তাইওয়ানের পূর্ব উপকূলে প্রথমবার চীনা সামুদ্রিক মিলিশিয়া নৌকা
- আপডেট সময় : ০৫:৩৬:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬ ৩২ বার পড়া হয়েছে
তাইওয়ানের পূর্ব উপকূলের প্রশান্ত মহাসাগরীয় জলসীমায় প্রথমবারের মতো চীনের সামুদ্রিক মিলিশিয়ার একটি নৌকা শনাক্ত করা হয়েছে। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে মাছ ধরার নৌকার ছদ্মবেশে থাকা ওই নৌযানকে একটি চীনা কোস্টগার্ড জাহাজ ও একটি গবেষণা জাহাজের সঙ্গে চলাচল করতে দেখা যায়।
তাইওয়ানের এপেক্স এভিয়েশনের একটি নজরদারি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স। নজরদারি প্রতিবেদনে নৌযানটির নাম মিনফুদিংইউ ০৭৯০২ বলে শনাক্ত করা হয়েছে। এপেক্স এভিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, এটি একটি মাছ ধরার নৌকা হলেও চীনের সামুদ্রিক মিলিশিয়ার অংশ হিসেবে কাজ করে। আগস্টের একদিন নৌকাটি চীনের কোস্টগার্ড কাটার ২৫০২ এবং গবেষণা জাহাজ শিয়াং ইয়াং হং ০৩-এর সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছিল।
তাইওয়ানের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ওই তিনটি নৌযানকে তখন শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণ করছিল তাইওয়ান। তাদের একজনের ভাষ্য, মাছ ধরার নৌকাটি পিপলস লিবারেশন আর্মির সামুদ্রিক মিলিশিয়া বহরের অংশ এবং চীনা কোস্টগার্ডের ‘হয়রানি মহড়ার’ সঙ্গে সমন্বয় করে চলছিল। তবে সংবেদনশীলতার কারণে কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ করেননি।
ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নৌযানটির অবস্থানের কারণে। চীনের সামুদ্রিক মিলিশিয়ার নৌযানগুলো দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ জলসীমায় বেশি দেখা গেলেও তাইওয়ানের পূর্ব উপকূলে এমন নৌযানের উপস্থিতির এটিই প্রথম জানা ঘটনা। তাইওয়ানের পূর্ব দিকের জলসীমা সরাসরি প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে উন্মুক্ত এবং সম্ভাব্য সংঘাত বা অবরোধের পরিস্থিতিতে মিত্রদেশগুলোর কাছ থেকে তাইওয়ানে সরবরাহ পৌঁছানোর জন্য এই অঞ্চলকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে তাইপে।
গত জুন থেকে তাইওয়ানের পূর্ব উপকূলেও চীনা কোস্টগার্ডের তৎপরতা বেড়েছে। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি এখন সামুদ্রিক মিলিশিয়া, কোস্টগার্ড ও গবেষণা জাহাজের মতো বিভিন্ন ধরনের নৌযানের একই এলাকায় উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তাইওয়ানের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এ ধরনের তৎপরতা ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সামুদ্রিক অবরোধের প্রস্তুতি বা মহড়া হতে পারে।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রয়টার্সকে বলেছে, চীন শান্তিকালীন পরিস্থিতিতে আইন প্রয়োগ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার মতো কর্মকাণ্ডকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে তাদের কার্যক্রমের পরিধি বাড়াচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, এর মাধ্যমে চীন জলসীমায় এক ধরনের ‘কার্যত এখতিয়ার’-এর ধারণা তৈরি করতে চাইছে।
তাইওয়ান বলছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা ও তাদের সামুদ্রিক অধিকারকে চ্যালেঞ্জ করছে। চীনা কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণে তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী বিভিন্ন গোয়েন্দা ও নজরদারি ব্যবস্থা ব্যবহার করছে এবং কোস্টগার্ডসহ অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করছে। চীনের তাইওয়ানবিষয়ক দপ্তর ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
এপেক্স এভিয়েশনের নজরদারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের একটি পর্যবেক্ষণ বিমান তাইওয়ানের পূর্বাঞ্চলীয় হুয়ালিয়েন কাউন্টির উপকূল থেকে ৩০ নটিক্যাল মাইলেরও বেশি দূরে ওই চীনা নৌযানগুলোর উপস্থিতি শনাক্ত করে। রাডার, ইনফ্রারেড ছবি এবং স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বা এআইএসের তথ্য ব্যবহার করে নৌযানগুলোর গতিবিধি নথিবদ্ধ করা হয়। তিনটি নৌযান প্রায় ১০ নটিক্যাল মাইল ব্যাসার্ধের একটি এলাকায় ছড়িয়ে ছিল।
তবে এপেক্সের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক অনর হং সতর্ক করে বলেছেন, একটি মাত্র নজরদারি অভিযান থেকে নৌযানগুলোর নির্দিষ্ট মিশন বা তারা পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছিল কি না, তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ তিনটি নৌযান একই এলাকায় থাকলেও তাদের কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ সীমিত।
চীনের সামুদ্রিক মিলিশিয়া ব্যবস্থার শিকড় ১৯৫০-এর দশকে। মূলত মাছ ধরার নৌযান ও তাদের ক্রুদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিয়ে বিতর্কিত জলসীমায় কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরের বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের নৌযানকে চীনা কোস্টগার্ডের সঙ্গে কাজ করতে দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে বেসামরিক নৌযানের আবরণ বজায় রেখেই সামুদ্রিক দাবিগুলো জোরালো করার সুযোগ পায় বেইজিং।
তাইওয়ানের পূর্ব উপকূলে এমন নৌযানের উপস্থিতি তাই নতুন ধরনের ‘গ্রে-জোন’ চাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরাসরি সামরিক সংঘাতে না গিয়ে সামরিক, আধাসামরিক, কোস্টগার্ড ও বেসামরিক নৌযানের সমন্বিত উপস্থিতির মাধ্যমে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই এ ধরনের কৌশলের বৈশিষ্ট্য। তাইওয়ানের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েনও সম্প্রতি চীনের সামরিক ও কোস্টগার্ড তৎপরতাকে এমন ধারাবাহিক ‘গ্রে-জোন’ চাপের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এদিকে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৭ থেকে ৮ অক্টোবরের ২৪ ঘণ্টায় তাইওয়ানের আশপাশে তিনটি চীনা সামরিক বিমান, ছয়টি নৌবাহিনীর জাহাজ ও একটি সরকারি জাহাজ শনাক্ত করা হয়েছে। এর একটি বিমান তাইওয়ানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আকাশ প্রতিরক্ষা শনাক্তকরণ অঞ্চলে প্রবেশ করে।
সব মিলিয়ে পূর্ব উপকূলে চীনা সামুদ্রিক মিলিশিয়া নৌকার এই প্রথম শনাক্ত হওয়া তাইওয়ানের জন্য নতুন একটি নজরদারি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সরাসরি সংঘাতের ইঙ্গিত হিসেবে ঘটনাটিকে দেখার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলেও সামরিক, কোস্টগার্ড, গবেষণা ও বেসামরিক নৌযানের ক্রমবর্ধমান সমন্বিত উপস্থিতি তাইওয়ানের চারপাশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তথ্য সূত্র- রয়টার্স।















