সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে সীমিত আকারে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি
- আপডেট সময় : ০৬:৫৩:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮২ বার পড়া হয়েছে
আমিনুল হক ভূইয়া, ঢাকা
পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা ক্রমেই বাড়ছিল। বাজারে নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ উঠতে শুরু করলেও কৃত্রিম সংকট আর সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে মাত্র দুই–তিন দিনের ব্যবধানে কেজিপ্রতি দাম ২০–৩০ টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫০–১৬০ টাকায়। খুচরা ব্যবসায়ীরা বরাবরই বলে আসছেন, এ অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পেছনে সিন্ডিকেটই মূল কারণ। এমন পরিস্থিতিতে বাজার স্বাভাবিক রাখতে এবং ভোক্তা ধরে রাখতে শেষ পর্যন্ত সীমিত আকারে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে বিতর্ক।
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, গত রোববার থেকে প্রতিদিন ৫০টি করে আমদানি অনুমতি (আইপি) ইস্যু করা হচ্ছে। প্রতিটি আইপি–তে সর্বোচ্চ ৩০ টন পেঁয়াজ আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত যারা আমদানির জন্য আবেদন করেছিলেন, তারাই পুনরায় আবেদন করতে পারবেন এবং একজন আমদানিকারক একবারই আবেদন করার সুযোগ পাবেন। বাজার সহনীয় না হওয়া পর্যন্ত এ কার্যক্রম চালু থাকবে বলেও জানানো হয়েছে।

তবে বাজারে যখন নতুন পেঁয়াজ আসতে শুরু করেছে এবং কেজিপ্রতি ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, ঠিক তখন আমদানি অনুমতির সিদ্ধান্ত স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে। ব্যবসায়ী শঙ্কর চন্দ্র ঘোষ বলেন, “বাজারে নতুন পেঁয়াজের সরবরাহ আরও কয়েক দিনের মধ্যেই বাড়বে। এমন সময় আমদানি খুলে দিলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন না।” তার মতে, গত মৌসুমের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে কৃষকরা এখনো শঙ্কায় আছেন। আগাম মৌসুমে মূল্যে ধস নেমে যাওয়ায় এবার অনেক কৃষক ক্ষেতের অপরিপক্ক আলু পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছেন, ভবিষ্যতে আবারও একই পরিস্থিতির আশঙ্কায়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সিন্ডিকেটের প্রভাব এ দেশে পেঁয়াজবাজারে দীর্ঘদিনের সমস্যা। যখনই নতুন শস্য বাজারে ওঠে, একটি চক্র কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়িয়ে ফেলে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও তাই ঘটেছে বলে তাদের অভিযোগ। তাদের মতে, সরকারের সীমিত আমদানির সিদ্ধান্ত ভোক্তাদের জন্য স্বস্তি আনতে পারে, কিন্তু সিন্ডিকেট পুরোপুরি ভেঙে দিতে এটি যথেষ্ট নয়।

কৃষকরা বলছেন, মৌসুমের শুরুতেই আমদানি খুলে দিলে তাদের উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় দাম কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের বার্ষিক পেঁয়াজ উৎপাদন চাহিদার প্রায় কাছাকাছি হলেও সঠিক সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতার কারণে নিয়মিত ওঠানামা দেখা যায়। ফলে সিন্ডিকেটের সুযোগ তৈরি হয়। তারা মনে করেন, আমদানি–নির্ভর সমাধান সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে কৃষক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—সবার স্বার্থেই বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা জরুরি।
সরকার অবশ্য বলছে, মূল লক্ষ্য হলো বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমানো। পেঁয়াজের মতো নিত্যপণ্যের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়তে দেওয়া যাবে না। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় সীমিত আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে বলতে গেলে, একদিকে দাম নিয়ন্ত্রণ ও ভোক্তার স্বস্তি, অন্যদিকে কৃষকের ন্যায্যমূল্য—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কতটা কমে এবং বাজার কতটা স্থিতিশীল থাকে, তা নির্ভর করবে সরকার পরিস্থিতি কতটা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয় তার ওপর।




















