসাইট-সংক্রান্ত তথ্যসহ প্রয়োজনীয় ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর পরামর্শ দিয়েছে সিআইডি।















