ঢাকা ০৫:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
কৃষিপণ্যের আমদানি কমিয়ে উৎপাদন  বাড়ানোর তাগিদ  প্রধানমন্ত্রীর সংযুক্ত আরব  আমিরাতে ৪,৮০০ বাংলাদেশির ভিসা বাতিল ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রিসেট চায় বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় সফর হওয়া উচিত হুমায়ুন ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফর বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন ভিশন অগ্রাধিকার তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী হঠাৎ রামপালের এক ইউনিট বন্ধ বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে অর্ধেক শেরপুর সীমান্তে বিজিবির অভিযান ভারতীয় ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট জব্দ শেরপুরে ৫ লাখ টাকার ভারতীয় ওষুধের চালান জব্দ ‘আমেরিকানরা যোদ্ধা হলে ইরানের বীর বাহিনীর মুখোমুখি হোক’: পেজেশকিয়ান আসুন এবার রাষ্ট্রকে আমরা পুনর্গঠন করি’: প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্রে একের পর এক কারিগরি ত্রুটি, নাশকতার আশঙ্কা রিজভীর

ভিন্ন ধর্মের প্রেম ও অনার কিলিং: ভারতের প্রত্যন্ত গ্রাম উমরিতে যে ভয়াবহ ঘটনা

ভয়েস ডিজিটাল ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৬:৩০:২৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৬০ বার পড়া হয়েছে

ভিন্ন ধর্মের প্রেম ও অনার কিলিং: ভারতের প্রত্যন্ত গ্রাম উমরিতে যে ভয়াবহ ঘটনা

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ভারতের উত্তর প্রদেশের মোরাদাবাদ জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম উমরি। বছরের পর বছর ধরে যেখানে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বসবাস করে আসছিলেন। কোনো বড় ধরনের ধর্মীয় উত্তেজনা বা সংঘাতের ইতিহাসও নেই। অথচ সেই গ্রামেই ভিন্ন ধর্মের এক তরুণ-তরুণীর প্রেমের পরিণতি হলো নির্মম হত্যাকাণ্ড যা পুরো এলাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

গত ২১ জানুয়ারি উমরি গ্রামের কাছের একটি নদীর তীর থেকে পুলিশ উদ্ধার করে দুটি মরদেহ। মাটির নিচে পুঁতে রাখা ওই মরদেহ দুটির পরিচয় পাওয়া যায়, ১৯ বছর বয়সী হিন্দু তরুণী কাজল এবং ২৭ বছর বয়সী মুসলিম যুবক মোহাম্মদ আরমান। পুলিশ জানায়, দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং দুই দিন আগে তাঁদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

পুলিশের সন্দেহ, এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাজলের তিন ভাই রাজারাম, সতিশ ও রিঙ্কু সাইনি। তাঁদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত তাঁরা কেউই হত্যার বিষয়ে মুখ খোলেননি।

গ্রামে নেমে এসেছে অস্বস্তিকর নীরবতা

রাজধানী দিল্লি থেকে প্রায় ১৮২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত উমরি গ্রামে প্রায় চার শ পরিবার বসবাস করে। হিন্দু ও মুসলিম-দুই সম্প্রদায়ের মানুষের দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ। গ্রামের একাধিক বাসিন্দা বিবিসিকে জানিয়েছেন, এখানে ধর্মীয় বিরোধ বা সংঘাতের কোনো নজির আগে কখনো দেখা যায়নি।

তবু এই হত্যাকাণ্ডের পর পুরো গ্রামে নেমে এসেছে এক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতা। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

রাজ্য পুলিশের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল মুনিরাজ জি বলেন, পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে অনার কিলিং’ হিসেবে দেখছে। সাধারণত পরিবার বা সম্প্রদায়ের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে কেউ ভিন্ন ধর্ম বা জাতের কাউকে ভালোবাসা বা বিয়ে করলে তাকে হত্যা করাকে ‘অনার কিলিং’ বলা হয়।

পরিসংখ্যানে কম, বাস্তবে বেশি

ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (এনসিআরবি) ২০১৪ সাল থেকে অনার কিলিংয়ের তথ্য সংরক্ষণ শুরু করে। সে বছর দেশজুড়ে ১৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৮-এ।

তবে মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। প্রতিবছর শতাধিক অনার কিলিংয়ের ঘটনা ঘটে, যার বড় একটি অংশ সাধারণ হত্যাকাণ্ড হিসেবে নথিভুক্ত হয়।

কী ঘটেছিল কাজল ও আরমানের সঙ্গে

উমরি মূলত ধাতুশিল্পের জন্য পরিচিত হলেও এটি একটি গ্রামীণ এলাকা, যেখানে জাত-পাত ও সামাজিক রক্ষণশীলতার প্রভাব এখনো গভীর। কাজলের ভাইয়েরা মোরাদাবাদ শহরে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।

গ্রামের বাসিন্দা মহিপাল সাইনি জানান, উমরিতে এটিই প্রথম ভিন্ন ধর্মের কোনো প্রেমের ঘটনা, যা প্রকাশ্যে আসে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, কাজল ও আরমান প্রতিবেশী ছিলেন। তাঁদের বাড়ির দূরত্ব ছিল মাত্র ২০০ মিটার। দুজনই অন্তর্মুখী ছিলেন এবং খুব বেশি মানুষের সঙ্গে মিশতেন না।

কাজল স্থানীয় একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। আর আরমান চার বছর সৌদি আরবে একটি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে কাজ করার পর প্রায় পাঁচ মাস আগে দেশে ফেরেন। আয় কম হওয়ায় তিনি দেশে ফিরে একটি পাথর ভাঙার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন।

পুলিশ নিশ্চিত করে বলতে পারেনি, তাঁদের পরিচয় কীভাবে বা কত দিন ধরে সম্পর্ক চলছিল। তবে পুলিশ ও স্থানীয়দের ধারণা, ১৮ বা ১৯ জানুয়ারি রাতে কাজলের বাড়িতেই হত্যাকাণ্ড ঘটে। সেদিন কাজলের ভাইয়েরা আরমানকে বোনের বাড়িতে যেতে দেখেছিলেন।

বিভ্রান্তির চেষ্টা ও মরদেহ উদ্ধার

আরমানের বড় ভাই ফারমান আলী জানান, ১৮ জানুয়ারি রাতে ওষুধ কেনার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন আরমান। এরপর আর ফিরে আসেননি। ফোন বন্ধ থাকায় উদ্বিগ্ন হয়ে পরিবার পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ গ্রামে তল্লাশি শুরু করে।

এরই মধ্যে কাজলের ভাইয়েরা পুলিশকে জানান, তাঁদের বোন নিখোঁজ এবং আরমান তাকে অপহরণ করেছে, যা তদন্তকারীদের সন্দেহ বাড়িয়ে তোলে। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁদের বক্তব্যে অসংগতি ধরা পড়ে। পরে নদীর তীরে মাটির নিচ থেকে উদ্ধার হয় কাজল ও আরমানের মরদেহ।

কাজলের বাবা গণপত সাইনি দাবি করেন, হত্যার সময় তিনি ও তাঁর স্ত্রী বাড়িতে ছিলেন না। মেয়ের মৃত্যুতে তাঁরা শোকাহত। তবে মেয়ের সঙ্গে আরমানের সম্পর্ক সম্পর্কে আগে থেকে কিছু জানতেন কি না, সে প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি।

অন্যদিকে, আরমানের পরিবার জানায়, তারাও এই সম্পর্কের বিষয়ে কিছুই জানত না। পরে বন্ধুদের কাছ থেকেই তারা বিষয়টি জানতে পারে।

গ্রামজুড়ে ধাক্কা

গ্রামের মানুষ বলেন, সাধারণত কোনো বিরোধ হলে তাঁরা গ্রাম পরিষদের নেতাদের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেন। মহিপাল সাইনি বলেন, কাজলের পরিবার যদি একটু যুক্তিসংগত আচরণ করত, তাহলে গ্রাম্য বয়োজ্যেষ্ঠরা হয়তো বিষয়টি মীমাংসা করতে পারতেন।

এই হত্যাকাণ্ড উমরির মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। বাসিন্দা আরিফ আলী বলেন,
“আমরা কখনো ভাবিনি, আমাদের গ্রামে এমন কিছু ঘটতে পারে। সবাই এখন নিজেকে, সমাজকে নতুন করে ভাবছে। এক ধরনের চাপা অস্বস্তি আমাদের গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।”

আইন ও বাস্তবতা

ভারতের আইনে অনার কিলিং সরাসরি হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সে অনুযায়ী বিচার হয়। আদালত বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের নিজের পছন্দমতো জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার অধিকার সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত।

২০১৮ সালে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত প্রতিটি জেলায় ভিন্ন ধর্ম বা জাতের দম্পতিদের সুরক্ষার জন্য ‘সেফ হাউস’ স্থাপনের নির্দেশ দেন। তবু গবেষণা বলছে, অধিকাংশ ভারতীয় এখনো ভিন্ন ধর্ম বা ভিন্ন জাতের বিয়ের বিরোধী। উপরন্তু, কয়েকটি রাজ্যে কার্যকর ধর্মান্তরবিরোধী বিতর্কিত আইন এই ধরনের সম্পর্ককে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

উমরির ঘটনা তাই শুধু একটি গ্রামের ট্র্যাজেডি নয়, এটি ভারতের সমাজে প্রেম, স্বাধীনতা ও তথাকথিত সম্মানের সংঘাতের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। বিবিসি 

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

ভিন্ন ধর্মের প্রেম ও অনার কিলিং: ভারতের প্রত্যন্ত গ্রাম উমরিতে যে ভয়াবহ ঘটনা

আপডেট সময় : ০৬:৩০:২৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভারতের উত্তর প্রদেশের মোরাদাবাদ জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম উমরি। বছরের পর বছর ধরে যেখানে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বসবাস করে আসছিলেন। কোনো বড় ধরনের ধর্মীয় উত্তেজনা বা সংঘাতের ইতিহাসও নেই। অথচ সেই গ্রামেই ভিন্ন ধর্মের এক তরুণ-তরুণীর প্রেমের পরিণতি হলো নির্মম হত্যাকাণ্ড যা পুরো এলাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

গত ২১ জানুয়ারি উমরি গ্রামের কাছের একটি নদীর তীর থেকে পুলিশ উদ্ধার করে দুটি মরদেহ। মাটির নিচে পুঁতে রাখা ওই মরদেহ দুটির পরিচয় পাওয়া যায়, ১৯ বছর বয়সী হিন্দু তরুণী কাজল এবং ২৭ বছর বয়সী মুসলিম যুবক মোহাম্মদ আরমান। পুলিশ জানায়, দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং দুই দিন আগে তাঁদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

পুলিশের সন্দেহ, এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাজলের তিন ভাই রাজারাম, সতিশ ও রিঙ্কু সাইনি। তাঁদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত তাঁরা কেউই হত্যার বিষয়ে মুখ খোলেননি।

গ্রামে নেমে এসেছে অস্বস্তিকর নীরবতা

রাজধানী দিল্লি থেকে প্রায় ১৮২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত উমরি গ্রামে প্রায় চার শ পরিবার বসবাস করে। হিন্দু ও মুসলিম-দুই সম্প্রদায়ের মানুষের দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ। গ্রামের একাধিক বাসিন্দা বিবিসিকে জানিয়েছেন, এখানে ধর্মীয় বিরোধ বা সংঘাতের কোনো নজির আগে কখনো দেখা যায়নি।

তবু এই হত্যাকাণ্ডের পর পুরো গ্রামে নেমে এসেছে এক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতা। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

রাজ্য পুলিশের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল মুনিরাজ জি বলেন, পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে অনার কিলিং’ হিসেবে দেখছে। সাধারণত পরিবার বা সম্প্রদায়ের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে কেউ ভিন্ন ধর্ম বা জাতের কাউকে ভালোবাসা বা বিয়ে করলে তাকে হত্যা করাকে ‘অনার কিলিং’ বলা হয়।

পরিসংখ্যানে কম, বাস্তবে বেশি

ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (এনসিআরবি) ২০১৪ সাল থেকে অনার কিলিংয়ের তথ্য সংরক্ষণ শুরু করে। সে বছর দেশজুড়ে ১৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৮-এ।

তবে মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। প্রতিবছর শতাধিক অনার কিলিংয়ের ঘটনা ঘটে, যার বড় একটি অংশ সাধারণ হত্যাকাণ্ড হিসেবে নথিভুক্ত হয়।

কী ঘটেছিল কাজল ও আরমানের সঙ্গে

উমরি মূলত ধাতুশিল্পের জন্য পরিচিত হলেও এটি একটি গ্রামীণ এলাকা, যেখানে জাত-পাত ও সামাজিক রক্ষণশীলতার প্রভাব এখনো গভীর। কাজলের ভাইয়েরা মোরাদাবাদ শহরে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।

গ্রামের বাসিন্দা মহিপাল সাইনি জানান, উমরিতে এটিই প্রথম ভিন্ন ধর্মের কোনো প্রেমের ঘটনা, যা প্রকাশ্যে আসে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, কাজল ও আরমান প্রতিবেশী ছিলেন। তাঁদের বাড়ির দূরত্ব ছিল মাত্র ২০০ মিটার। দুজনই অন্তর্মুখী ছিলেন এবং খুব বেশি মানুষের সঙ্গে মিশতেন না।

কাজল স্থানীয় একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। আর আরমান চার বছর সৌদি আরবে একটি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে কাজ করার পর প্রায় পাঁচ মাস আগে দেশে ফেরেন। আয় কম হওয়ায় তিনি দেশে ফিরে একটি পাথর ভাঙার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন।

পুলিশ নিশ্চিত করে বলতে পারেনি, তাঁদের পরিচয় কীভাবে বা কত দিন ধরে সম্পর্ক চলছিল। তবে পুলিশ ও স্থানীয়দের ধারণা, ১৮ বা ১৯ জানুয়ারি রাতে কাজলের বাড়িতেই হত্যাকাণ্ড ঘটে। সেদিন কাজলের ভাইয়েরা আরমানকে বোনের বাড়িতে যেতে দেখেছিলেন।

বিভ্রান্তির চেষ্টা ও মরদেহ উদ্ধার

আরমানের বড় ভাই ফারমান আলী জানান, ১৮ জানুয়ারি রাতে ওষুধ কেনার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন আরমান। এরপর আর ফিরে আসেননি। ফোন বন্ধ থাকায় উদ্বিগ্ন হয়ে পরিবার পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ গ্রামে তল্লাশি শুরু করে।

এরই মধ্যে কাজলের ভাইয়েরা পুলিশকে জানান, তাঁদের বোন নিখোঁজ এবং আরমান তাকে অপহরণ করেছে, যা তদন্তকারীদের সন্দেহ বাড়িয়ে তোলে। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁদের বক্তব্যে অসংগতি ধরা পড়ে। পরে নদীর তীরে মাটির নিচ থেকে উদ্ধার হয় কাজল ও আরমানের মরদেহ।

কাজলের বাবা গণপত সাইনি দাবি করেন, হত্যার সময় তিনি ও তাঁর স্ত্রী বাড়িতে ছিলেন না। মেয়ের মৃত্যুতে তাঁরা শোকাহত। তবে মেয়ের সঙ্গে আরমানের সম্পর্ক সম্পর্কে আগে থেকে কিছু জানতেন কি না, সে প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি।

অন্যদিকে, আরমানের পরিবার জানায়, তারাও এই সম্পর্কের বিষয়ে কিছুই জানত না। পরে বন্ধুদের কাছ থেকেই তারা বিষয়টি জানতে পারে।

গ্রামজুড়ে ধাক্কা

গ্রামের মানুষ বলেন, সাধারণত কোনো বিরোধ হলে তাঁরা গ্রাম পরিষদের নেতাদের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেন। মহিপাল সাইনি বলেন, কাজলের পরিবার যদি একটু যুক্তিসংগত আচরণ করত, তাহলে গ্রাম্য বয়োজ্যেষ্ঠরা হয়তো বিষয়টি মীমাংসা করতে পারতেন।

এই হত্যাকাণ্ড উমরির মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। বাসিন্দা আরিফ আলী বলেন,
“আমরা কখনো ভাবিনি, আমাদের গ্রামে এমন কিছু ঘটতে পারে। সবাই এখন নিজেকে, সমাজকে নতুন করে ভাবছে। এক ধরনের চাপা অস্বস্তি আমাদের গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।”

আইন ও বাস্তবতা

ভারতের আইনে অনার কিলিং সরাসরি হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সে অনুযায়ী বিচার হয়। আদালত বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের নিজের পছন্দমতো জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার অধিকার সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত।

২০১৮ সালে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত প্রতিটি জেলায় ভিন্ন ধর্ম বা জাতের দম্পতিদের সুরক্ষার জন্য ‘সেফ হাউস’ স্থাপনের নির্দেশ দেন। তবু গবেষণা বলছে, অধিকাংশ ভারতীয় এখনো ভিন্ন ধর্ম বা ভিন্ন জাতের বিয়ের বিরোধী। উপরন্তু, কয়েকটি রাজ্যে কার্যকর ধর্মান্তরবিরোধী বিতর্কিত আইন এই ধরনের সম্পর্ককে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

উমরির ঘটনা তাই শুধু একটি গ্রামের ট্র্যাজেডি নয়, এটি ভারতের সমাজে প্রেম, স্বাধীনতা ও তথাকথিত সম্মানের সংঘাতের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। বিবিসি