কৃষিপণ্যের আমদানি কমিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর
- আপডেট সময় : ১১:২০:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
দেশে উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে, এমন কৃষি ও খাদ্যপণ্যের আমদানি ধীরে ধীরে কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল ও লাভজনক করতে গবেষণা, উন্নত জাত, আধুনিক প্রযুক্তি, সেচব্যবস্থা ও কৃষিযান্ত্রিকীকরণের সুবিধা দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
রোববার সচিবালয়ের নিজ কার্যালয় থেকে হেঁটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি লিফট ব্যবহার না করে সিঁড়ি দিয়ে সম্মেলন কক্ষে যান। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) এসব তথ্য জানান।
আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে উৎপাদন করা সম্ভব এমন কৃষি ও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমাতে হবে। এ জন্য কৃষি গবেষণাকে আরও জোরদার করার পাশাপাশি উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং কৃষির যান্ত্রিকীকরণে গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং কৃষক যেন তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান, সেদিকেও বিশেষ নজর দেওয়ার নির্দেশ দেন।
সরিষার উৎপাদন বেড়েছে
বৈঠকে ভোজ্য তেলের আমদানিনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ হিসেবে সরিষার উৎপাদন বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরা হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে সরিষার উৎপাদন ছিল ৮ দশমিক ২৪ লাখ মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৩৪ লাখ মেট্রিক টনে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরিষার উৎপাদন আরও বেড়ে ১৫ দশমিক ৪১ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। সরিষার উৎপাদন আরও বাড়ানো গেলে দেশে ভোজ্য তেলের চাহিদার একটি বড় অংশ স্থানীয়ভাবে পূরণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
পেঁয়াজ সংরক্ষণ ও উৎপাদনে গুরুত্ব
পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। কৃষকের পর্যায়ে পেঁয়াজ সংরক্ষণে এয়ার-ফ্লো প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের জাত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া লবণাক্ততা, খরা ও জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু নতুন জাতের ফসল মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের কার্যক্রম চলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এসব জাত কৃষকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কৃষি গবেষণায় নতুন জাত ও প্রযুক্তি
বৈঠকে কৃষি গবেষণার অগ্রগতিও তুলে ধরা হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিভিন্ন ফসলের মোট এক হাজার ৯০টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর মধ্যে ধানের জাত রয়েছে ১৫৫টি। এ ছাড়া কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন খরচ কমানো এবং কৃষকের শ্রম সাশ্রয়ের জন্য এক হাজারের বেশি কৃষিপ্রযুক্তি উদ্ভাবনের তথ্যও বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী এসব গবেষণা ও প্রযুক্তি শুধু গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত মাঠপর্যায়ে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
কৃষিযান্ত্রিকীকরণে বাড়ছে গুরুত্ব
কৃষিতে শ্রমিকের সংকট ও উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কৃষিযান্ত্রিকীকরণে আরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বৈঠকে উঠে আসে।
দেশীয়ভাবে কৃষিযন্ত্র উদ্ভাবন ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টারসহ বিভিন্ন আধুনিক কৃষিযন্ত্র কৃষকের কাছে সুলভমূল্যে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানানো হয়। কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়লে একই সঙ্গে কৃষকের শ্রম ও সময় সাশ্রয় হবে এবং উৎপাদন খরচও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সৌর সেচে কমতে পারে কৃষকের খরচ
কৃষিতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। বর্তমানে দেশে দুই হাজার ৬১৭টি সৌর সেচব্যবস্থা রয়েছে বলে জানানো হয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর সেচব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকের সেচ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি ডিজেলসহ প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
এ জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় সৌর সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়।
৪৩ লাখ কৃষক পাবেন কৃষক কার্ড
কৃষকের কাছে সরকারি সহায়তা সরাসরি পৌঁছে দিতে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচিকেও বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কৃষি মন্ত্রণালয় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষককে এই কার্ডের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
প্রথম ধাপে প্রায় এক লাখ ১০ হাজার কৃষককে কার্ড দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে বৈঠকে জানানো হয়। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সরকারি সহায়তা আরও স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, উৎপাদিত কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি বলে বৈঠকে আলোচনা হয়। এ জন্য খালখনন, বৃক্ষরোপণ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। কৃষক যেন উৎপাদনের সুফল পান এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার মূল লক্ষ্য হিসেবে উঠে আসে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানিনির্ভরতা কমানো। যেসব পণ্য দেশে উৎপাদন করা সম্ভব, সেসব পণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর, আধুনিক ও লাভজনক খাতে পরিণত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ উদ্যোগ সফল করতে শুধু কৃষি উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, সহজে ঋণ ও উপকরণ পাওয়া, আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রের ব্যবহার, সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।
সমন্বিতভাবে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে একদিকে যেমন কৃষকের আয় বাড়বে, অন্যদিকে দেশে কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও আরও শক্তিশালী হবে।


















